৪৮ ঘণ্টায় দুই হোটেলে আগুন, মৃত ১৭

যা জানা জরুরি
- মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গের দুই হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের।
- বীরভূমের তারাপীঠে আট পুণ্যার্থীর মৃত্যুর দু’দিনের মধ্যেই কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে প্রাণ হারিয়েছেন আরও নয় জন।
- দুই ঘটনাতেই সামনে এসেছে প্রায় একই ছবি—অগ্নিসঙ্কেত ব্যবস্থা ছিল না, আপৎকালীন নির্গমনপথ হয় বন্ধ ছিল, নয়তো তার অস্তিত্বই ছিল না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গের দুই হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। বীরভূমের তারাপীঠে আট পুণ্যার্থীর মৃত্যুর দু’দিনের মধ্যেই কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে প্রাণ হারিয়েছেন আরও নয় জন। দুই ঘটনাতেই সামনে এসেছে প্রায় একই ছবি—অগ্নিসঙ্কেত ব্যবস্থা ছিল না, আপৎকালীন নির্গমনপথ হয় বন্ধ ছিল, নয়তো তার অস্তিত্বই ছিল না। অথচ রাজ্যের দমকল ব্যবস্থার এই বিপজ্জনক দুর্বলতার কথা পাঁচ বছর আগেই জানিয়েছিল ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব নিরীক্ষকের প্রতিবেদন।
বুধবার রাত দু’টো নাগাদ মির্জা গালিব স্ট্রিটের ফ্লোরেন্স ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় থাকা হোটেল শিখা ইন আগুনে ছেয়ে যায়। মৃত্যু হয় নয় জনের। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা বাংলাদেশি নাগরিকও ছিলেন। এর মাত্র দু’দিন আগে তারাপীঠ মন্দিরের কাছে হোটেল বিদেশিনীতে আগুনে আট পুণ্যার্থী মারা যান।
দুই হোটেলের বেঁচে ফেরা আবাসিকদের বক্তব্যেও উদ্বেগজনক মিল রয়েছে। কেউ অগ্নিসঙ্কেতের শব্দ শোনেননি। অন্য আবাসিকদের চিৎকারে তাঁদের ঘুম ভাঙে। ধোঁয়ায় করিডর ভরে যাওয়ার পরে তাঁরা পালানোর চেষ্টা করেন। কোথাও আপৎকালীন দরজা তালাবন্ধ ছিল, কোথাও নিরাপদ বিকল্প সিঁড়িই ছিল না। ফলে আগুনের চেয়েও বিষাক্ত ধোঁয়া এবং বেরোনোর পথের অভাব প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে ওঠে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধান বলছে, এই বিপর্যয় আকস্মিক নয়। ২০২১ সালে প্রকাশিত রাজ্যের অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি পরিষেবা দফতর সংক্রান্ত সিএজি-র নিরীক্ষা প্রতিবেদনেই পরিকাঠামো, কর্মী এবং যন্ত্রপাতির গুরুতর ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ উপদেষ্টা পরিষদের নির্ধারিত মাপকাঠি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গে ৪৩৫টি দমকলকেন্দ্র থাকা প্রয়োজন ছিল। কার্যকর কেন্দ্র ছিল মাত্র ১৩৮টি। অর্থাৎ ঘাটতি ৬৮ শতাংশ।
দশটি বিভাগের ৭১টি দমকলকেন্দ্র যাচাই করে সিএজি দেখতে পায়, পশ্চিম মেদিনীপুরে প্রয়োজনের তুলনায় ঘাটতি ৮৯ শতাংশ। মুর্শিদাবাদে ৮৩, মালদহে ৮২, পশ্চিম বর্ধমানে ৭৩, হাওড়ায় ৬৪ এবং উত্তর ২৪ পরগনায় ২৫ শতাংশ ঘাটতি ছিল।
কেবল কেন্দ্রের অভাব নয়, দমকলকর্মীর শূন্যপদের চিত্রও ছিল ভয়াবহ। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে অনুমোদিত ৫,৪৪১টি অগ্নিনির্বাপণ কর্মীর পদের মধ্যে ৪,০৪৫টিই শূন্য—প্রায় ৭৪ শতাংশ। ৫১৭টি উপ-আধিকারিক পদের মধ্যে শূন্য ছিল ৩৭২টি বা ৭২ শতাংশ। অগ্নিনির্বাপণ যানের চালক-সহ-কর্মীর ১,৩৫২টি পদের মধ্যে ৫০৪টি এবং কেন্দ্রীয় আধিকারিকের ২৭০টি পদের মধ্যে ৯৯টি খালি ছিল।
নতুন দমকলকেন্দ্র তৈরিতেও প্রশাসনিক শিথিলতা ধরা পড়ে। পূর্ত দফতরকে ৪২টি কেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত ১৫ মাস পার হওয়ার পরেও ১১টির কাজ অসমাপ্ত ছিল। সম্পূর্ণ হওয়া ৩১টির মধ্যে ১৬টির নির্মাণ এক বছরেরও বেশি বিলম্বিত হয়। নির্মাণ ও উদ্বোধন শেষ হলেও কয়েকটি কেন্দ্র চালু হতে আরও ১০ থেকে ১৯ মাস সময় নেয়।
মুর্শিদাবাদের ডোমকল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কেন্দ্রটি ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন হলেও কাজ শুরু করে ২০১৯ সালের মার্চে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের মার্চে সেখান থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে আগুন লাগলে বহরমপুর থেকে দমকলের গাড়িকে ৬২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। অথচ নির্ধারিত মান অনুযায়ী দশ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে সাত মিনিটে দমকল পৌঁছনোর কথা।
প্রযুক্তি আধুনিকীকরণের উদ্যোগেও বিপুল অর্থের অপচয়ের অভিযোগ তুলেছিল সিএজি। আধুনিক নিয়ন্ত্রণকক্ষ, কম্পিউটার-নির্ভর গাড়ি পাঠানো এবং যান অনুসরণ ব্যবস্থা গড়তে একটি সংস্থাকে ৬ কোটি ৭ লক্ষ টাকার বরাত দেওয়া হয়। ৫ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকা মেটানো হলেও অবস্থান নির্ণায়ক যন্ত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।
পরীক্ষিত বিভাগগুলিতে দেওয়া ২৫২টি বেতার যোগাযোগ যন্ত্রের মধ্যে ৬২টির হদিসই ছিল না। বাকি ১৯০টির মধ্যে ৯৭টি অকেজো হওয়ায় উদ্ধারকাজের সময় দমকলকর্মীদের ব্যক্তিগত মুঠোফোন ব্যবহার করতে হত। তা সত্ত্বেও বেতার পরিষেবার জন্য রাজ্য ২ কোটি ৯ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিল।
জলবাহী গাড়ি তৈরির জন্য ২০১৫ সালের নভেম্বরে কেনা ২৫টি গাড়ির কাঠামো সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ব্যবহার করা যায়নি। ১ কোটি ৫৯ লক্ষ টাকা দামের ৩৬টি ছোট জলবাহী গাড়ি নথিভুক্ত না করেই বিলি করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী দমকলকর্মীদের বছরে দু’বার শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। নিরীক্ষাধীন বিভাগগুলির ১,৯৯৩ জন সক্রিয় কর্মীর মধ্যে ৭৪২ জনের বয়সই ছিল ৪৫ বছরের বেশি।
রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, হোটেলগুলির বৈধ অনুমতি ও অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র পরীক্ষা করতে দল গড়া হবে। একই ভবনের তিনটি তলায় দশটি হোটেল চলার মতো ব্যবস্থা মেনে নেওয়া যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
তবে পরপর দুই বিপর্যয়ের পরে নতুন করে পরিদর্শনের ঘোষণা মূল প্রশ্নটির উত্তর দেয় না—সিএজি যে বিপদের কথা ২০২১ সালেই জানিয়েছিল, সেই ঘাটতিগুলি এত দিনেও কেন দূর করা হল না? তারাপীঠ ও কলকাতার ১৭টি মৃত্যু দেখিয়ে দিল, প্রশাসনিক অবহেলার মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই প্রাণ দিয়ে মেটাতে হয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



