এসআইআর নোটিস খোদ নির্বাচন কমিশনারকেও, তালিকায় সিবিআই প্রধান ও শীর্ষ আমলারা

যা জানা জরুরি
- ভোটার তালিকায় থাকার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে দিল্লির ৩১.৬৩ লক্ষ ভোটারকে।
- নোটিসের তালিকায় অরবিন্দ পানাগড়িয়া, তুহিনকান্ত পাণ্ডে ও বিক্রম মিস্রিও।
- নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব-সহ একাধিক কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ আমলার কাছেও যাচ্ছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভোটার তালিকায় থাকার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে দিল্লির ৩১.৬৩ লক্ষ ভোটারকে। নোটিসের তালিকায় অরবিন্দ পানাগড়িয়া, তুহিনকান্ত পাণ্ডে ও বিক্রম মিস্রিও।
নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব-সহ একাধিক কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ আমলার কাছেও যাচ্ছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের নোটিস। দিল্লির যে ৩১.৬৩ লক্ষ ভোটারকে তালিকায় থাকার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এই পদস্থ কর্তারা। নথি বলছে, তথ্যের অমিল কিংবা অন্য কারণে নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারে তাঁদের নাম চিহ্নিত হয়েছে। সিবিআই অধিকর্তা প্রবীণ সুদের তথ্যও আগের এসআইআরের ভোটার তালিকার সঙ্গে মেলানো যায়নি।
দেশের তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সদস্য সান্ধুর নাম রয়েছে নিউ মোতিবাগের দু’টি বুথের ভোটারদের নিয়ে তৈরি তালিকার একটিতে। এই সরকারি আবাসনে থাকেন দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও শীর্ষ আমলারা। সান্ধুর ক্ষেত্রে নোটিস দেওয়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে নিজের নামের অমিল। অর্থাৎ, বিভিন্ন রাজ্যে ২০০০-এর দশকের গোড়ায় হওয়া সর্বশেষ নিবিড় সংশোধনের সময় তাঁর নাম যেভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল, বর্তমান নথির সঙ্গে তা মিলছে না।
তালিকায় কারা
তথ্যে অসংগতি অথবা আগের এসআইআরের তালিকার সঙ্গে তথ্য মেলানো যায়নি বলে যাঁদের নোটিস দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রি, সেবি চেয়ারম্যান তুহিনকান্ত পাণ্ডে, প্রধানমন্ত্রীর প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা অজয়কুমার সুদ, স্বাস্থ্যসচিব পুণ্য সলিলা শ্রীবাস্তব এবং প্রশাসনিক সংস্কার ও জনঅভিযোগ দফতরের সচিব নিবেদিতা শুক্ল বর্মা।
একই তালিকায় রয়েছেন মৎস্যসচিব অভিলক্ষ লিখি এবং তাঁর স্ত্রী সুকৃতি লিখি। সুকৃতি বর্তমানে প্রাক্তন সেনাকর্মীদের কল্যাণ দফতরের সচিব। সার দফতরের সচিব রজতকুমার মিশ্র এবং ভূমিসম্পদ দফতরের সচিব নরেন্দ্র ভূষণের তথ্যও সর্বশেষ এসআইআরের তালিকার সঙ্গে মেলানো যায়নি।
নামের অমিলের কারণে যাঁদের নোটিস দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ব্যয়সচিব ভুমলুনমাং ভুয়ালনাম। ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাব নিরীক্ষক বা সিএজি কে সঞ্জয় মূর্তির ক্ষেত্রে দেখানো হয়েছে বাবা অথবা মায়ের নামের অমিল। মূর্তিও প্রাক্তন আইএএস আধিকারিক।
একাধিক অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও প্রাক্তন পদাধিকারীর নামও রয়েছে তথ্যের অসংগতি এবং পুরনো তালিকার সঙ্গে তথ্য না-মেলার কারণে নোটিস দেওয়ার তালিকায়। তাঁদের মধ্যে আছেন নীতি আয়োগের প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান অরবিন্দ পানাগড়িয়া, প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অরুণ গোয়েল, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তথা ইউজিসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান মামিডালা জগদীশ কুমার এবং পশুপালন দফতরের প্রাক্তন সচিব অলকা উপাধ্যায়।
এ ছাড়া রয়েছেন ক্রেতাসুরক্ষা দফতরের প্রাক্তন সচিব রোহিতকুমার সিংহ, তাঁর স্ত্রী তথা সিআইএসএফের প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল নীনা সিংহ, প্রাক্তন প্রতিরক্ষাসচিব গিরিধর আরামানে এবং প্রাক্তন পরিবেশসচিব লীনা নন্দন।
দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত নিউ মোতিবাগের ওই দু’টি বুথে মোট ৫৯৪ জন ভোটারকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। তাঁদের তালিকাতেই এই নামগুলি রয়েছে। অধিকাংশ শীর্ষ আমলার সরকারি বাসভবন এই এলাকায়।
নোটিস মানেই নাম বাদ নয়, জানালেন দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিস দেওয়া নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরে রবিবার একটি বিবৃতি দেন দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক। তাতে বলা হয়, “সংশ্লিষ্ট সকলকে জানানো হচ্ছে, নোটিস দেওয়া হয়েছে মানেই দিল্লির ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ পড়বে, এমন নয়। ইসিআইনেটে তাঁদের তথ্য সংশোধনের জন্য উল্লিখিত শ্রেণির ভোটারদের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় নোটিস দেওয়া হচ্ছে। বক্তব্য জানানোর সুযোগ না দিয়ে এবং যথাযথ, কারণ-সংবলিত ও আপিলযোগ্য আদেশ ছাড়া কারও নাম বাদ দেওয়া যায় না।”
গত ৩১ অগস্ট দিল্লির খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। তার আগে ৪৭.৫৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। তাঁদের অনুপস্থিত, অন্যত্র চলে যাওয়া, মৃত অথবা একাধিকবার নাম থাকা ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। খসড়া তালিকা প্রকাশের পরে তাতে থাকা ভোটারদের জন্য কমিশনের কেন্দ্রীয় ইসিআইনেট পোর্টাল থেকে নোটিস তৈরি হতে শুরু করে।
১৯ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর জানিয়েছিল, যাঁদের তথ্য সর্বশেষ নিবিড় সংশোধনের তালিকার সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি এবং যাঁদের তথ্যে ‘যৌক্তিক অসংগতি’ ধরা পড়েছে, তাঁদের নোটিস দেওয়া হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “নোটিস পাওয়ার পরে ভোটারদের সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকের কাছে জবাব ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। নোটিসগুলির নিষ্পত্তি ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবরের মধ্যে সম্পূর্ণ করা হবে… এ পর্যন্ত ৩১ লক্ষ ৬৩ হাজার ৯৩০টি নোটিস তৈরি হয়েছে এবং দিল্লির সংশ্লিষ্ট ভোটারদের কাছে সেগুলি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।”
যাঁদের নাম বাদ পড়েছে অথবা যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত হয়েছে, তাঁরা ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি জানাতে পারবেন। কমিশনের সূচি অনুযায়ী, দিল্লির চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা ৪ নভেম্বর।
দিল্লিজুড়ে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের দফতরে শুনানি চলছে। এই আধিকারিকেরা সাধারণত মহকুমাশাসক পর্যায়ের হন এবং ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আইনস্বীকৃত কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করেন। নোটিস পাওয়া ভোটারদের সেখানে নথি জমা দিয়ে ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত থাকার যোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছে।
দিল্লির যে ৩৩ লক্ষ ভোটারকে নিজেদের তথ্যের যথার্থতা প্রমাণ করতে বলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়াল, নয়াদিল্লির সাংসদ বাঁশুরি স্বরাজ এবং দিল্লি বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি বীরেন্দ্রকুমার সচদেবা।
২০২৫ সালে বিহার থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর চালু করেছে নির্বাচন কমিশন। এর ফলে খসড়া তালিকাগুলি থেকে মোট ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। ভোটারদের নোটিস পাঠানোর জন্য এই প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে কমিশন। এই প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কমিশনের অ্যালগরিদমে চিহ্নিত হওয়ার পরে ২৭.১৬ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



