খবর

বর্জ্যেই পুজোর ঢেউ!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • প্রতিবেদন: পুজোর বাজারে নতুন জামাকাপড়, সাজসজ্জা আর কেনাকাটার হিড়িক যখন তুঙ্গে, কলকাতার এক শিল্পসজ্জায় তখন নজর ঘুরছে ফেলে দেওয়া জিনিসের দিকে।
  • নেদারল্যান্ডসের শিল্পী ফেমকে ভান গেমের্ট পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করছেন ঢেউয়ের আকৃতি।
  • যে জিনিসগুলির গন্তব্য হওয়ার কথা আবর্জনার স্তূপ, শিল্পীর হাতে সেগুলিই হয়ে উঠছে উৎসবের দৃশ্যভাষা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রতিবেদন: পুজোর বাজারে নতুন জামাকাপড়, সাজসজ্জা আর কেনাকাটার হিড়িক যখন তুঙ্গে, কলকাতার এক শিল্পসজ্জায় তখন নজর ঘুরছে ফেলে দেওয়া জিনিসের দিকে। নেদারল্যান্ডসের শিল্পী ফেমকে ভান গেমের্ট পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করছেন ঢেউয়ের আকৃতি। যে জিনিসগুলির গন্তব্য হওয়ার কথা আবর্জনার স্তূপ, শিল্পীর হাতে সেগুলিই হয়ে উঠছে উৎসবের দৃশ্যভাষা।

এখানে নতুনত্বের জন্য দামি উপকরণের প্রয়োজন নেই। দরকার শুধু পুরনো জিনিসকে নতুন চোখে দেখার ক্ষমতা।

ফেমকের প্রথম পুজো

১৮ সেপ্টেম্বরের সংবাদচিত্রের বিবরণ অনুযায়ী, দুর্গাপুজোর জন্য কলকাতায় এটাই ফেমকের প্রথম কাজ। নারীর ক্ষমতায়নকে বিষয় করে তৈরি হচ্ছে এই শিল্পসজ্জা, যেখানে পরিত্যক্ত উপকরণ দিয়ে গড়ে উঠছে ঢেউয়ের অবয়ব।

তবে নির্দিষ্ট মণ্ডপের নাম, ব্যবহৃত বর্জ্যের মোট পরিমাণ কিংবা পুজো শেষে শিল্পকর্মটির কী হবে, তা প্রকাশিত বিবরণে স্পষ্ট নয়। তাই এই আয়োজনকে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ বর্জ্যমুক্ত বলে ঘোষণা করা ঠিক হবে না। শিল্পের উপকরণ বদলালেই যে গোটা আয়োজন পরিবেশবান্ধব হয়ে যায়, এমন দাবি করার আগে তার পরবর্তী ব্যবস্থাপনাটিও জানা জরুরি।

বর্জ্য থেকে বাসা

ফেলে দেওয়া উপকরণ নিয়ে কাজ করা ফেমকের কাছে অবশ্য নতুন কিছু নয়। নিজের ওয়েবসাইটে তিনি বস্ত্রবর্জ্যকে শিল্পের উপাদান হিসেবে ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। তাঁর আগের কাজগুলির মধ্যে রয়েছে নেদারল্যান্ডসের আলফেন আন দে রাইনের একটি গ্রন্থাগারের জন্য তৈরি বিশাল পাখির বাসা।

স্থানীয় মানুষের দেওয়া পুরনো পোশাক ও কাপড় দিয়ে তৈরি সেই শিল্পকর্মে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায় ১৫০ কিলোগ্রাম বস্ত্রবর্জ্য। কয়েক বছর আগের এই প্রকল্পটি কলকাতার বর্তমান আয়োজনের থেকে আলাদা হলেও, ফেমকের শিল্পভাবনার একটি দিক স্পষ্ট করে।

বাসাটি তৈরির আগে কাপড় বাছাই করা হয়েছিল, রং অনুযায়ী আলাদা করা হয়েছিল উপকরণ। তার পরে শুরু হয় গড়ন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পাখির বাসা তৈরির কৌশল থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন শিল্পী। কিছু কাপড় রাঙাতে ব্যবহার করা হয়েছিল পেঁয়াজের খোসা, হলুদ ও বিটের মতো প্রাকৃতিক রঞ্জক।

অর্থাৎ, পুরনো কাপড় জড়ো করলেই শিল্প তৈরি হয় না। তার জন্য প্রয়োজন বাছাই, শ্রম, পরিকল্পনা এবং একটি নতুন কাঠামো।

পুজোয় নতুন পাঠ

কলকাতার দুর্গাপুজো এমন শিল্পভাবনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক আকর্ষণীয় পরিসর। প্রতিমাকে ঘিরে এখানে গড়ে ওঠে অস্থায়ী স্থাপত্য, আলোর আয়োজন, নকশা এবং নানা ধরনের কারুশিল্প। মণ্ডপসজ্জা অনেক সময়ই দৈনন্দিন উপকরণকে নতুন অর্থ ও আকার দেয়।

ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপুজোকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় শিল্পী, কারিগর, নকশাকার এবং উৎসবের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চার কথা উল্লেখ করেছিল। মৃৎশিল্প, সংগীত, খাবার ও সমবেত উদ্‌যাপন—সব মিলিয়ে পুজো এখানে কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক পরিসরও।

সেই পরিসরে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে ঢেউ তৈরি করা দর্শকের সামনে একটি ছোট ধাঁধা হাজির করে। দূর থেকে যে আকৃতিকে সুন্দর ও বিমূর্ত মনে হয়, কাছে গেলে তার ভিতরে হয়তো চেনা কোনও ফেলে দেওয়া জিনিস চোখে পড়ে। সৌন্দর্যের সঙ্গে তখন যুক্ত হয় ব্যবহারের পর জিনিসের পরবর্তী জীবন নিয়ে প্রশ্ন।

পুরনো কাপড়, নতুন গল্প

বাংলার ঘরোয়া জীবনে পুরনো জিনিসকে নতুন কাজে লাগানোর অভ্যাস অপরিচিত নয়। ব্যবহৃত শাড়ি থেকে কাঁথা, ছোট কাপড় থেকে থলি কিংবা মুছনি তৈরির রীতিতে উপযোগিতা ও যত্ন পাশাপাশি চলে।

সমকালীন শিল্প সেই পরিচিত অভ্যাসকে অন্য মাপে, অন্য পরিসরে নিয়ে যেতে পারে। ঘরের ভিতরের পুনর্ব্যবহার যখন জনসমক্ষে দৃশ্যমান হয়, তখন তার সঙ্গে সৌন্দর্যবোধ ও শিল্পের সম্পর্ক নিয়েও নতুন কথোপকথন শুরু হয়।

তবে ফেমকের কাজের সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি ঠিক কীভাবে যুক্ত হচ্ছে, তা শিল্পীর বিশদ ব্যাখ্যা ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যায় না। দর্শকের ব্যাখ্যা আলাদা হতে পারে। কিন্তু বাছাই, সেলাই, জোড়া লাগানো ও উপকরণকে নতুন রূপ দেওয়ার মতো দক্ষতাগুলি শিল্পের আলোচনায় জায়গা পেলে দৈনন্দিন শ্রমের মূল্য নিয়েও ভাবা যায়।

ঢেউ থামলে কী?

উৎসব শেষে এই শিল্পসজ্জার কী হবে, প্রশ্নটি তার সৌন্দর্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। উপকরণগুলি কি ফের ব্যবহার করা হবে? শিল্পকর্মটি খুলে আলাদা করা সম্ভব হবে? নাকি সংরক্ষণ করা হবে?

পুনর্ব্যবহারের ভাবনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন কোনও জিনিসের দ্বিতীয় জীবন নিয়ে আগেভাগেই পরিকল্পনা থাকে। শুধু ফেলে দেওয়া উপকরণ দিয়ে কিছু তৈরি করাই শেষ কথা নয়; তার পরের যাত্রাটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আপাতত কলকাতার পুজোর প্রস্তুতিতে ফেমকের কাজ দর্শককে একটি সহজ সুযোগ দিচ্ছে—ফেলে দেওয়ার আগে আরেকবার দেখা।

কারণ কখনও কখনও শিল্পের শুরু হয় ঠিক সেই দ্বিতীয় দৃষ্টিতেই।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles