খবর

মাছের বাজারে শিল্পের ঢেউ!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • প্রতিবেদন: মাছ কিনতে গিয়ে যদি হঠাৎ চোখে পড়ে একগুচ্ছ ছবি?
  • শিল্প দেখতে গেলে গ্যালারিতে যেতে হবে—এমন চেনা ধারণায় একটু ধাক্কা দিয়েছিল হাওড়ার কালীবাবুর বাজার।
  • ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেখানে শিল্পী হিরণ মিত্রের ৩১টি ছবি নিয়ে প্রদর্শনীর খবর প্রকাশ করেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর বাংলা বিভাগ।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রতিবেদন: মাছ কিনতে গিয়ে যদি হঠাৎ চোখে পড়ে একগুচ্ছ ছবি? শিল্প দেখতে গেলে গ্যালারিতে যেতে হবে—এমন চেনা ধারণায় একটু ধাক্কা দিয়েছিল হাওড়ার কালীবাবুর বাজার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেখানে শিল্পী হিরণ মিত্রের ৩১টি ছবি নিয়ে প্রদর্শনীর খবর প্রকাশ করেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর বাংলা বিভাগ।

বাজারের চেনা কোলাহল, মাছের গন্ধ আর কেনাকাটার ব্যস্ততার মধ্যে শিল্পকে হাজির করার এই উদ্যোগ শুধু প্রদর্শনীর জায়গা বদলায়নি, বাজারটিকেও নতুন চোখে দেখার সুযোগ তৈরি করেছিল।

বাজারেরও ইতিহাস আছে

এই সপ্তাহে কালীবাবুর বাজার এবং শিবপুরের একটি বাজারের সকাল-সন্ধে ভাগ করে বসার পুরনো বোঝাপড়া নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূত্র ধরে হাওড়ার দৈনন্দিন জায়গাগুলিকে নতুন করে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

বাজারের পরিচয় শুধু সেখানে কী বিক্রি হয়, তা দিয়ে শেষ হয় না। মানুষের অভ্যাস, পারস্পরিক সমঝোতা, সামাজিক অবস্থান এবং বদলে যাওয়া রুচির বহু চিহ্ন সেখানে জমা থাকে। কখনও একটি নামই বহন করে পুরনো ব্যবস্থার স্মৃতি।

হাওড়ার ইতিহাসও কেবল স্টেশন আর সেতু দিয়ে শুরু হয় না। জেলা প্রশাসনের ঐতিহাসিক বিবরণে ষোড়শ শতকের ভেনিসীয় পর্যটক চেজারে ফেদেরিচির বেতড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। নদীপথে বড় জাহাজ পৌঁছতে পারে, এমন একটি বাণিজ্যকেন্দ্রের কথা লিখেছিলেন তিনি। বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের মনসামঙ্গল-এও বেতড়ের উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, পণ্য, যাতায়াত ও মানুষের জমায়েতের সম্পর্ক এই ভূখণ্ডে বহু পুরনো। আজকের পরিচিত শহরের নামগুলির পিছনে সেই ইতিহাসের একাধিক স্তর চাপা পড়ে আছে।

নামেই লুকিয়ে কাল

জেলা প্রশাসনের ওই বিবরণেই আঠারো শতকের গোড়ার নথিতে সালকিয়া, হাওড়া, কাসুন্দিয়া, রামকৃষ্ণপুর ও বেতড়ের মতো বসতির নাম উঠে আসে। আজ যেগুলিকে শহরের পাড়া হিসেবে চিনি, একসময় তাদের আলাদা পরিচয় ছিল।

পুরনো বাজার নিয়ে আগ্রহ তাই নিছক অতীতবিলাস নয়। বসতি কীভাবে শহরে পরিণত হল, মানুষ কোথায় এসে প্রয়োজন মেটাতেন, কোন রাস্তার গুরুত্ব বাড়ল—এসব বোঝারও একটি পথ বাজারের ইতিহাস।

সেই ইতিহাসের ভিতর মাছের বাজারে ছবি প্রদর্শনের ঘটনাটি রাখলে তার অর্থ আরও বিস্তৃত হয়।

গ্যালারি গেল বাজারে

বাজারে যিনি আসেন, তাঁকে শিল্পরসিকের পরিচয়পত্র দেখাতে হয় না। হাতে কেনাকাটার ব্যাগ থাকতে পারে, সময়ও কম থাকতে পারে। তবু পরিচিত পথের মধ্যে কোনও ছবি যদি তাঁকে এক মুহূর্ত দাঁড় করিয়ে দেয়, সেখানেই তৈরি হয় শিল্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনা।

দর্শক তখন আগে থেকে বেছে নেওয়া কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না। শিল্প তাঁর কাছে পৌঁছে যায় দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক পথে।

হিরণ মিত্রের কাজের পরিসরেও এমন সীমা অতিক্রমের ইতিহাস রয়েছে। তাঁর জাপানযাত্রার আঁকা ও লেখার পরিচয় দিতে গিয়ে আর্ট পিকলস চিত্রকলা, প্রচ্ছদ, অলংকরণ, চলচ্চিত্রের প্রচারচিত্র এবং মঞ্চসজ্জার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেছিল।

বই হাতে নেওয়া, নাটক দেখা কিংবা কোনও প্রচারচিত্রের সামনে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েও মানুষের সঙ্গে একজন শিল্পীর দেখা হতে পারে। বাজারের প্রদর্শনী সেই সম্পর্ককে আরও একটি পরিচিত পরিসরে নিয়ে যায়।

ছবি দেখার অধিকার

প্রদর্শনীতে কত মানুষ ছবি দেখলেন, কী বললেন কিংবা কতক্ষণ দাঁড়ালেন, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব এখানে নেই। তাই বাজারের সমস্ত ক্রেতা অভিভূত হয়েছিলেন—এমন গল্প তৈরির প্রয়োজনও নেই।

ঘটনাটির গুরুত্ব বরং আয়োজনের সিদ্ধান্তে। চিত্রকলার জন্য এমন একটি জায়গা বেছে নেওয়া, যার প্রধান পরিচয় মানুষের জীবনধারণের প্রয়োজন মেটানো। রোজকার কাজের মধ্যেও সৌন্দর্য দেখার অধিকার রয়েছে—এই ভাবনার প্রকাশ হিসেবেই উদ্যোগটিকে দেখা যায়।

তবে পুরনো বাজারকে ভালোবাসার অর্থ তার অসুবিধাগুলিকে রোমান্টিক করে তোলা নয়। পরিষ্কার জল, বর্জ্য অপসারণ, নিরাপদ চলাচল এবং কাজের উপযুক্ত পরিবেশের প্রয়োজন রয়েছে। ঐতিহ্য রক্ষার আলোচনায় যাঁদের রোজকার জীবিকা বাজারের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের প্রয়োজনও সামনে থাকা জরুরি।

বাজারকে সুন্দর ছবির বিষয় করে তার মানুষের অসুবিধা উপেক্ষা করলে শহরের ইতিহাসও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

বাজারেই শহরের মুখ

কালীবাবুর বাজারকে তাই একসঙ্গে কয়েকটি চোখে দেখা যায়—কেনাবেচার জায়গা, পুরনো শহরের ইতিহাসের সূত্র এবং শিল্পের সম্ভাব্য মিলনক্ষেত্র।

এক দিকে পণ্যের দর, অন্য দিকে ছবির ভাষা। দুটিই মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ। শহরকে ভালো করে চিনতে হলে বিখ্যাত স্থাপনার পাশাপাশি এমন সাধারণ জায়গাতেও থামতে হয়।

হাওড়ার এই বাজার মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কখনও কখনও আমাদের বাজারের থলির পাশ দিয়েই হেঁটে যায়।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles