শমীকবাবুর গোপালবাহিনী: সদস্য হলেই সাধু!

যা জানা জরুরি
- শমীকবাবুর কথামতো চললে বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় অবিলম্বে সংশোধন করা দরকার।
- অতএব সে কাহারও গায়ে হাত তোলেনা, কাহারও ঘর ভাঙেনা, কাহারও কাছে তোলা চায় না।
- নীতিশিক্ষার বই তুলে দিয়ে দলীয় আবেদনপত্র বিলি করুন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
শমীকবাবুর কথামতো চললে বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় অবিলম্বে সংশোধন করা দরকার। গোপাল অতি সুবোধ বালক। সে বিজেপি করে। অতএব সে কাহারও গায়ে হাত তোলেনা, কাহারও ঘর ভাঙেনা, কাহারও কাছে তোলা চায় না। যে চায়, সে রাখাল। রাখাল নিশ্চয়ই অন্য দলের। এতকাল ভুল করে ছেলেমেয়েদের চরিত্র গড়তে বলেছি। এখন থেকে সদস্যপদ নিতে বললেই হবে। নীতিশিক্ষার বই তুলে দিয়ে দলীয় আবেদনপত্র বিলি করুন। নাম, ঠিকানা, স্বাক্ষর। ব্যস, সাধু প্রস্তুত!
গুরুতর অভিযোগ উঠলেই বিজেপির লোক এমন করতেই পারেননা শুনতে শুনতে জানতে ইচ্ছে করে, বিজেপি কর্মী বলতে শমীকবাবু কী বোঝেন? দেবশিশু, না ছাগশিশু? দেবশিশুরাও পুরাণে দুষ্টুমি করেন; ছাগশিশু পরের বাগানের চারাটি মুড়িয়ে দেয়। এঁরা বুঝি তারও ঊর্ধ্বে! খিদে আছে, তেষ্টা আছে, পদের লোভ আছে, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা আছে, শুধু অন্যায় করার যন্ত্রাংশটি শরীরে বসানো হয়নি। বিধাতা কি বিজেপির সদস্যতালিকা দেখে মানুষ তৈরি করেন?
এই ব্যবস্থায় তদন্তের খরচও বাঁচে। ঘটনাস্থলে যেতে হবে না, আক্রান্তের কথা শুনতে হবে না। অভিযুক্তের নাম জানারও দরকার নেই। সাফাই তৈরি আছে; অভিযোগটি এলেই মাপে কেটে পরিয়ে দিন। আমরা আলু কিনেও নিশ্চিন্ত হতে পারি না, ভিতরে পচা বেরোবে কি না। শমীকবাবু লক্ষ মানুষের চরিত্রের জামিনদার! আলুর ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। পচা আলু বেরোলেই বলবেন, আমাদের বস্তার আলু পচতেই পারে না। ওটি বিরোধীদের অনুপ্রবেশ।
গত ৩ সেপ্টেম্বর ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ নিয়ে শমীক ভট্টাচার্য জানান, বিজেপির সম্পর্ক নেই; দল প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তাঁর আরও যুক্তি, আক্রমণের রাজনীতি করলে বিজেপি অনেক আগেই করতে পারত। অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু যুক্তিটি রত্নবিশেষ। আগে করতে পারতাম, করিনি, অতএব এখন করিনি! গত বছর টুকিনি বলে এবছর পকেটে পাওয়া চোতাও কি পরীক্ষার্থীর চরিত্রের শংসাপত্র হয়ে যাবে?
পাড়ার কেউ যদি বলেন, আপনার জানলা আমি ভাঙিনি, চাইলে মঙ্গলবারই ভাঙতে পারতাম, তাঁকে চা খাওয়াবেন, না বাকি জানলায় গ্রিল বসাবেন? নির্দোষিতার প্রমাণ দিতে গিয়ে নিজের আক্রমণক্ষমতার বিজ্ঞাপন! এই যুক্তিতে অক্ষত বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতাও আদায় করা যায়। বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে তো? আমাদের সংযমের দান। এবার দরজায় লিখে রাখুন, এই গৃহ রাজনৈতিক দয়ায় রক্ষিত।
বিজেপি প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করে না, ভালো কথা। বিদ্যালয়ের দেওয়ালেও লেখা থাকে, সদা সত্য কথা বলিবে। তাই বলে প্রধান শিক্ষক কি বলেন, আমাদের ছাত্র মিথ্যা বলতেই পারে না? দলের আদর্শ আর সদস্যের আচরণ এক হলে শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি রাখার দরকার কী? নিষ্পাপদের নজরদারি করবেন কেন? বহিষ্কারই বা করবেন কাকে? দেবশিশুর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো কি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নয়?
অথচ মেমারির বিজেপি বিধায়ক মানব গুহ অভিযোগ করেছেন, তৃণমূল থেকে আসা কিছু ব্যক্তি তোলাবাজিতে যুক্ত; বিজেপির কিছু নেতা-কর্মী তাঁদের আশ্রয় দিচ্ছেন। অভিযোগটি তাঁর, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু সুবোধ বালকদের পাঠশালায় এ কী অনাসৃষ্টি! বিধায়ক কি পাঠ্যবই পড়েননি? নাকি মেমারির শাখায় পাপ ধোয়ার কলটি খারাপ? রাজ্য দপ্তরে খবর দিন। চরিত্র শোধনের মিস্ত্রি পাঠাতে হবে।
দলবদলের ব্যবস্থাটি অবশ্য আরও মনোরম। যোগদানের দিনে আগন্তুক বিবেকের ডাকে সাড়া দেওয়া দেশপ্রেমিক। অভিযোগ উঠলে তৃণমূলের আমদানি। মালা পরানোর সময় বর্তমান জন্ম, দায় নেওয়ার সময় পূর্বজন্ম! পতাকা ধরিয়ে পুণ্যটুকু নেবেন, পাপটুকু পুরনো ঠিকানায় ফেরত পাঠাবেন। এমন সুবিধাজনক পুনর্জন্মের কথা শাস্ত্রেও আছে কি না সন্দেহ। রাজনৈতিক আত্মার সঙ্গে একটি ফেরতযোগ্য মালপত্রের রসিদ দেওয়া উচিত। নীচে লেখা থাকবে, ক্ষমতার মেয়াদে ব্যবহারযোগ্য; কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে পুরনো দলে ফেরত।
তা অন্য দল থেকে এসে কত দিনে মানুষ খাঁটি গোপাল হন? সাত দিন, সাত মাস, সাতটি জনসভা? রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে? প্রতিবেদনে লেখা থাকে, শরীরে পূর্বতন দলের দোষ এখনও বারো শতাংশ; আরও দুবার জয়ধ্বনি দিলে সম্পূর্ণ নির্মল হবেন? আর আদি কর্মী ধরা পড়লে? তখন কি তাঁর জন্মসনদ বাতিল? সংগঠনের একজন নৈতিক হিসাবরক্ষক চাই। কৃতিত্ব নিজেদের খাতায় তুলবেন, দায় বিরোধীদের নামে চালান করবেন।
সোনারপুরের কোদালিয়ায় আবার অন্য ওষুধ। প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে সিপিএম কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ আসে। বিজেপির জেলা সভাপতি মনোরঞ্জন জোদ্দার কিছু কর্মীর যাওয়ার কথা মেনে ঘটনাটিকে জনরোষের ফল বলেন। অভিযোগের নিষ্পত্তি বাকি। কিন্তু সাফাইয়ের বিবর্তনটি দেখুন। কর্মীরা গিয়েছিলেন, কাজটি করেছে জনরোষ। দলীয় পরিচয়টি কি বাইরে জুতোর সঙ্গে খুলে ঢুকেছিলেন? ফেরার সময় আবার পরে নিলেন?
জনরোষ বড় উপকারী জীব। হাত নেই, জানলা ভাঙে; পা নেই, দল বেঁধে আসে; ঠিকানা নেই, নোটিস পাঠানো যায় না। এই যুক্তির কল্পিত থানায় আসামির নাম হবে ক্ষোভ, পিতার নাম অপমানবোধ, নিবাস উত্তেজিত জনতার হৃদয়। পুলিশ কাকে ধরবে? আবেগকে হাতকড়া পরানো যায়? বরং ভাঙা চেয়ারগুলির বিরুদ্ধে মামলা হোক। প্রধানমন্ত্রীর অপমানের পরেও অমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কেন? একটু নমনীয় হলে তো ভাঙতে হত না!
এই গোপালবাহিনীর একটি অভিধানও চাই। হুমকি মানে দৃঢ় প্রতিবাদ। চড়াও হওয়া মানে নিবিড় জনসংযোগ। ভাঙচুর মানে আবেগের বহিঃপ্রকাশ। সব ব্যাখ্যা ব্যর্থ হলে শেষ পাতায় মহৌষধ: প্রকৃত কর্মী নয়। পতাকা ধরেছে, আদর্শ ধরেনি। মঞ্চে উঠেছে, নৈতিক উচ্চতায় ওঠেনি। পদ পেয়েছে, চরিত্র পায়নি। চরিত্র ছাড়া পদটি কে দিলেন, সেই প্রশ্ন নিষিদ্ধ। অভিধান যাঁরা লিখছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিধান প্রয়োগ করা চলবে না।
ভাবুন, একটি কাল্পনিক সাংবাদিক সম্মেলন। অভিযুক্তের সঙ্গে আপনাদের ছবি? অনেকেই ছবি তোলেন। দলের পদ ছিল? পদ থাকলেই আদর্শ থাকে না। আদর্শ আছে বুঝব কী করে? অভিযোগ থাকবে না। অভিযোগ উঠলে? বুঝবেন, আদর্শ ছিল না। আহা, কী অভ্রান্ত পরীক্ষা! ফেল করলেই পরীক্ষার্থী বলে স্বীকার করা হবে না। এই বিদ্যালয়ের পাশের হার চিরকাল একশো শতাংশ। প্রধান শিক্ষক শমীকবাবু, বিদ্যালয়ের নাম সুবোধ গোপাল বিদ্যাপীঠ। রাখালদের ভর্তি নিষেধ; গোপালরা ধরা পড়লে রাখাল। বিদ্যালয়ের ফলাফলে ভুল নেই, ভুল কেবল ছাত্র চিনতে। সেই ভুলেরও কোনও দায় নেই। কারণ ভর্তির দিনে ছেলেটি গোপালই ছিল। অভিযোগের দিন রাখাল হয়ে গেলে প্রধান শিক্ষক কী করবেন? বালকের চরিত্র বদলেছে, বিদ্যালয়ের সুনাম বদলাবে কেন?
অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হন না। কিন্তু দলীয় সদস্য হলেই কেউ চিরকালের নির্দোষও হন না। প্রথম কথাটি মানুষের অধিকার; দ্বিতীয়টি দলীয় আবদার। দুটো মিশিয়ে দিলে নির্দোষিতার অনুমানকে ক্ষমতার বর্ম বানানো হয়। তখন সদস্যপত্রের পিছনে ছোট অক্ষরে লিখতে হবে, ধারক যা-ই করুন, সভাপতি কিছু জানার আগেই কিছু করেননি বলে প্রত্যয়ন করবেন। চরিত্রের এমন নিশ্চয়তা কোনও বিমা সংস্থাও দেয় না। এখানে সদস্য সংগ্রহের সঙ্গে বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।
এই ব্যবস্থায় সৎ কর্মীরই লোকসান। তিনি হয়তো সারাজীবন পাড়ার মানুষের পাশে থেকেছেন, ক্ষমতার সুযোগ নেননি। পাশে দাঁড়ানো সুযোগসন্ধানীও একই নির্মলতার শংসাপত্র পেল। এতকাল ভালো থাকার পরিশ্রম তবে কেন? নেতৃত্ব যখন না দেখেই নম্বর দেবেন, তখন পড়াশোনা করে লাভ কী? গোপাল হওয়ার চেয়ে গোপালের পোশাক ভাড়া করাই সস্তা। আর অভিভাবক যদি আগেই বলেন, আমার ছেলে করতেই পারে না, ছেলের শিক্ষাটিও পরিষ্কার: যা করবে বাইরে করো, বাড়িতে সাফাই তৈরি আছে।
আক্রান্তের দশা তখন দেখার মতো। দোকানদার জানতে চান, কাল দোকান খুলতে পারবেন কি না। তাঁকে শোনানো হয় দলের ঐতিহ্য। পরিবার জানতে চায়, আবার হামলা হবে কি না। উত্তর আসে, আমাদের সংস্কৃতিতে এসব নেই। ভাঙা দরজায় সংস্কৃতি সাঁটিয়ে কি রাত কাটে? মানুষ নিরাপত্তা চাইতে এসেছেন; দলীয় মহিমার পাঁচালি শুনে প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফিরতে আসেননি। অথচ প্রশ্নটি ফের করলেই বিপদ। এতক্ষণ দলের প্রশংসা শুনেও ভয় কাটেনি? লোকটির নিশ্চয়ই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে!
এঁদের চোখের ব্যবস্থাও অসাধারণ। বিরোধীর বেলায় দূরবিন, নিজের দলের বেলায় ঠুলি। অন্যের অভিযোগে বজ্রকণ্ঠ, নিজের অভিযোগে স্নেহান্ধ অভিভাবকের আর্তি: আহা, ওরা কি পারে! বাংলার মানুষ এই অভিভাবকত্ব বহুবার দেখেছেন। পতাকা বদলেছে, আদরের ছেলেদের ছাড়পত্র বদলায়নি। আগে অন্য রঙের গোপাল ছিল, এখন গেরুয়া গোপাল। রাখালের বরাদ্দ কেবল বিরোধী শিবিরে। ক্ষমতার এই শিশুশিক্ষালয়ে বয়স বাড়ে, দায়িত্বজ্ঞান বাড়ে না; শুধু অভিভাবকের গলার জোর বাড়ে।
শমীকবাবু একদিন বলেই দেখুন, খোঁজ নিচ্ছি, আমাদের কেউ জড়িত থাকলে আড়াল করব না। তাতে পতাকার রং চটে যাবে না। তবে অলৌকিক ব্যবসাটি বন্ধ হবে। কে কী করেছে না জেনেও কে করেনি জানার যে দৈবশক্তি, তার বাজারদর কমবে। আপাতত দলীয় দপ্তরে বিজ্ঞাপন ঝোলানো যায়: এখানে তদন্তের আগেই নিষ্পাপ সরবরাহ হয়। খুচরো ও পাইকারি। বড় মিছিলে বিশেষ ছাড়। প্রয়োজন শুধু সদস্যপদ; সদাচরণ ঐচ্ছিক।
বিদ্যাসাগরের গোপাল ভালো ছিল বলে সুবোধ। শমীকবাবুর গোপাল দল করে বলে সুবোধ। এইটুকু সংশোধনেই গোটা নীতিশিক্ষা উল্টে গেল। নতুন বর্ণপরিচয়ের শেষ পাঠটি তাই লিখে রাখা যাক: গোপাল বড় সুবোধ। সে সারাদিন কী করিয়াছে, কেহ জানে না। সন্ধ্যায় সভাপতি বলিয়াছেন, সে কিছুই করে নাই। অতএব তাহাকে সন্দেহ করিও না। ভাঙা জানলাকে জিজ্ঞাসা করো, সে নিজে হইতে ভাঙিল কেন। আর রাখালকে ধরিয়া আনো। সে এখনও আমাদের দলে যোগ দেয় নাই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



