নোয়েল টাটার আপত্তি সত্ত্বেও এন চন্দ্রশেখরনকে চেয়ারম্যান পদে আরও পাঁচ বছর রাখার প্রস্তাব অনুমোদন করল টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ। বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে গোষ্ঠীর মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে শেয়ারবাজারে নথিভুক্ত করার পথেও এগোনোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে পর্ষদের অনুমোদনেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হচ্ছে না। পরবর্তী বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হল।

বৈঠকে চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের পক্ষে ভোট দেন চার পরিচালক—বেণু শ্রীনিবাসন, হরিশ মনওয়ানি, অনিতা এম জর্জ এবং সৌরভ আগরওয়াল। বিরুদ্ধে ছিলেন টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা। তাৎপর্যপূর্ণ হল, নোয়েল এবং শ্রীনিবাসন দু’জনেই পর্ষদে ট্রাস্টসের মনোনীত প্রতিনিধি। অথচ গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রস্তাবে তাঁদের অবস্থান বিপরীত। অর্থাৎ বিরোধের রেখা কেবল পেশাদার পরিচালকদের সঙ্গে প্রধান শেয়ারহোল্ডারের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নেই; ট্রাস্টসের প্রতিনিধিদের মধ্যেও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।

চন্দ্রশেখরনের বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। গত অগস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, আর একটি মেয়াদের জন্য দায়িত্ব নিতে চান না। কিন্তু গোষ্ঠীর বৃহত্তর স্বার্থে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায় পর্ষদ। টাটা গোষ্ঠীর বিবৃতি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার তিনি সেই অনুরোধ গ্রহণ করেছেন। ২০১৭ সালে প্রথম টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হওয়া চন্দ্রশেখরনের এটি হবে তৃতীয় মেয়াদ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললে।

নোয়েলের বক্তব্য, চন্দ্রশেখরন নিজেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার তা গ্রহণ করেছে। কর্মী, ঋণদাতা ও ব্যবসায়িক অংশীদারেরাও সেই ঘোষণার ভিত্তিতে এগিয়েছেন। এখন পুনর্নিয়োগের প্রস্তাব আনলে আগের সিদ্ধান্ত এবং উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া, দু’টিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হবে। তাঁর দাবি, সংস্থার নিজস্ব বিধি মেনে নতুন চেয়ারম্যান বাছাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিটি গঠন করা উচিত।

পুনর্নিয়োগের বৈধতা নিয়েও আপত্তি তুলেছে টাটা ট্রাস্টস। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংস্থার পরিচালনবিধিতে চেয়ারম্যান নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাস্টসের দুই মনোনীত পরিচালকের সম্মতি প্রয়োজন। নোয়েল বিরোধিতা করায় প্রস্তাবটি বৈধ নয় বলে দাবি তাদের। এই ব্যাখ্যার সমর্থনে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের আইনি মতামতও পর্ষদের সামনে রাখা হয়েছিল বলে ট্রাস্টস জানিয়েছে। এটি অবশ্য ট্রাস্টসের আইনি অবস্থান; আদালতের কোনও চূড়ান্ত রায় নয়।

দ্বিতীয় বড় সংঘাত শেয়ারবাজারে প্রবেশ নিয়ে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাটা সন্সকে বৃহৎ ও অধিক নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাঙ্ক নয় এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিতে রেখেছে। এই শ্রেণির সংস্থার জন্য বাজারে নথিভুক্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। টাটা সন্স বিনিয়োগ সংস্থা হিসাবে নিজের নিবন্ধন ছেড়ে ওই নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে চেয়েছিল। সেই আবেদন খারিজ হওয়ায় বাজারে প্রবেশের প্রশ্নটি ফের সামনে এসেছে।

তবে পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং সংস্থার আনুষ্ঠানিক বিবৃতির ভাষায় পার্থক্য রয়েছে। সংবাদসূত্রে বাজারে নথিভুক্তির পথে এগোনোর কথা বলা হলেও টাটা সন্স জানিয়েছে, তারা প্রযোজ্য রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকা মানতে পদক্ষেপ করবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির পরামর্শ নেবে। শেয়ার ছাড়ার তারিখ বা দাম ঘোষিত হয়েছে, এমন নয়।

নোয়েলের আশঙ্কা, শেয়ারবাজারে গেলে টাটা গোষ্ঠীর বিশেষ চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক মালিকানা কাঠামো, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মালিক জনহিতকর ট্রাস্ট। তিনি বাজারে নথিভুক্তি এড়ানোর সমস্ত অনুমোদিত বিকল্প খতিয়ে দেখতে বলেছেন। ফলে নিয়ন্ত্রকের নির্দেশ কীভাবে মানা হবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে গোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও জড়িয়ে গিয়েছে।

অন্যদিকে, বাজারে নথিভুক্ত হলে টাটা সন্সের শেয়ারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে প্রকাশ্য দাম নির্ধারিত হবে এবং অংশীদারদের বিনিয়োগের মূল্য উপলব্ধি করার সুযোগ বাড়বে। প্রায় ১৮.৩৭ শতাংশ অংশীদারির মালিক শাপুরজি পালনজি গোষ্ঠীর কাছে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাজারে প্রবেশ করলেই ট্রাস্টস নিয়ন্ত্রণ হারাবে, এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। কত নতুন শেয়ার ছাড়া হবে, কারা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করবে এবং চূড়ান্ত মালিকানার অনুপাত কী দাঁড়াবে, তার উপরে ফল নির্ভর করবে। নথিভুক্তির সঙ্গে নিয়মিত আর্থিক ফল প্রকাশ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাজারকে জানানো এবং বাইরের বিনিয়োগকারীদের নজরদারির বিষয়টিও যুক্ত। তাই এই পরিবর্তন কেবল শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ তৈরি করবে না; গোষ্ঠীর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহির ধরনেও প্রভাব ফেলবে।

রয়টার্সের পৃথক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাপুরজি পালনজি গোষ্ঠী তাদের অংশীদারির একাংশ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছে টাটা ট্রাস্টস। দেড় বছরের মধ্যে দুই দফায় এই লেনদেনের ভাবনা রয়েছে। ঋণ কমানোর প্রয়োজন থেকেই ওই গোষ্ঠী বিনিয়োগের একাংশ নগদে ফেরাতে চাইছে। তবে প্রস্তাবের অর্থ এই নয় যে বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে।

এখন প্রধান নজর বার্ষিক সাধারণ সভায়। টাটা ট্রাস্টসের হাতে টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ার থাকায় তাদের অবস্থান নির্ণায়ক। চেয়ারম্যান থাকতে হলে চন্দ্রশেখরনকে পরিচালকও থাকতে হবে; পরিচালক হিসাবে তাঁর পুনর্নিয়োগে সভার অনুমোদন জরুরি। কিন্তু গত ১৮ অগস্টের সভা প্রয়োজনীয় উপস্থিতির অভাবে মুলতবি হয়েছিল। স্যার রতন টাটা ট্রাস্টের উপর নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধের কারণে যৌথ প্রতিনিধি মনোনয়নের প্রক্রিয়া আটকে যায়। সেই জট কাটানোও প্রয়োজন।

বিরোধের পিছনে ব্যবসায়িক চাপও রয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে গোষ্ঠীর আটটি বড় অনথিভুক্ত সংস্থার মোট লোকসান প্রায় ৩৩,৫৩৮ কোটি টাকা। তার মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার লোকসান ২২,২৩৮ কোটি এবং টাটা ডিজিটালের ৪,৯৭৪ কোটি। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নের পাশাপাশি মূলধন কোথায়, কতটা এবং কী ফলের প্রত্যাশায় বিনিয়োগ হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, পর্ষদ চন্দ্রশেখরনের পক্ষে রায় দিলেও স্থিতাবস্থা ফেরেনি। প্রধান শেয়ারহোল্ডারের আপত্তি, পরিচালনবিধির ব্যাখ্যা এবং বাজারে প্রবেশের পথ—তিনটি প্রশ্ন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। পরবর্তী সাধারণ সভায় ভোটাভুটি হলে বোঝা যাবে, পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন শেষ পর্যন্ত কার্যকর সিদ্ধান্তে পরিণত হয় কি না। তার আগে টাটা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।