International

মানচিত্রের বাইরে

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • জাম্বিয়ার কাফুয়ে জাতীয় উদ্যান থেকে বেরিয়ে পড়েছিল মায়ুকুয়ুকু দলের তিন তরুণ পুরুষ বুনো কুকুর।
  • বয়স তখন প্রায় তিন বছর—জন্মদল ছেড়ে নিজেদের সঙ্গী আর নতুন এলাকা খোঁজার সময়।
  • ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাদের দীর্ঘ বিচরণ থামলে গলায় লাগানো জিপিএস কলারের তথ্য খুলে দিল অবিশ্বাস্য এক হিসাব: আট–নয় মাসে তারা ঘুরেছে মোট ৪,১২৬ কিলোমিটার।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রতিবেদন: ২০২৫ সালের জুলাই। জাম্বিয়ার কাফুয়ে জাতীয় উদ্যান থেকে বেরিয়ে পড়েছিল মায়ুকুয়ুকু দলের তিন তরুণ পুরুষ বুনো কুকুর। বয়স তখন প্রায় তিন বছর—জন্মদল ছেড়ে নিজেদের সঙ্গী আর নতুন এলাকা খোঁজার সময়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাদের দীর্ঘ বিচরণ থামলে গলায় লাগানো জিপিএস কলারের তথ্য খুলে দিল অবিশ্বাস্য এক হিসাব: আট–নয় মাসে তারা ঘুরেছে মোট ৪,১২৬ কিলোমিটার। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, আফ্রিকার কোনও স্তন্যপায়ীর নথিভুক্ত একক বিচরণের মধ্যে এটিই দীর্ঘতম।

অথচ শুরু আর শেষ জায়গার সরল দূরত্ব মাত্র ৫৪৬ কিলোমিটার।

কারণ প্রাণীরা গুগল ম্যাপের সোজা রাস্তা ধরে চলে না। রাস্তা, নদী, জলাধার, খাড়া রিফট ভ্যালির ঢাল, খনি-শহর কিংবা ঘন জনবসতি এড়িয়ে তিন ভাইকে বারবার পথ বদলাতে হয়েছে। কখনও কিটওয়ে ও এনদোলার নগরাঞ্চলের ধার ঘেঁষে, কখনও অরক্ষিত জমির ভিতর দিয়ে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা পৌঁছেছে লুয়াঙ্গোয়া উপত্যকার দিকে।

এই দীর্ঘ পথ আসলে শুধু খাবার বা নতুন জায়গার খোঁজ নয়। আফ্রিকান বুনো কুকুরের সমাজে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে প্রজনন সাধারণত হয় না। তাই তরুণ পুরুষ বা স্ত্রীদের জন্মদল ছেড়ে দূরে গিয়ে অসংশ্লিষ্ট সঙ্গী খুঁজতে হয়। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়ার নাম ‘ডিসপার্সাল’—ঋতুভিত্তিক যাতায়াত নয়, বরং জন্মভূমি ছেড়ে নতুন দল গড়ার একমুখী যাত্রা।

আর সেই যাত্রাই একই সঙ্গে প্রজাতিটির জন্য জরুরি এবং ভয়ংকর।

তিন ভাইয়ের চার বোনও প্রায় একই সময়ে দল ছেড়েছিল। দু’মাস পর জাম্বিয়ার কপারবেল্ট অঞ্চলে ভাইবোনদের আবার দেখা হয়—মাত্র এক দিনের জন্য। তারপর ফের আলাদা পথে। গবেষকদের ধারণা, চার বোনের অন্তত দু’টির মৃত্যু হয়েছে, সম্ভবত বন্য মাংস ধরার জন্য বসানো তারের ফাঁদে। আর ভাইবোনেরা একসঙ্গে নতুন প্রজননদল গড়ে না বলে সেই পুনর্মিলনও তাদের পথ বদলায়নি।

এই ঘটনাই দেখায়, একই পথ সবার জন্য সমান নিরাপদ নয়।

জাম্বিয়ান কার্নিভোর প্রোগ্রাম, জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণী দপ্তর এবং সহযোগী গবেষকেরা প্রায় দুই দশক ধরে ১৯টি বিচরণকারী দলকে জিপিএসের মাধ্যমে অনুসরণ করেছেন। নতুন গবেষণায় বিস্তারিতভাবে দেখা চারটি দল মিলিয়ে প্রায় ৯,৮৬৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। কয়েকটি দল পৌঁছে গিয়েছিল অ্যাঙ্গোলা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মালাউই, মোজাম্বিক কিংবা জিম্বাবুয়ের সীমান্তের কাছাকাছি।

অর্থাৎ মানচিত্রে আলাদা বলে মনে হওয়া পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু বুনো কুকুরের জনসংখ্যার মধ্যে এখনও চলাচলের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

কিন্তু সেই রাস্তা ক্রমেই সরু হচ্ছে।

আফ্রিকান বুনো কুকুর বিপন্ন। আনুমানিক ৬,৬০০ প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণী ৩৯টি জনসংখ্যায় ছড়িয়ে রয়েছে। আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়া, প্রাকৃতিক শিকার কমে যাওয়া, গৃহপালিত প্রাণী থেকে রোগ, গাড়ির ধাক্কা, মানুষের সঙ্গে সংঘাত এবং তারের ফাঁদ—সবই তাদের সামনে বড় বিপদ। কয়েক হাজার কিলোমিটারের বিচরণভূমির জন্য জাতীয় উদ্যানের সীমানা একা যথেষ্ট নয়।

বিশ্লেষণ: তিন ভাইয়ের ৪,১২৬ কিলোমিটারের যাত্রাকে শুধু রোমাঞ্চকর বেঁচে ফেরার গল্প বানালে তাদের মৃত বোনদের বাস্তবতাটা আড়ালে পড়ে যায়। তারা পথ খুঁজে পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে পথটি নিরাপদ। বরং জিপিএস দেখিয়েছে, শেষ কয়েকটি সংযোগ এখনও টিকে আছে—আর সেই সংযোগও ভঙ্গুর।

দ্রুত নগরায়ণ, খনি, নতুন রাস্তা, কৃষিজমি ও বেড়া আগামী দিনে সেই সরু সুযোগ আরও সংকুচিত করতে পারে।

তাই সমাধান শুধু আরও বেড়াবন্দি জাতীয় উদ্যান তৈরি করা নয়। প্রাণীরা কোন নদীপথ, কৃষিজমি বা গ্রামাঞ্চল দিয়ে চলাচল করে, জিপিএস তথ্য দিয়ে সেই করিডরগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তার পর স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার সঙ্গে সমন্বয় করে সেগুলি রক্ষা করা জরুরি। সঙ্গে দরকার তারের ফাঁদ সরানো, গৃহপালিত কুকুরের টিকাকরণ, দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং সীমান্তপারের সহযোগিতা।

তিন ভাই আফ্রিকার মানচিত্রে কোনও দৃশ্যমান রাস্তা পায়নি। কিন্তু তাদের হাজার হাজার কিলোমিটারের পদচিহ্ন একটা কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে—মানুষের আঁকা সীমানার নিচে, রাস্তা আর বেড়ার ফাঁকে, আরও একটি আফ্রিকা এখনও সংযুক্ত।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles