‘গণতন্ত্রের হত্যা, দল চুরি’: মমতার পাশে বিরোধীরা, কংগ্রেসের ইতিহাস তুলে পাল্টা বিজেপি

যা জানা জরুরি
- তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ালেন বিরোধী জোটের একাধিক নেতা।
- কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি ও সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বের অভিযোগ, বিরোধী দল ভাঙতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করছে বিজেপি।
- পাল্টা বিজেপির বক্তব্য, তৃণমূল ও এনসিপির জন্মই হয়েছিল কংগ্রেস ভেঙে; সেই ইতিহাস ভুলে এখন দল ভাঙার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপাচ্ছেন রাহুল গান্ধী।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ালেন বিরোধী জোটের একাধিক নেতা। কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি ও সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বের অভিযোগ, বিরোধী দল ভাঙতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করছে বিজেপি। পাল্টা বিজেপির বক্তব্য, তৃণমূল ও এনসিপির জন্মই হয়েছিল কংগ্রেস ভেঙে; সেই ইতিহাস ভুলে এখন দল ভাঙার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপাচ্ছেন রাহুল গান্ধী।
বিতর্কের সূত্রপাত বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত থেকে। তৃণমূলের প্রকৃত নেতৃত্ব কার হাতে, তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরূপ রায়ের গোষ্ঠীর বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেনি কমিশন। তবে ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের আগে দুই পক্ষকেই দলের পুরনো নাম ও সংরক্ষিত প্রতীক ব্যবহারে নিষেধ করেছে। কমিশনের যুক্তি, উভয় গোষ্ঠীকে সমান অবস্থানে রেখে দাবিদাওয়ার বিচার করতেই এই সাময়িক ব্যবস্থা। কমিশনের সামনে অরূপ শিবিরের দাবি, পুরনো জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ ফুরিয়েছে। মমতার পাল্টা বক্তব্য, দলীয় সংবিধান অনুযায়ী সেই কমিটির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত। সাংগঠনিক কর্তৃত্ব নিয়ে এই পরস্পরবিরোধী দাবির মীমাংসা হলেই স্থির হবে দলের নাম ও প্রতীকের চূড়ান্ত অধিকার। এই প্রশ্নে উভয় পক্ষই নিজেদের নথি দিয়েছে।
শুক্রবার রাহুল সমাজমাধ্যমে অভিযোগ করেন, প্রথমে শিবসেনা, তার পরে এনসিপি এবং এখন তৃণমূলের ক্ষেত্রে একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন একযোগে বিরোধী দল ভাঙছে, তার পরে সেই দলের নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। গোটা রাজনৈতিক দলই যদি চুরি করা যায়, তা হলে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোট চুরির অভিযোগও আর বিস্ময়কর থাকে না বলে মন্তব্য করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা।
রাহুলের মতে, ভোট, সরকার এবং রাজনৈতিক দল দখলের এই ধারাবাহিকতা দেশের গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। জনাদেশ রক্ষা করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব; অথচ কমিশনই জনাদেশ উল্টে দেওয়ার শক্তিকে সাহায্য করছে বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বিষয়টিকে শুধু মমতার ব্যক্তিগত লড়াই হিসেবে দেখতে চাননি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান, এমন প্রত্যেক ভোটার এবং প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের স্বার্থ এখানে জড়িত বলে জানিয়েছেন তিনি।
কংগ্রেসের সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালের আক্রমণ আরও তীব্র। তাঁর অভিযোগ, মমতার নেতৃত্বে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়েছিলেন যাঁরা, তাঁদেরই বিদ্রোহ ও দলত্যাগে উৎসাহ দিচ্ছে কমিশনের সিদ্ধান্ত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের এই পদক্ষেপকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনের উপহার বলে কটাক্ষ করেন তিনি। কমিশন বিজেপির হাতের পুতুল হয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল করছে বলেও অভিযোগ তোলেন বেণুগোপাল।
আম আদমি পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরীবালও মোদির জন্মদিনের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন করেন, এই পথেই কি নির্বাচনে জিততে চাইছে শাসকদল? তাঁর মন্তব্যে প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ পেয়েছে।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব বলেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শক্তিশালী করে এমন সিদ্ধান্ত নিলে কমিশনের সম্মান বাড়বে। কমিশনের কাছে তাঁদের জমা দেওয়া হলফনামাগুলি পৌঁছেছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিজেপি অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে কংগ্রেসের ইতিহাস সামনে এনেছে। দলের জাতীয় মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদীর দাবি, রাহুল নিজের দলের অতীত সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল নন। তৃণমূল এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি, দুটিই কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৈরি হয়েছিল। তাঁর প্রশ্ন, যে দলগুলির উৎপত্তিই কংগ্রেসের ভাঙন থেকে, তাদের বর্তমান সংকটের সমস্ত দায় বিজেপির উপর চাপানো হচ্ছে কেন? তৃণমূল ও এনসিপির নামেই কংগ্রেস শব্দটি রয়েছে, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বিজেপি। ত্রিবেদী আরও বলেন, বিদেশি বংশোদ্ভূত নেতৃত্বের প্রশ্নে ১৯৯৯ সালে কংগ্রেস থেকে আলাদা হয়েছিলেন শরদ পওয়ার। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে ১৯৯৭ সালে দল ছেড়েছিলেন মমতা। পরে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের রাজনৈতিক জমি কেড়ে নিয়েছিলেন তিনিই। সেই মমতার পাশে কংগ্রেসের দাঁড়ানো নিয়েও কটাক্ষ করেন ত্রিবেদী।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুও একই সুরে পাল্টা আক্রমণ করেন। কংগ্রেসকে রাজনৈতিক ‘ভস্মাসুর’ আখ্যা দিয়ে তাঁর দাবি, এই দলের সংস্পর্শে আসা অন্য দলগুলিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিজেপি অন্য দল ভেঙে বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে ওঠেনি বলেও দাবি করেন তিনি। কংগ্রেস নিজের আচরণের দায় বিজেপির উপর চাপাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন রিজিজু। বিরোধীদের বক্তব্যের জবাবে বিজেপির মূল যুক্তি, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অভ্যন্তরীণ সংকটের জন্য শাসকদলকে দায়ী করা যায় না।
এর মধ্যেই নন্দীগ্রামের ঘটনাপ্রবাহ বিরোধীদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। মমতা নিজের গোষ্ঠীর প্রার্থী সরিয়ে কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান গ্রেফতার হন। মামলাটি ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের সময়কার একটি খুনের ঘটনা সংক্রান্ত। মমতার গোষ্ঠী ও কংগ্রেস এই গ্রেফতারির প্রতিবাদ জানিয়ে মিলনের মুক্তি দাবি করেছে। কমিশনের নাম ও প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে মমতা সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছেন। ফলে নির্বাচনী লড়াইয়ের পাশাপাশি আইনি লড়াইও শুরু হয়েছে।
মিলনের গ্রেফতারিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ‘গণতন্ত্রের হত্যা’ বলে আক্রমণ করেছেন রাহুল। তাঁর অভিযোগ, সুষ্ঠু নির্বাচনে আস্থা নেই বলেই বিজেপি ক্ষমতা ধরে রাখতে এমন পথ নিচ্ছে। বেণুগোপালের প্রশ্ন, উনিশ বছরের পুরনো মামলা ব্যবহার করে ভোটের মুখে বিরোধী প্রার্থীকে গ্রেফতার করা গণতন্ত্র দখলের চেষ্টা নয় কি? ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসকে নত করা যাবে না বলেও জানিয়েছে দল।
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যে কমিশনের সিদ্ধান্তের সীমাটি স্পষ্ট: জোড়াফুল এখনও কোনও গোষ্ঠীকে চূড়ান্তভাবে দেওয়া হয়নি। দুই পক্ষের দাবির নিষ্পত্তি বাকি। কিন্তু উপনির্বাচনের আগে পরিচিত নাম ও প্রতীক হারানোর তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অভিঘাতই এখন বিরোধীদের প্রতিবাদের কেন্দ্র। দলীয় পরিচয়ের এই বিবাদ তাই বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



