হাইলাইটস

  • ১৯৮৯ সালের ৪ জুন তিয়েনআনমেনস্কোয়ারে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের ওপর চীনা সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের ৩৭ বছর পূর্ণ হল।
  • ইতিহাসবিদদের মতে, হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি আন্দোলনের শুরুর দিনের আশা ও পরিবর্তনের স্বপ্নও ক্রমশ বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে।
  • চীনের ভিতরে কঠোর সেন্সরশিপের কারণে তিয়েনআনমেন নিয়ে প্রায় সব আলোচনা নিষিদ্ধ।
  • বিদেশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আর্কাইভ ও গবেষণা প্রকল্প সেই ইতিহাস সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।
  • রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ইতিহাসের বাইরে ব্যক্তিগত ডায়েরি, ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিকথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠছে।
  • প্রযুক্তি যেমন চীনের নজরদারি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে, তেমনি কর্মীদেরও নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছনোর সুযোগ করে দিয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৮৯ সালের ৪ জুন বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে যা ঘটেছিল, তা আধুনিক চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়গুলির একটি। সেদিন গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর চীনা সেনাবাহিনী গুলি চালায়। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আজও অজানা। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার মানুষ পর্যন্ত নিহত হতে পারেন।

তবে তিয়েনআনমেন নিয়ে আলোচনা যখন হয়, তখন সাধারণত রক্তপাত, ট্যাঙ্ক, গুলিবর্ষণ এবং বিখ্যাত ‘ট্যাঙ্ক ম্যান’-এর ছবির কথাই সামনে আসে। ইতিহাসবিদদের মতে, এর ফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়ালে থেকে যাচ্ছে—সেই আন্দোলনের প্রথম দিককার উচ্ছ্বাস, আশাবাদ এবং পরিবর্তনের স্বপ্ন।

ইতিহাসবিদ জেফ্রি ওয়াসারস্ট্রম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে চীনের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করছেন, বলেন, “অনেকেই ভুলে যান যে আন্দোলনের শুরুতে এক ধরনের আশা, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তেজনা ছিল।”

এই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির অন্যতম সাক্ষী অস্ট্রিয়ান সিনোলজিস্ট ও সাংবাদিক ড. হেলমুট ওপলেটালের তোলা ছবি। ১৯৮৯ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে অবস্থানকালে তিনি শত শত আলোকচিত্র ধারণ করেন। সেই ছবিগুলিতে দেখা যায় তরুণ-তরুণীরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের দাবিতে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, মুখে হাসি, আঙুলে বিজয়চিহ্ন।

আজ সেই ছবিগুলি সংরক্ষিত রয়েছে ‘চায়না আনঅফিশিয়াল আর্কাইভস’ (CUA)-এ, একটি অলাভজনক উদ্যোগ যা ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের লক্ষ্য, রাষ্ট্রের সেন্সরশিপে চাপা পড়ে যাওয়া চীনের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা।

সংস্থাটির এক সম্পাদক, যিনি নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করেন, বলেন, “ইতিহাস শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা লেখা যেতে পারে না। মানুষ যদি সত্যিকারের তথ্য না পায়, তাহলে স্বাধীনভাবে চিন্তা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।”

চীনে তিয়েনআনমেন হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা কার্যত নিষিদ্ধ। পাঠ্যপুস্তক, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গা থেকেই ঘটনাটির উল্লেখ মুছে ফেলা হয়েছে। যাঁরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন বা পরে স্মরণসভা করার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের অনেকেই হয়রানি, গ্রেপ্তার কিংবা দীর্ঘ কারাবাসের শিকার হয়েছেন।

সম্প্রতি চীনা মানবাধিকারকর্মী ডং গুয়াংপিং ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় পালানোর চেষ্টা করেন। অতীতে তিয়ানআনমেন স্মরণে উদ্যোগ নেওয়ার কারণে তিনি একাধিকবার কারাবন্দি হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার হেফাজতে রয়েছেন।

চায়না আনঅফিশিয়াল আর্কাইভসে সংরক্ষিত উপকরণের মধ্যে রয়েছে এক বিমানসেনার ডায়েরি, যিনি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিলেন, এবং রাষ্ট্রায়ত্ত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের তৈরি এমন সব তথ্যচিত্র, যেগুলি কখনও সরকারি অনুমোদন পায়নি।

সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিক ইয়ান জনসন বলেন, “আমরা কোনও রাজনৈতিক প্রচার করছি না। আমরা শুধু একটি নিরপেক্ষ তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে চাই।”

তবে এই কাজ সহজ নয়। চীনের সরকারি ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক যে কোনও তথ্যই সরকারের নজরে পড়ে। সংস্থাটির ওয়েবসাইট বহুবার হ্যাক করার চেষ্টা হয়েছে এবং চীনা কর্মীরা নানা ধরনের হুমকি পেয়েছেন।

তিয়ানআনমেন ইতিহাস সংরক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে এক ব্যক্তির ডায়েরিকে কেন্দ্র করে। তিনি হলেন লি রুই, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এক প্রবীণ নেতা এবং একসময়ের মাও জে দং -এর ব্যক্তিগত সচিব।

লি রুই তাঁর জীবনের প্রতিদিনের ঘটনা বিস্তারিতভাবে লিখে রাখতেন। তাঁর ডায়েরিতে ১৯৮৯ সালের জুন মাসের ঘটনাবলিরও উল্লেখ রয়েছে। তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের দিকে মুখ করা একটি বারান্দা থেকে তিনি সেনাবাহিনীর অভিযান প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেই সপ্তাহান্তকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন “কালো সপ্তাহান্ত” হিসেবে এবং লিখেছিলেন, “সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল।”

এই ডায়েরিগুলি বর্তমানে হুভার ইন্সটিটিউশন-এ সংরক্ষিত রয়েছে। লি রুইয়ের কন্যা সেগুলি সেখানে জমা দেন, কারণ তাঁর আশঙ্কা ছিল চীনে ফিরিয়ে নিয়ে গেলে সেগুলি হয়তো ধ্বংস করে দেওয়া হবে বা জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে সরিয়ে রাখা হবে।

এ বছর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালত রায় দিয়েছে যে ডায়েরিগুলি যুক্তরাষ্ট্রেই থাকবে। লি রুইয়ের কন্যার মতে, এগুলি সংরক্ষিত থাকা জরুরি, কারণ এগুলি এমন প্রমাণ যা সরকারি বর্ণনার বাইরে ইতিহাসের আরেকটি মুখ দেখায়।

তিয়ানআনমেন আন্দোলনের প্রাক্তন ছাত্রনেতা ঝো ফেংসুও (Zhou Fengsuo) , যিনি বর্তমানে চীনের মানবাধিকার সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক, বলেন যে প্রতি বছরই নতুন ছবি, নতুন নথি এবং নতুন সাক্ষ্য সামনে আসছে।

তাঁর কথায়, “প্রতি বছর আমি তিয়েনআনমেন সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পারি। নতুন ছবি পাই, নতুন নথি পাই। তাই আমি মনে করি তিয়েনআনমেনের স্মৃতি এখনও জীবিত।”

চীনের রাষ্ট্রযন্ত্র যতই অতীতকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করুক না কেন, ইতিহাসের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাকে সম্পূর্ণরূপে বন্দি করে রাখা যায় না। কোনও পুরনো ডায়েরি, কোনও ভুলে যাওয়া ছবি, কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিচারণ—সবই একসময় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে ওঠে।

তিয়েনআনমেনের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই। চীনের ভেতরে স্মৃতি চাপা পড়তে পারে, বই থেকে নাম মুছে যেতে পারে, ইন্টারনেট থেকে ছবি উধাও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আর্কাইভ, গবেষক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রচেষ্টায় সেই রাতের ইতিহাস এখনও বেঁচে আছে। আর যতদিন সেই স্মৃতি বেঁচে থাকবে, ততদিন ১৯৮৯ সালের ৪ জুন কেবল একটি তারিখ নয়, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রশক্তির সংঘাতের এক চিরস্থায়ী প্রতীক হিসেবেই থেকে যাবে।