ভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা এখন বিজেপির প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ২০২৯ সালের মধ্যে এনডিএ-শাসিত ২১টি রাজ্যে তা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অথচ এই প্রশ্নে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর। তাঁর বক্তব্য ছিল, জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সম্প্রীতি; সকলের জীবনযাপন ও সামাজিক রীতিকে একই ছাঁচে ঢালার প্রয়োজন নেই। মুসলিমদের ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তনও তাঁদের উপর চাপিয়ে দিতে চাননি তিনি।

দিল্লির সুরুচি প্রকাশন প্রকাশিত হিন্দি বই ‘সমান নাগরিক সংহিতা: এক পরিচর্চা’-য় গোলওয়ালকরের সাক্ষাৎকার সংকলিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের অগস্টে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল সঙ্ঘঘনিষ্ঠ সাপ্তাহিক ‘অর্গানাইজার’-এ। সেখানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, জাতীয়তাবোধ জোরদার করতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কি অপরিহার্য? গোলওয়ালকরের উত্তর ছিল সরাসরি—না। নিজের উত্তর অনেককে বিস্মিত করতে পারে, সে কথাও তিনি স্বীকার করেছিলেন।

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে গোলওয়ালকর বলেছিলেন, ভারত বরাবরই বৈচিত্রকে উৎসাহ দিয়েছে। তা সত্ত্বেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এদেশ একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে থেকেছে। তাঁর কথায়, “ঐক্যের জন্য আমাদের প্রয়োজন সম্প্রীতি, অভিন্নতা নয়।” অর্থাৎ, সামাজিক আচার বা ব্যক্তিগত আইনের পার্থক্য থাকলেই জাতীয় সংহতি বিপন্ন হবে, এমন ধারণা তিনি মেনে নেননি। বিভিন্ন জীবনধারার বৈচিত্র রক্ষা করার পক্ষেই নিজের মত জানিয়েছিলেন সঙ্ঘের নেতা।

মুসলিম সমাজে বহুবিবাহের প্রসঙ্গেও তাঁর বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছিলেন, যান্ত্রিকভাবে দেওয়ানি বিধিকে অভিন্ন করার চেষ্টা যথাযথ নয়। মুসলিমরা তাঁদের ব্যক্তিগত আইন নিজেদের মতো করে বিকশিত করুন। যেদিন তাঁরা নিজেরাই বুঝবেন যে বহুবিবাহ তাঁদের পক্ষে ভাল নয়, সেদিন তিনি খুশি হবেন। কিন্তু নিজের মত তাঁদের উপরে চাপাতে চান না। এই বক্তব্যে বহুবিবাহের সমর্থন ছিল না; ছিল সংশ্লিষ্ট সমাজের ভিতর থেকে পরিবর্তন আসার উপর জোর এবং জবরদস্তির বিষয়ে আপত্তি।

গোলওয়ালকরের মন্তব্যের তাৎপর্য বোঝার জন্য বিজেপি ও তার পূর্বসূরি ভারতীয় জনসঙ্ঘের নির্বাচনী ইতিহাসও প্রাসঙ্গিক। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দাবি তাদের ইস্তাহারে বরাবর সমান গুরুত্ব পায়নি। জনসঙ্ঘের ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালের ইস্তাহারে হিন্দু ব্যক্তিগত আইন সংস্কারের আইনগুলি প্রত্যাহারের দাবি থাকলেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির উল্লেখ ছিল না। ১৯৬৭ সালে দাবিটি জায়গা পায়। কিন্তু ১৯৭১ সালে ফের বাদ যায়। ১৯৭৭ সালের জনতা পার্টির ইস্তাহারেও তা অনুপস্থিত ছিল।

১৯৮০ সালে বিজেপির প্রথম নির্বাচনী ইস্তাহার এবং ১৯৮৪ সালের ইস্তাহারও এই বিষয়ে নীরব ছিল। পরিবর্তন আসে মূলত আশির দশকের মাঝামাঝি। ১৯৮৫ সালের শাহ বানু মামলার পরে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে ঘিরে সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির অবস্থান আরও দৃঢ় হয়। পরবর্তী সময়ে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ ও সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পাশাপাশি এই দাবিও বিজেপির রাজনীতির প্রধান স্তম্ভ হয়ে ওঠে।

তবু বাস্তবায়নের প্রশ্নে দলের ভাষা ধাপে ধাপে বদলেছে। ১৯৮৯ সালের ইস্তাহারে সহমতের ভিত্তিতে বিধি তৈরির জন্য কমিশনের প্রস্তাব ছিল। ১৯৯১ সালে আইন কমিশনের সমীক্ষার কথা বলা হয়। ১৯৯৬ সালে আসে সরাসরি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি। আবার ১৯৯৮ সালে জোট সরকারের নেতৃত্বে এসে বিজেপি এই বিষয়টিও সরিয়ে রাখে। ফলে বর্তমান অবস্থানকে গোড়া থেকে অপরিবর্তিত নীতি হিসেবে দেখলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলি আড়ালে থেকে যায়।

গোলওয়ালকরের বক্তব্য সেই ইতিহাসেরই উল্লেখযোগ্য দলিল। সংস্কার কাম্য কি না এবং সেই সংস্কার কীভাবে হবে—এই দুই প্রশ্নকে তিনি আলাদা করেছিলেন। আজ অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে জাতীয় ঐক্যের যুক্তি দেওয়া হয়। অথচ সঙ্ঘেরই অন্যতম প্রধান মতাদর্শগত ব্যক্তিত্ব বৈচিত্র বজায় রেখেও ঐক্য সম্ভব বলে মনে করতেন। তাঁর সাক্ষাৎকার তাই বর্তমান বিতর্কে সঙ্ঘ পরিবারের নিজেদের অতীত অবস্থানকেও আলোচনায় নিয়ে আসে।