উপনির্বাচনের আগে তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল স্থগিত, খালি হাতে দুই শিবির

যা জানা জরুরি
- উপনির্বাচনের মুখে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করল নির্বাচন কমিশন।
- বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বরের নির্দেশে কমিশন জানিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অরূপ রায়–ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির—কেউই আপাতত ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’…
- আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে দুই পক্ষকে পৃথক নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়তে হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
উপনির্বাচনের মুখে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করল নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বরের নির্দেশে কমিশন জানিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অরূপ রায়–ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির—কেউই আপাতত ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে দুই পক্ষকে পৃথক নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়তে হবে।
দু’পক্ষকেই শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার মধ্যে পছন্দের ক্রমানুসারে তিনটি নাম এবং তিনটি প্রতীকের প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতীক বাছতে হবে কমিশনের অসংরক্ষিত প্রতীকের তালিকা থেকে। প্রস্তাবগুলি বিবেচনা করে প্রত্যেক শিবিরের জন্য আলাদা নাম ও প্রতীক বরাদ্দ করবে কমিশন। ফলে ভোটের প্রচারের মাঝপথেই নিজেদের নতুন নির্বাচনী পরিচয় ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল দুই শিবিরের উপর।
তবে নতুন নামে মূল দলের সঙ্গে যোগসূত্র রাখার সুযোগ থাকছে। অর্থাৎ, ‘তৃণমূল’ শব্দটির সমস্ত ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়নি। নিষেধাজ্ঞা মূল দলের অবিকৃত নাম ও সংরক্ষিত প্রতীকের উপর। কোন পক্ষ শেষ পর্যন্ত মূল দলের নাম এবং জোড়াফুলের অধিকার পাবে, সেই প্রশ্নও এই নির্দেশে মেটেনি। আপাতত কোনও পক্ষকেই সেই অধিকার দেওয়া হয়নি।
কমিশনের বক্তব্য, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করে তাদের সমান অবস্থানে রাখতেই এই ব্যবস্থা। উপনির্বাচনের আগে অবশিষ্ট সময়ে সম্পূর্ণ শুনানি শেষ করে মূল বিরোধের নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান নির্বাচনের প্রয়োজন মেটাতে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত তা কার্যকর থাকবে। ফলে এই সিদ্ধান্তকে কোনও একটি শিবিরের চূড়ান্ত জয় বলে দেখার অবকাশ নেই।
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে তৃণমূলের সাংগঠনিক কর্তৃত্ব। ঋতব্রতদের দাবি, দলের জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের ২২ জুন কলকাতায় বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয় এবং অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। ওই অধিবেশনের সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক নথি কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে এই পক্ষ।
মমতা শিবির এই প্রক্রিয়ার বৈধতাই অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর অধিবেশন ও পদাধিকারী নির্বাচন দলীয় গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী। কমিশনের সামনে ডেরেক ও’ব্রায়েন যুক্তি দেন, গঠনতন্ত্র সংশোধন করে জাতীয় কর্মসমিতি-সহ সাংগঠনিক সংস্থাগুলির মেয়াদ তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। ঋতব্রত শিবির আবার সেই সংশোধনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সাংগঠনিক বিবাদ সরাসরি নির্বাচনী জটিলতা তৈরি করেছে। রেজিনগরে দুই শিবিরের প্রার্থীর সমর্থনে যথাক্রমে অরূপ রায় ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া দলীয় অনুমোদনপত্র জমা পড়েছে। নন্দীগ্রামেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই স্বীকৃত দলের প্রার্থী হিসেবে পরস্পরবিরোধী দাবি ওঠায় নাম ও প্রতীকের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। এই অনুমোদনপত্রই নির্বাচনের ভাষায় ‘ফর্ম বি’।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে দুই শিবিরের প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই শুক্রবার পর্যন্ত পিছিয়েছে। কংগ্রেসের আপত্তি, প্রত্যেকের মনোনয়নে মাত্র একজন প্রস্তাবক রয়েছেন। কমিশনকে বিষয়টি জানানোর পরে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিকেরা যাচাই স্থগিত করেন। শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে সেই প্রক্রিয়া ফের শুরু হওয়ার কথা।
নির্দেশের তীব্র বিরোধিতা করেছেন মমতা শিবিরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, সিদ্ধান্তে আইনি ত্রুটি রয়েছে; তাঁরা তা গ্রহণ করছেন না। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, প্রতিপক্ষও মূল নাম বা প্রতীক পায়নি। নতুন পরিচয় ভোটারদের চেনাতে অসুবিধা হবে বলে স্বীকার করলেও সেই কাজ তাঁদের করতে হবে বলে জানিয়েছেন কল্যাণ।
অন্যদিকে ঋতব্রত সিদ্ধান্তটিকে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে বার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। পরবর্তী পদক্ষেপ এবং প্রতীক বাছাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও কমিশনের সিদ্ধান্তের সীমা আলাদা: অন্তর্বর্তী নির্দেশে ঋতব্রতদেরও জোড়াফুল দেওয়া হয়নি। দুই পক্ষের দাবির যথার্থতা নিয়ে বিস্তারিত বিচার এখনও বাকি।
প্রতিক্রিয়া এসেছে অন্য দলগুলি থেকেও। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী তৃণমূলের বিভাজনকে আক্রমণ করে বিরোধী দল হিসেবে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কংগ্রেসের কে সি বেনুগোপাল আবার কমিশনের সমালোচনা করেছেন। ফলে দলীয় প্রতীক নিয়ে দ্বন্দ্বটি তৃণমূলের অন্দরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; কমিশনের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রতীক স্থগিত রাখার নজির অবশ্য রয়েছে। ২০২২ সালে মহারাষ্ট্রের আন্ধেরি পূর্ব উপনির্বাচনের আগে উদ্ধব ঠাকরে ও একনাথ শিন্ডের বিরোধের মধ্যে ‘শিবসেনা’ নাম এবং তির-ধনুক প্রতীকের ব্যবহার স্থগিত করেছিল কমিশন। ২০২১ সালে লোক জনশক্তি পার্টির বিরোধেও দলের নাম ও বাংলো প্রতীক নিয়ে একই ধরনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
বাংলায় এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে মমতার দল গড়ার পর থেকে জোড়াফুলের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। দীর্ঘ পনেরো বছর রাজ্যশাসনের পরে বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয় এবং সংগঠনের ভাঙনের মধ্যেই এবার সেই পরিচিত নির্বাচনী চিহ্ন ব্যবহারের অধিকারও আপাতত হারাল তাঁর শিবির। প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছেও পরিচিত প্রতীকের সুবিধা রইল না।
এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে প্রচারে। বহু ভোটারের কাছে প্রার্থীর নামের পাশাপাশি দল চেনার প্রধান উপায় প্রতীক। নতুন প্রতীক বরাদ্দের পরে প্রচারপত্র, দেওয়াললিখন ও বাড়ি বাড়ি প্রচারে সেটি বোঝাতে হবে। একই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দাবিদার দুই পক্ষ আলাদা চিহ্ন নিয়ে নামলে পুরনো সমর্থকদের কাছে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করাও জরুরি হবে।
সুতরাং উপনির্বাচনে দুই শিবিরের সামনে এখন দ্বিমুখী পরীক্ষা। একদিকে কমিশনের কাছে সাংগঠনিক কর্তৃত্বের দাবি প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে পরিচিত জোড়াফুল ছাড়াই ভোটারদের সমর্থন আদায়। চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় মূল দলের নাম ও প্রতীক স্থগিত থাকলেও ভোটের সময়সূচি থেমে থাকছে না। সেই বাস্তবতাই দুই পক্ষকে দ্রুত নতুন নির্বাচনী পরিচয় স্থির করতে বাধ্য করছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



