গন্ধে আপত্তি, রপ্তানিতে উল্লম্ফন: জাপানের আঠালো নাট্টো এখন বিশ্বভ্রমণে

যা জানা জরুরি
- এক বাটি গরম ভাতের উপর বাদামি সয়াবিন; কাঠি দিয়ে তুলতেই অসংখ্য সাদা আঠালো সুতো।
- জাপানে সকালের পরিচিত খাবার নাট্টোকে প্রথম দেখায় অনেকে পচা বলে ভুল করেন, গন্ধে পিছিয়েও যান।
- সেই বিভাজক খাবারই এখন বিদেশে দ্রুত বাজার বাড়াচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
এক বাটি গরম ভাতের উপর বাদামি সয়াবিন; কাঠি দিয়ে তুলতেই অসংখ্য সাদা আঠালো সুতো। জাপানে সকালের পরিচিত খাবার নাট্টোকে প্রথম দেখায় অনেকে পচা বলে ভুল করেন, গন্ধে পিছিয়েও যান। সেই বিভাজক খাবারই এখন বিদেশে দ্রুত বাজার বাড়াচ্ছে। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাপানি প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যম, গাঁজানো খাবারের জনপ্রিয়তা এবং বিদেশে জাপানি খাদ্যের বিস্তারের ফলে নাট্টোর নতুন গ্রাহক তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রকের বাণিজ্যতথ্য অনুযায়ী, রপ্তানি ২০১৭ সালের ১,৭৫২ টন থেকে ২০২৫ সালে ৫,২৪৮ টনে পৌঁছেছে—আট বছরে প্রায় তিন গুণ।
নাট্টো বানানোর মূল প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত, নিয়ন্ত্রণ কঠিন। সয়াবিন ভিজিয়ে সিদ্ধ বা বাষ্পে নরম করা হয়, তারপর ব্যাসিলাস সাবটিলিস জাতের নাট্টো-জীবাণু দিয়ে উষ্ণ পরিবেশে গাঁজানো হয়। জীবাণু প্রোটিন ভাঙে এবং যে পলিগ্লুটামিক অ্যাসিড তৈরি করে, তা থেকেই আঠালো সুতো ও বিশেষ গন্ধ। সরিষা, সয়া-সস ও কুচোনো পেঁয়াজ দিয়ে ভাতের সঙ্গে খাওয়া প্রচলিত; নতুন দোকানে কিমচি, পনির, অ্যাভোকাডো কিংবা মিষ্টি উপাদানও যোগ হচ্ছে। টোকিওর বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলি ছোট, বড়, কাটা কিংবা নানা অঞ্চলের সয়াবিনে তৈরি নাট্টো পাশাপাশি চেখে দেখাচ্ছে।
খাবারটির জন্মকাহিনি নিশ্চিত নয়। কেউ হেইয়ান যুগে উষ্ণ খড়ের মধ্যে সিদ্ধ সয়াবিন রেখে দুর্ঘটনাজনিত গাঁজনের গল্প বলেন; কেউ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের খাদ্যসংরক্ষণ পদ্ধতির কথা তোলেন। এগুলি ঐতিহাসিক অনুমান ও লোককথার মিশ্রণ, প্রমাণিত একক উৎস নয়। দীর্ঘদিন উত্তর ও পূর্ব জাপানে নাট্টো বেশি জনপ্রিয় ছিল; পশ্চিমের কিছু অঞ্চলে গন্ধ ও গঠনের আপত্তি প্রবল। শীতলীকরণ, ছোট প্যাকেট ও মৃদু গন্ধের জাত সেই ভৌগোলিক ব্যবধান কমিয়েছে।
রপ্তানির প্রধান গন্তব্য চিন, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড ও হংকং। প্রবাসী জাপানি বা এশীয় দোকানের বাইরে এখন স্বাস্থ্যসচেতন গ্রাহকও কিনছেন। গায়িকা লিজোর মতো তারকার খাওয়ার ভিডিও নতুন দর্শক এনেছে; ছোট ভিডিওতে আঠালো সুতো নিজেই দৃশ্যমান আকর্ষণ। কিন্তু ‘সুপারফুড’ শব্দটি বিপণনের, চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত আলাদা খাদ্যশ্রেণি নয়। নাট্টোতে প্রোটিন, আঁশ ও ভিটামিন কে–২ আছে; গাঁজন তার স্বাদ ও কিছু পুষ্টি বদলায়। তা খেলেই রোগ প্রতিরোধ বা হাড়ের রোগ সেরে যাবে—এমন দাবি গবেষণা সমর্থন করে না।
উল্টো দিকে সতর্কতাও আছে। ভিটামিন কে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে; ওয়ারফারিনের মতো ওষুধ গ্রহণকারীকে নাট্টো খাওয়ার পরিমাণ বদলানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার। সয়া-অ্যালার্জি থাকলে এটি নিরাপদ নয়। গাঁজানো হলেই অনিয়ন্ত্রিত ঘরে বানানো খাবার ঝুঁকিমুক্ত হয় না; তাপমাত্রা ও পরিচ্ছন্নতা ভুল হলে অন্য জীবাণু বাড়তে পারে। বাণিজ্যিক পণ্যে শীতল সরবরাহশৃঙ্খলও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববাজারে সাফল্য জাপানের খাদ্যশিল্পের জন্য সুযোগ, তবে কাঁচামালের প্রশ্ন রয়েছে। দেশটি সয়াবিনের বড় অংশ আমদানি করে; ‘জাপানি ঐতিহ্য’ লেখা প্যাকেটের শিম সব সময় জাপানে জন্মায় না। উৎপাদককে উৎস, জীবাণুর জাত, সংরক্ষণ ও মেয়াদ স্পষ্ট করতে হবে। অন্য দেশে স্থানীয় সয়াবিন দিয়ে নাট্টো তৈরি হলে স্বাদ ও দাম বদলাতে পারে—খাবারের ঐতিহ্য তখন পদ্ধতিতে থাকবে, ভূগোলে নয়।
নাট্টোর বিশ্বযাত্রার মজা তার আপসহীন গঠনে। আন্তর্জাতিক হওয়ার জন্য খাবারটি নিজের আঠালো স্বভাব পুরো ছেড়ে দেয়নি; বরং নতুন উপকরণ ও পরিবেশনের ভাষা পেয়েছে। তবে অনলাইন বিস্ময়কে স্থায়ী খাদ্যাভ্যাসে বদলাতে স্বাদ, দাম ও নিরাপদ সরবরাহ—তিনটিই দরকার। ‘সুপারফুড’ বলে অতিরঞ্জন করলে প্রথম কৌতূহল বাড়তে পারে, আস্থা নয়। নাট্টোর যথেষ্ট পরিচয় আছে: এটি পুষ্টিকর, প্রাচীন গাঁজন-প্রযুক্তির ফল এবং কারও কাছে প্রিয়, কারও কাছে অসহ্য—সকলের জন্য অলৌকিক ওষুধ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
রপ্তানি বাড়লেও ৫,২৪৮ টন জাপানের মোট খাদ্যবাজারের তুলনায় ছোট। কোন অংশ প্রবাসী বাজারে, কোন অংশ নতুন গ্রাহকের ঘরে পৌঁছেছে—প্রকাশিত মোট অঙ্ক তা বলে না। ফলে নাট্টো ইতিমধ্যেই কিমচির মতো বিশ্বজুড়ে সর্বজনীন হয়েছে বলা অকাল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



