খবর

ভোট দিয়েছেন, তবু ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বিশেষ নিবিড় সংশোধনে নথি জমা দিয়ে ভোটার-তালিকায় নাম রেখেছিলেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটও দিয়েছিলেন।
  • তার কয়েক মাসের মধ্যে মুর্শিদাবাদের কৃষক সাহিদুল শেখকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে তুলে নিয়ে আটক রাখার বৈধতা এখন কলকাতা হাইকোর্টের পরীক্ষায়।
  • তাঁর স্ত্রী দেজিনা বিবির আবেদনে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য রাজ্যকে আটক বা গ্রেপ্তারের নথি আইনজীবীর হাতে দিতে বলেছেন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বিশেষ নিবিড় সংশোধনে নথি জমা দিয়ে ভোটার-তালিকায় নাম রেখেছিলেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটও দিয়েছিলেন। তার কয়েক মাসের মধ্যে মুর্শিদাবাদের কৃষক সাহিদুল শেখকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে তুলে নিয়ে আটক রাখার বৈধতা এখন কলকাতা হাইকোর্টের পরীক্ষায়। তাঁর স্ত্রী দেজিনা বিবির আবেদনে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য রাজ্যকে আটক বা গ্রেপ্তারের নথি আইনজীবীর হাতে দিতে বলেছেন। রানিনগর থানাকে দু’সপ্তাহের মধ্যে হলফনামায় আটকের ভিত্তি জানাতে এবং জেলার পুলিশ সুপার তথা বিদেশি নিবন্ধন আধিকারিককে দশ দিনের মধ্যে গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতিবেদন দিতে হবে। পরবর্তী শুনানি ৮ অক্টোবর।

দেজিনার বক্তব্য, ৮ আগস্ট গভীর রাতে পুলিশ ডুবাপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে তাঁর স্বামীকে নিয়ে যায়। তার পর থেকে পরিবার কোনও গ্রেপ্তার-স্মারক, বাজেয়াপ্ত তালিকা বা আদালতে হাজিরার নথি পায়নি। সাহিদুলকে বিদেশি নিবন্ধন আধিকারিকের হেফাজতে রাখা হয়েছে বলে পরিবার জেনেছে। স্ত্রীর দাবি, তাঁর স্বামীর ভোটার পরিচয়পত্র, আধার, প্যান, রেশন কার্ড, বিয়ের নথি, বিদ্যুতের বিল, পঞ্চায়েত পোর্টালে নাম এবং নিজের নামে নথিভুক্ত সম্পত্তি রয়েছে। পরিচয়পত্র নাগরিকত্বের একক ও চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; কিন্তু এগুলি উপেক্ষা করে অনির্দিষ্ট আটক রাখার জন্য রাষ্ট্রকে আইনি ভিত্তি দেখাতে হয়।

রাজ্যের আইনজীবী আদালতে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য রেখেছেন। সরকারের দাবি, সাহিদুল বহু আগে বাংলাদেশ থেকে বেআইনিভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢোকেন, মৃত এক স্থানীয় বাসিন্দার ছেলে হিসেবে নিজেকে দেখান এবং জাল পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন। তিনি নিজেই সে কথা স্বীকার করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। আদালত লক্ষ্য করেছে, কথিত স্বীকারোক্তি পুলিশ, পুলিশ সুপার না বিদেশি নিবন্ধন আধিকারিক—কার সামনে দেওয়া হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়। আপাতত জানা গেছে, একজন উপপরিদর্শক তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। অভিযোগটির সত্যতা এখনও বিচার হয়নি।

পরিবারটির সামাজিক ও আর্থিক সংকটও মামলার অংশ হয়ে উঠেছে। সাহিদুল স্ত্রী ও তিন সন্তানের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। বড় মেয়ে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার্থী; ছোট দুই ছেলে বাবার অনুপস্থিতিতে স্কুলে যেতে চাইছে না বলে দেজিনা জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁদের চাষের জমিও নষ্ট হয়েছে। এই বিবরণ আটক বৈধ না অবৈধ তার সরাসরি প্রমাণ নয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় হেফাজতের মানবিক মূল্যটি দেখায়।

মামলাটি নাগরিকত্ব নির্ধারণ এবং ফৌজদারি গ্রেপ্তারের পদ্ধতির পার্থক্য সামনে এনেছে। কেউ বিদেশি বলে সন্দেহভাজন হলে প্রযোজ্য আইন, কর্তৃপক্ষের লিখিত আদেশ, শুনানির সুযোগ এবং বিচারিক পর্যালোচনার পথ থাকতে হবে। সাধারণ থানায় নিয়ে গিয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান গোপন রাখা বা আদালতে না-তোলা বৈধ হতে পারে কি না, রাজ্যকে এখন তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। আবার ভোট দেওয়া বা এসআইআর পার হওয়াই নাগরিকত্ব নিয়ে ভবিষ্যৎ তদন্তকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে না।

হাইকোর্ট নথি চাওয়ায় রাষ্ট্রকে অন্তত সন্দেহের উৎস ও হেফাজতের কর্তৃত্ব লিখিতভাবে দেখাতে হবে। পরিবারকেও সেই উপাদানের জবাব দেওয়ার বাস্তব সুযোগ দিতে হবে। সেই নথি না-থাকা নিজে সাহিদুলের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না, কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

এই পর্যায়ে সাহিদুল ভারতীয়—এই দাবি যেমন আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তেমনই তিনি বাংলাদেশি—রাষ্ট্রের অভিযোগও প্রমাণিত নয়। তাই সংবাদে ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দকে সত্য হিসেবে ব্যবহার করা ন্যায়সঙ্গত হবে না। মূল প্রশ্ন হল, সন্দেহ তৈরি হওয়ার পরে সরকার আইন মেনে প্রমাণ সংগ্রহ করেছে কি না এবং আটক ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য রাখার সুযোগ দিয়েছে কি না।

এসআইআর, ভোটার-পরিচয় ও নাগরিকত্ব আলাদা আইনি ব্যবস্থা হলেও এক নাগরিকের জীবনে সেগুলি পরস্পরকে প্রভাবিত করছে। নির্বাচনকালে রাষ্ট্র তাঁর নথি গ্রহণ করেছে, পরে একই রাষ্ট্র তাঁকে সন্দেহ করেছে—এই অসঙ্গতির ব্যাখ্যা জরুরি। হাইকোর্টের নির্দেশ আপাতত মুক্তির আদেশ নয়; নথি ও কারণ প্রকাশের প্রথম ধাপ। নাগরিকত্বের সীমান্ত যতই রাজনৈতিক হোক, ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমা কেবল লিখিত আইনেই নির্ধারিত হতে পারে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles