খবর

তেরো বছর পরে মহাকরণে ফিরছে ক্ষমতার কেন্দ্র, নবান্নও থাকছে সচল

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক মানচিত্রে আবার জেগে উঠতে চলেছে লালদিঘির ধারের মহাকরণ।
  • প্রায় তেরো বছর পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দপ্তর রাইটার্স বিল্ডিংসে সরানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
  • পূর্তমন্ত্রী অজয় পোদ্দার ১৯ সেপ্টেম্বর পুনরুদ্ধারের কাজ নিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক মানচিত্রে আবার জেগে উঠতে চলেছে লালদিঘির ধারের মহাকরণ। প্রায় তেরো বছর পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দপ্তর রাইটার্স বিল্ডিংসে সরানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পূর্তমন্ত্রী অজয় পোদ্দার ১৯ সেপ্টেম্বর পুনরুদ্ধারের কাজ নিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শরদ্বৎ মুখোপাধ্যায় এবং পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের কার্যালয় দ্বিতীয় তলায় হবে। মুখ্যসচিব ও রাজ্য পুলিশের প্রধানের দপ্তরও সেখানে বসানোর কথা।

এই প্রত্যাবর্তন মানে নবান্ন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। ২০১৩ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সরকার রাজ্য সচিবালয় হাওড়ার নবান্নে সরিয়ে নিয়েছিল। তার পরেও স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তরের অংশ, কৃষি, পূর্ত, আইন, বিচার ও পরিষদীয় বিষয়ক কয়েকটি শাখা মহাকরণে কাজ চালিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তে দুই প্রশাসনিক কেন্দ্রের মধ্যে কোন দপ্তর কোথায় থাকবে, নথি কীভাবে চলাচল করবে এবং মন্ত্রী–সচিবের বৈঠক কোথায় হবে—সেই কার্যবণ্টন এখনও সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়নি।

প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো ভবনটির পুনরুদ্ধারে আনুমানিক ১২০ কোটি টাকা লাগতে পারে। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, আদানি গোষ্ঠী সংস্থার সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে কাজটি করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনা চূড়ান্ত চুক্তি নয়। কোনও বেসরকারি সংস্থা সরকারি ঐতিহ্যভবনের কাজ করলে প্রকল্প নির্বাচন, নকশা অনুমোদন, ব্যয়ের হিসাব, কাজের মালিকানা এবং ভবিষ্যতে সংস্থার প্রচার-অধিকার কী হবে, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

১৭৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জুনিয়র কেরানিদের জন্য তৈরি ভবনটি ১৯৩৭ থেকে প্রাদেশিক সরকারের দপ্তর এবং স্বাধীনতার পরে ১৯৪৭–২০১৩ পর্যন্ত রাজ্যের সচিবালয় ছিল। এক সময় ৩৪টি দপ্তরের প্রায় ছয় হাজার কর্মী এখানে কাজ করতেন। কিন্তু দীর্ঘ ব্যবহারে এবং আগের সংস্কারে ইউরোপীয় টালিসহ কিছু মূল স্থাপত্য-উপাদান নষ্ট হয়েছে বলে পূর্ত দপ্তরের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন। অতএব কাজটি সাধারণ অফিস মেরামত নয়; ঐতিহ্য সংরক্ষণ, অগ্নিনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও তথ্যপ্রযুক্তি—চারটি প্রয়োজনকে একই নকশায় মেলাতে হবে।

সরকার বদলের আগে বিজেপি মহাকরণে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই কারণে পদক্ষেপটির রাজনৈতিক প্রতীকী মূল্যও রয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের ভবনটি স্বাধীন বঙ্গের প্রশাসনিক স্মৃতিরও অংশ; মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর ফিরলে শহরের ক্ষমতার ভৌগোলিক কেন্দ্র আবার কলকাতায় দৃশ্যমান হবে। কিন্তু প্রতীকী প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের যাতায়াত, নথির ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারের বাস্তব প্রশ্ন রয়েছে।

কাজ চলাকালীন ভবনের যে অংশে সরকারি দপ্তর চালু থাকবে, সেখানে ধুলো, শব্দ, আগুন ও কাঠামোগত ঝুঁকি আলাদা করে সামলাতে হবে। ধাপে ধাপে স্থানান্তরের পরিকল্পনা, কর্মী ও দর্শনার্থীর নিরাপদ পথ এবং জরুরি বহির্গমনের মানচিত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন। ঐতিহ্যভবনে আধুনিক শীতাতপ, তথ্যকেন্দ্র বা নিরাপত্তা-যন্ত্র বসাতে গিয়ে দেয়াল, টালি ও মুখাবয়ব ক্ষতিগ্রস্ত না-হওয়ার জন্য প্রতিটি পরিবর্তনের নথি রাখা উচিত। ভবিষ্যৎ মেরামতের ক্ষেত্রেও সেই নথিই মূল ভিত্তি হবে।

মহাকরণে ফেরা প্রশাসনিক দক্ষতা নিজে বাড়ায় না। যদি মন্ত্রী কলকাতায় বসেন অথচ প্রধান সচিবালয়, অধিকাংশ সচিব ও নথি হাওড়ায় থাকে, তা হলে একই বৈঠকের জন্য দুই শহরের মধ্যে বাড়তি যাতায়াত ও সিদ্ধান্তে বিলম্ব হতে পারে। বিপরীতে স্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন এবং পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিন নথিব্যবস্থা থাকলে ঐতিহাসিক ভবন পুনর্ব্যবহার করেও কাজের গতি রাখা সম্ভব।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে পুনরুদ্ধারের স্বচ্ছতা। সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ সরকারি বাজেট নয়, কিন্তু জনসম্পত্তির কাজ বলে জনজবাবদিহির বাইরে নয়। স্বাধীন সংরক্ষণবিদ, অগ্নিবিশেষজ্ঞ ও কাঠামো-প্রকৌশলীর ছাড়পত্র এবং ব্যয়ের প্রকাশ্য হিসাব দরকার। ঠিকাদার নির্বাচন ও কাজের সময়সীমাও জানালে দেরি বা ব্যয়বৃদ্ধি নাগরিকের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হবে। লাল ভবনে ক্ষমতা ফিরছে—এটি অবশ্যই আকর্ষণীয় শিরোনাম। নাগরিকের কাছে তার মূল্য নির্ধারিত হবে, সেই ক্ষমতার দরজা কতটা খোলা এবং কাজ কতটা দ্রুত হয় তার উপর।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles