ভুয়ো ডাক্তার আবার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ

যা জানা জরুরি
- দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে রোগী দেখানোর অভিযোগে বিশ্বরূপ আচার্য নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
- পুলিশের দাবি, তিনি এমবিবিএস ও এফআরসিএসসহ একাধিক যোগ্যতা ব্যবহার করতেন, অন্তত আটটি জায়গায় চেম্বার করতেন এবং রোগীপিছু প্রায় ৮০০ টাকা নিতেন।
- আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি; তাই তাঁকে এখনই ভুয়ো চিকিৎসক হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যাবে না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে রোগী দেখানোর অভিযোগে বিশ্বরূপ আচার্য নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের দাবি, তিনি এমবিবিএস ও এফআরসিএসসহ একাধিক যোগ্যতা ব্যবহার করতেন, অন্তত আটটি জায়গায় চেম্বার করতেন এবং রোগীপিছু প্রায় ৮০০ টাকা নিতেন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি; তাই তাঁকে এখনই ভুয়ো চিকিৎসক হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যাবে না।
ঘটনার সূত্র একটি চেম্বারের জায়গার মালিকের সন্দেহ। নথিতে অসঙ্গতি দেখে তিনি পুলিশকে জানান। তদন্তকারীরা রোগী সেজে যোগাযোগ করে শংসাপত্র ও নিবন্ধনসংক্রান্ত কাগজ পরীক্ষা করেন। বৈধ নথি দেখাতে না-পারার অভিযোগের পরে গ্রেপ্তার করা হয়। কোন কাগজ জাল, কোন প্রতিষ্ঠান বা নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার হয়েছে—ফরেনসিক ও নিয়ন্ত্রক যাচাইয়ের পরে তা স্পষ্ট হবে।
উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের একটি হাসপাতালের মালিক জুলফিকার মণ্ডলের বিরুদ্ধেও বিহার থেকে পাওয়া সন্দেহজনক চিকিৎসা-শংসাপত্র ব্যবহার করার অভিযোগ এসেছে। তিনি পলাতক বলে পুলিশ জানিয়েছে। এই মামলাটি সোনারপুরের গ্রেপ্তারের সঙ্গে একই চক্রের অংশ কি না, প্রকাশিত তথ্য তা প্রতিষ্ঠা করেনি; দুটি অভিযোগকে প্রমাণ ছাড়া যুক্ত করা ঠিক হবে না।
এর কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্য দপ্তর উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাঁচজনের চিকিৎসা-যোগ্যতা নিয়ে পৃথক তদন্ত শুরু করে। চিকিৎসকদের একটি সংগঠন অভিযোগ করেছিল, সন্দেহজনক ডিগ্রি ব্যবহার করে রোগী দেখা, চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা এবং স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের অপব্যবহার হয়েছে। দপ্তরের এক আধিকারিক তদন্তের কথা নিশ্চিত করলেও সংগঠনের অভিযোগগুলি তখনও সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
চিকিৎসকের পরিচয় যাচাইয়ে রোগীর বাস্তব অসুবিধা রয়েছে। চেম্বারের সাইনবোর্ডে বহু সংক্ষিপ্ত ডিগ্রি থাকে; কোনটি স্বীকৃত চিকিৎসা-যোগ্যতা, কোনটি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ বা সদস্যপদ, সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। নামের মিল, পুরনো নিবন্ধন, অন্য রাজ্যের পরিষদ এবং বানানভেদের কারণে অনলাইন অনুসন্ধানেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
শুধু রোগীর উপর এই দায়িত্ব চাপানো সমাধান নয়। হাসপাতাল, নার্সিংহোম, রোগনির্ণয় কেন্দ্র এবং চেম্বারের মালিককে পরিচয়পত্র, মূল ডিগ্রি, বর্তমান নিবন্ধন ও বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ যাচাই করতে হবে। বিশেষত ক্যানসার, হৃদ্রোগ বা শল্যচিকিৎসার মতো ক্ষেত্রে সাধারণ চিকিৎসকের নিবন্ধন থাকা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ হওয়া এক বিষয় নয়। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শংসাপত্র-পরীক্ষা ব্যর্থ হলে দায়ও ভাগ হতে পারে।
সন্দেহজনক চিকিৎসা পাওয়া রোগীদের চিকিৎসা-নথি সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন। প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষার ফল ও ব্যবহৃত ওষুধ স্বাধীন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করলে চলমান চিকিৎসার ক্ষতি কমানো সম্ভব। অভিযোগকারীর পরিচয় প্রকাশ বা রোগীদের আতঙ্কিত করে সব চিকিৎসা বন্ধ করতে বলা উল্টো বিপজ্জনক হতে পারে। স্বাস্থ্য দপ্তরকে বিকল্প পরামর্শের ব্যবস্থাও জানাতে হবে।
স্বাস্থ্যবিমা বা সরকারি প্রকল্পে দাবি করা হয়ে থাকলে অর্থের পথ আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দরকার। রোগীর নামে কোন প্যাকেজ অনুমোদিত হয়েছে, চিকিৎসক হিসেবে কার নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে এবং টাকা কোন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে গেছে—ডিজিটাল নথি জালিয়াতির ব্যাপ্তি বুঝতে সাহায্য করবে। তবে সন্দেহজনক দাবি মানেই সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক কর্মী অপরাধে যুক্ত, এমন নয়।
এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে সমস্যার অবসান হবে না। রাজ্য চিকিৎসা পরিষদের অনুসন্ধানযোগ্য হালনাগাদ নিবন্ধন, বিশেষজ্ঞতার পৃথক উল্লেখ এবং হাসপাতালের বাধ্যতামূলক বার্ষিক যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের দ্রুত তদন্ত জরুরি, কারণ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে নিরপরাধ চিকিৎসকের সুনামও নষ্ট হয়। সোনারপুরের মামলা এখন অভিযোগ ও নথি যাচাইয়ের স্তরে; এর বড় শিক্ষা হল, রোগী যেন সাইনবোর্ডের আস্থার উপর একা নির্ভরশীল না থাকেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



