সালফারের দাম দ্বিগুণ, সারের অঙ্কে নতুন চাপ

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: আন্তর্জাতিক বাজারে সারের কাঁচামাল সালফারের দাম ২০২৬ সালের শুরু থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে টনপ্রতি ১,০৫০–১,১০০ ডলারে পৌঁছেছে।
- রাশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধজনিত উৎপাদন-বিঘ্ন, রাশিয়া ও চীনের রপ্তানি-নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির জন্য নিকেল শোধনে সালফিউরিক অ্যাসিডের বাড়তি চাহিদা—এই তিন চাপ একসঙ্গে…
- ভারতীয় কৃষকের কাছে খবরটির অর্থ এখনই দোকানে সার উধাও নয়; আমদানি-খরচ, ভর্তুকি এবং পরবর্তী মরসুমের সরবরাহে ঝুঁকি বেড়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: আন্তর্জাতিক বাজারে সারের কাঁচামাল সালফারের দাম ২০২৬ সালের শুরু থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে টনপ্রতি ১,০৫০–১,১০০ ডলারে পৌঁছেছে। এক বছর আগের তুলনায় বৃদ্ধি তিন গুণেরও বেশি। রাশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধজনিত উৎপাদন-বিঘ্ন, রাশিয়া ও চীনের রপ্তানি-নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির জন্য নিকেল শোধনে সালফিউরিক অ্যাসিডের বাড়তি চাহিদা—এই তিন চাপ একসঙ্গে বাজারকে টেনেছে। ভারতীয় কৃষকের কাছে খবরটির অর্থ এখনই দোকানে সার উধাও নয়; আমদানি-খরচ, ভর্তুকি এবং পরবর্তী মরসুমের সরবরাহে ঝুঁকি বেড়েছে।
সালফার শুধু উদ্ভিদের একটি পুষ্টি নয়। এটিকে সালফিউরিক অ্যাসিডে বদলে ফসফেট শিলা প্রক্রিয়াকরণ করা হয়; সেখান থেকে ফসফরিক অ্যাসিড, ডিএপি, এসএসপি এবং বিভিন্ন জটিল সার তৈরি হয়। এক টন সালফার থেকে প্রায় তিন টন সালফিউরিক অ্যাসিড পাওয়া যায়, আর এক টন ফসফরিক অ্যাসিড তৈরিতে আনুমানিক ২.৬–২.৮ টন অ্যাসিড লাগে। ফলে কাঁচামালের দামের ছোট পরিবর্তনও উৎপাদনের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে বড় খরচে পরিণত হতে পারে।
বিশ্বের সালফারের প্রায় ৯০ শতাংশ আলাদা খনি থেকে নয়; তেল শোধনাগার ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াকরণের উপজাত হিসেবে আসে। আনুমানিক ৫৬ শতাংশ তেল শোধন এবং ৩৪ শতাংশ গ্যাস প্রক্রিয়াকরণে পাওয়া যায়। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা শোধনাগারের রক্ষণাবেক্ষণে তাই জ্বালানি বাজারের সঙ্গে সারের কাঁচামালও আটকে যায়। ভারতের নিজস্ব শোধনাগার, হিন্দুস্তান জিঙ্ক ও বিড়লা কপারের মতো প্রতিষ্ঠান কিছু সরবরাহ করলেও দেশের প্রয়োজন মেটাতে বড় আমদানি লাগে।
ভারতে বছরে সালফারের মোট ব্যবহার প্রায় ৩৮–৩৯ লক্ষ টন; তার মধ্যে সারশিল্পেই যায় ২০–২১ লক্ষ টন। দেশে ফসফরিক অ্যাসিড তৈরির ক্ষমতা প্রায় ২২ লক্ষ টন, যখন প্রয়োজন ৪৩–৪৫ লক্ষ টনের কাছাকাছি। বাকি চাহিদা সরাসরি অ্যাসিড বা প্রস্তুত সার আমদানি করে মেটাতে হয়। অর্থাৎ সালফারের দাম বাড়লে দেশীয় উৎপাদন যেমন চাপে পড়ে, বিশ্ববাজারে ডিএপি বা ফসফরিক অ্যাসিডের দাম বাড়লেও ভারত এড়াতে পারে না।
নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী নিকেলশিল্প। ইন্দোনেশিয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির উপযোগী নিকেল প্রক্রিয়াকরণ দ্রুত বেড়েছে। এই কাজে সালফিউরিক অ্যাসিডের ব্যবহার ২০২১ সালের প্রায় ৩৫ লক্ষ টন থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ১.৬ কোটি টনে উঠেছে বলে শিল্পের হিসাব। চাহিদাটি খাদ্য উৎপাদনের বিরুদ্ধে সরাসরি নীতি-নির্ধারিত বরাদ্দ নয়; বাজারে একই কাঁচামালের ক্রেতা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা। তবু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও নিজস্ব অ্যাসিড কারখানা থাকা সংস্থাগুলি ছোট ক্রেতার তুলনায় সুবিধা পেতে পারে।
সব ফসলের সালফার-প্রয়োজনও সমান নয়। তেলবীজ, ডাল ও কিছু নিবিড় চাষে ঘাটতির প্রভাব বেশি দেখা দিতে পারে; মাটিতে আগে থেকে থাকা পুষ্টি ও জৈব পদার্থও ফল বদলায়। তাই এক কাঁচামাল ব্যয়বহুল হলেই নির্বিচারে বিকল্প সার ছড়ানো বৈজ্ঞানিক সমাধান নয়। জেলা ও খেতভিত্তিক মাটি পরীক্ষার সঙ্গে প্রয়োগ মিললে সীমিত সরবরাহে অপচয় কমানো সম্ভব।
বিশ্লেষণ: ভারত সরকার সারের খুচরো দাম ও ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষককে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা থেকে অনেকটা আড়াল করে। কিন্তু দাম অপরিবর্তিত রাখলে ধাক্কা অদৃশ্য হয়, বিলুপ্ত নয়—ভর্তুকির ব্যয় বাড়ে, আমদানিকারকের কার্যকর মূলধন আটকে যায়, অথবা সরবরাহ দেরি হতে পারে। অন্যদিকে দাম বাড়ালে জমির পুষ্টিতে কাটছাঁট করে কৃষক; ফলন ও মাটির স্বাস্থ্যে তার দীর্ঘ প্রভাব পড়ে।
তাৎক্ষণিক কাজ হল মজুত ও বন্দরে আসার সময় স্বচ্ছ করা, উৎপাদককে সময়মতো ভর্তুকি দেওয়া এবং কোন জেলায় কোন সারের ঘাটতি হচ্ছে তা প্রকাশ করা। দীর্ঘমেয়াদে সালফার পুনরুদ্ধার, ফসফেট আকরিকের দক্ষ ব্যবহার, বিকল্প সারের সঠিক প্রয়োগ এবং মাটি পরীক্ষার উপর জোর দেওয়া দরকার। ‘বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে’ বলে কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারি ক্ষমাযোগ্য নয়; আবার খুচরো দাম স্থির দেখে কোনও ঝুঁকি নেই ভাবাও ভুল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



