International

ডালের ছদ্মবেশে নতুন নাম

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • নতুন প্রাণী খুঁজতে সব সময় অজানা দ্বীপে অভিযান চালাতে হয় না।
  • কখনও সূত্র মেলে বাড়ির পাশের গাছেই—কখনও আবার বহু মানুষের তোলা ছবি কিংবা সংগ্রহশালায় পড়ে থাকা পুরনো নমুনায়।
  • অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডে কাঠির মতো দেখতে দুই পোকাকে এবার পৃথক বৈজ্ঞানিক পরিচয় দিয়েছেন গবেষকেরা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

নতুন প্রাণী খুঁজতে সব সময় অজানা দ্বীপে অভিযান চালাতে হয় না। কখনও সূত্র মেলে বাড়ির পাশের গাছেই—কখনও আবার বহু মানুষের তোলা ছবি কিংবা সংগ্রহশালায় পড়ে থাকা পুরনো নমুনায়। অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডে কাঠির মতো দেখতে দুই পোকাকে এবার পৃথক বৈজ্ঞানিক পরিচয় দিয়েছেন গবেষকেরা। একটির নাম Anchiale robusta, অন্যটি Anchiale mabiensis। তারা সদ্য পৃথিবীতে আসেনি; নতুন হয়েছে মানুষের চোখে তাদের পরিচয়।

২২ সেপ্টেম্বর সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা এবং এবিসির প্রতিবেদনে গবেষণাটির বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ব্র্যাক্সটন জোন্স। মাঠ থেকে সংগ্রহ করা পোকা, সংগ্রহশালার পুরনো নমুনা, দেহের গঠন এবং বংশগত তথ্য মিলিয়ে পরীক্ষা করেছে তাঁর দল। ‘অস্ট্রাল এন্টোমোলজি’ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় Anchiale গণের অস্ট্রেলীয় সদস্যদের শ্রেণিবিন্যাস নতুন করে খতিয়ে দেখা হয়েছে।

শুধু দুই নতুন প্রজাতির সন্ধানই নয়, দীর্ঘদিন অন্য প্রজাতির সঙ্গে মিশে থাকা তৃতীয় একটির স্বতন্ত্র পরিচয়ও ফিরেছে। ফলে অস্ট্রেলিয়ায় স্বীকৃত Anchiale সদস্যের সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে হয়েছে পাঁচ।

এই কাজে সাধারণ মানুষের চোখও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, iNaturalist এবং Atlas of Living Australia-র এক হাজারের বেশি নথি খতিয়ে দেখে পোকাগুলির বিস্তারের ছবি বোঝার চেষ্টা করেছেন গবেষকেরা। বন্দিদশায় রাখা পোকাদের তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে কোনও প্রাণী পরিচিত—এমনটা তার বৈজ্ঞানিক পরিচয় যে ঠিকঠাক বোঝা হয়েছে, তার নিশ্চয়তা নয়। একই নামে জমা হতে থাকা অসংখ্য ছবির আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে আলাদা প্রজাতি।

Anchiale robusta পাওয়া যায় টালি থেকে কুকটাউনের উত্তরের উপকূলীয় বৃষ্টিঅরণ্যে। বড় স্ত্রী পোকা প্রায় ১৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং ডানায় রয়েছে স্পষ্ট নকশা। A. mabiensis তুলনায় সরু; স্ত্রী পোকা প্রায় সাড়ে ১১ সেন্টিমিটার। এখনও পর্যন্ত তার সন্ধান মিলেছে অ্যাথারটন টেবিলল্যান্ডসের মাবি অরণ্যেই। তবে ‘এখন পর্যন্ত’ কথাটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ—সীমিত পর্যবেক্ষণ থেকে পৃথিবীর অন্য কোথাও এই পোকা নেই, এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।

এই শনাক্তকরণে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত সূত্র ছিল ডিম। এবিসিকে জোন্স জানিয়েছেন, পোকাগুলির ডানার রং, দৈর্ঘ্য ও আকৃতির স্থায়ী পার্থক্য থেকেই প্রথম সন্দেহ তৈরি হয়। পরে ডিমের গঠন পরীক্ষা করা হয়। সেখানেই ধরা পড়ে আরও সূক্ষ্ম তফাত। A. mabiensis-এর ডিমের ঢাকনায় বলয়ের মতো একটি বিশেষ গঠন দেখা যায়, যা গবেষকদের মতে কাঠিপোকার পরিচিত ডিমে আগে নথিভুক্ত হয়নি।

অর্থাৎ গাছের ডাল সেজে থাকা প্রাণীর পরিচয় শেষ পর্যন্ত লেখা ছিল তার চোখে পড়ার মতো শরীরে নয়, তার ক্ষুদ্র ডিমেও।

গবেষণার বিবরণ নিয়ে সাই ডট নিউজ জানিয়েছে, মোট ৩২টি Anchiale নমুনার মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পৃথক মর্যাদা ফিরে পাওয়া প্রজাতিটি Anchiale albopunctata। মধ্য কুইন্সল্যান্ডে পাওয়া এই পোকাকে দীর্ঘদিন Anchiale briareus-এর অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হত। শরীরের বৈশিষ্ট্য এবং জিনগত পার্থক্য মিলিয়েই সেই শ্রেণিবিন্যাস বদলানোর ভিত্তি তৈরি হয়েছে। শুধু দেখতে বড় বা ছোট হলেই নতুন প্রজাতির তকমা দেওয়া হয়নি।

তবে নতুন নামের সঙ্গে নতুন চিন্তাও এসেছে—আবাসস্থল বাঁচবে তো?

এবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়েট ট্রপিকস ম্যানেজমেন্ট অথরিটির টেরি কারমাইকেল জানিয়েছেন, মূল মাবি অরণ্যের বড় অংশ কৃষিকাজের জন্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অরণ্যটি একটি বিপন্ন বাস্তুসমষ্টি হিসেবে স্বীকৃত। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের সম্পর্কে এখনও জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। সুন্দর ছবি পাওয়া হয়তো সহজ; কিন্তু সেই প্রাণীকে রক্ষা করতে ঠিক কী পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা বোঝার মতো তথ্য জোগাড় করা অনেক কঠিন।

বিশ্লেষণ: আলাদা বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া নিছক নতুন একটি নামফলক বসানো নয়। কোনও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেখা পোকাকে একটিমাত্র সাধারণ প্রজাতি ধরে নিলে ছোট একটি অরণ্যে সীমাবদ্ধ অন্য প্রজাতির ঝুঁকি সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। সঠিক শ্রেণিবিন্যাস সেই ভুল সংশোধনের প্রথম ধাপ হতে পারে।

অবশ্য নতুন নাম পাওয়ার অর্থ এই নয় যে দুই প্রজাতিকে ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক ভাবে বিপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। পরের কাজ আরও জরুরি—কোথায় কত পোকা রয়েছে, কোন গাছে তারা থাকে, আবাসস্থল বদলালে কী ঘটে এবং তাদের বিস্তার আসলে কতটা, তা নিয়মিত খতিয়ে দেখা।

ছবি দিয়ে অনুসন্ধান শুরু হতে পারে, শেষ নয়। এই আবিষ্কারের আসল চমক তাই তাদের কাঠির মতো চেহারায় যতটা, তার চেয়েও বেশি একটি সহজ সত্যে: বহুবার দেখা প্রাণীকেও মানুষ দীর্ঘদিন ভুল নামে চিনতে পারে। অচেনাকে খোঁজার পাশাপাশি চেনাকেও আবার পরীক্ষা করা জরুরি।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles