ছিয়ানব্বইয়ের দরজায় টাকা: তেল, মূল্যবৃদ্ধি ও বাণিজ্যের ত্রিমুখী চাপ

যা জানা জরুরি
- ডলারের দাম ৯৬ টাকা ছোঁয়ার ঠিক আগে থামল ভারতীয় মুদ্রা।
- ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তঃব্যাঙ্ক বাজারে এক ডলারের দাম দাঁড়ায় ৯৫.৯৫৫০ টাকা—এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে টাকার দুর্বলতম অবস্থান এবং জুলাইয়ের মাঝামাঝির পরে সবচেয়ে বড় এক…
- বাজার-অংশগ্রহণকারীদের ধারণা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মাধ্যমে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ডলার বিক্রি করায় ৯৬-এর সীমাটি এ দিন অক্ষত থেকেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ডলারের দাম ৯৬ টাকা ছোঁয়ার ঠিক আগে থামল ভারতীয় মুদ্রা। ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তঃব্যাঙ্ক বাজারে এক ডলারের দাম দাঁড়ায় ৯৫.৯৫৫০ টাকা—এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে টাকার দুর্বলতম অবস্থান এবং জুলাইয়ের মাঝামাঝির পরে সবচেয়ে বড় এক দিনের পতন। বাজার-অংশগ্রহণকারীদের ধারণা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মাধ্যমে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ডলার বিক্রি করায় ৯৬-এর সীমাটি এ দিন অক্ষত থেকেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক আনুষ্ঠানিকভাবে দৈনিক হস্তক্ষেপের তথ্য দেয়নি; তাই বিষয়টি বাজারের পর্যবেক্ষণ, নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা নয়।
চাপের প্রধান উৎস অপরিশোধিত তেল। ব্রেন্টের দাম এ দিন দুই শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপিছু ১০৮.২০ ডলার হয়। অগস্টে ভারতের অপরিশোধিত তেলের গড় আমদানি-মূল্য ছিল ৯০.১৯ ডলার; সেপ্টেম্বরে এখনও পর্যন্ত তা ১০৯.৭৬ ডলার। ভারত প্রয়োজনের অধিকাংশ তেল বিদেশ থেকে কেনে। ফলে একই পরিমাণ তেলের জন্য বেশি ডলার লাগলে আমদানি-ব্যয় বাড়ে, টাকার চাহিদা কমে এবং পরিবহণ থেকে সার—বহু পণ্যের দেশে উৎপাদন-খরচও বাড়তে পারে।
অগস্টের বাণিজ্য-তথ্য আপাতত কিছু স্বস্তি দিয়েছে। পণ্য-বাণিজ্যের ঘাটতি জুলাইয়ের ৩১.৯৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২৬.৮৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে; অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল প্রায় ৩২ বিলিয়ন। কিন্তু এই উন্নতির বড় কারণ রফতানির অসাধারণ উল্লম্ফন নয়, সোনা আমদানি জুলাইয়ের ৪.১৬ বিলিয়ন থেকে প্রায় অর্ধেক হয়ে ২.৩০ বিলিয়ন ডলারে নামা। পণ্য রফতানি জুলাইয়ের ৪৪.২৪ বিলিয়ন থেকে অগস্টে ৪৩.৮১ বিলিয়নে সামান্য কমেছে। একই সময়ে তেল আমদানি বছরওয়ারি ২৫.৮ শতাংশ বেড়ে ১৬.৬৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
পণ্য ও পরিষেবা একত্রে ধরলে ছবিটি উজ্জ্বলতর: অগস্টে মোট রফতানি আনুমানিক ৮২.৬৮ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের তুলনায় ২৫.৪১ শতাংশ বেশি। তবে বাণিজ্য মন্ত্রক নিজেই জানিয়েছে, অগস্টের পরিষেবা-রফতানির অঙ্ক অনুমান; রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সর্বশেষ পূর্ণ তথ্য জুলাই পর্যন্ত। ইলেকট্রনিক পণ্য, প্রকৌশলসামগ্রী ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের রফতানি বেড়েছে, কিন্তু এপ্রিল–অগস্টে সামগ্রিক বাণিজ্যঘাটতি আগের বছরের ৪৩.৯৪ বিলিয়ন থেকে ৬০.৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
মুদ্রার দুর্বলতার সঙ্গে সুদ ও শেয়ারবাজারও নড়েছে। দশ বছরের সরকারি ঋণপত্রের ফলন মে-র মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ স্তরে ওঠে এবং নিফটি প্রায় এক শতাংশ পড়ে। সিটি ও ডয়চে ব্যাঙ্ক ডিসেম্বরের বদলে অক্টোবরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুদবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। এটি পূর্বাভাসমাত্র; সিদ্ধান্ত নেবে মুদ্রানীতি কমিটি। উচ্চ সুদ টাকা ও মূল্যস্তরকে সামলাতে পারে, কিন্তু আবাসন, গাড়ি ও ব্যবসার ঋণও ব্যয়বহুল করে।
সাধারণ মানুষের কাছে বিনিময় হার দূরের সংখ্যা মনে হলেও তার প্রভাব দৈনন্দিন। তেলের দাম দীর্ঘদিন উঁচু থাকলে পেট্রল–ডিজেলের কর ও খুচরো মূল্য নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। রান্নার গ্যাস, বিমানভাড়া, আমদানিনির্ভর ওষুধের কাঁচামাল এবং বিদেশে পড়াশোনার খরচেও দুর্বল টাকার ছাপ পড়ে। আবার সফ্টওয়্যার বা বিদেশমুখী পরিষেবা সংস্থার ডলার-আয় টাকায় বদলালে বাড়তে পারে; অর্থাৎ প্রভাব সর্বত্র এক নয়।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সামনে লক্ষ্যগুলির টানাপোড়েন আছে। বাজারে বেশি ডলার ছাড়লে টাকার পতন সাময়িক ঠেকতে পারে, কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার খরচ হয়। সুদ বাড়ালে বিদেশি মূলধনের আকর্ষণ এবং সঞ্চয়ের আয় বাড়তে পারে, অথচ দেশে বিনিয়োগ ও চাহিদা মন্থর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জ্বালানির শুল্ক কমালে ভোক্তার চাপ কমে, কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজস্ব হারায়। তাই কোনও এক দিনের বিনিময় হার দেখে একটিমাত্র অস্ত্র প্রয়োগ নয়, মূল্য, বৃদ্ধি ও ভাণ্ডারের সম্মিলিত হিসাব প্রয়োজন।
এক দিনের বাজারপতনকে মুদ্রাসঙ্কট বলা অতিরঞ্জন, আবার সোনা আমদানি কমে ঘাটতি নামাকে স্থায়ী সাফল্য ভাবাও ভুল। মূল পরীক্ষা হল তেলের মূল্য কত দিন উঁচু থাকে, রফতানির গতি টেকে কি না এবং মূল্যবৃদ্ধি মজুরি ও ভোগে কতটা আঘাত করে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডলার বিক্রি সময় কিনতে পারে; ভারতের জ্বালানি-নির্ভর আমদানি কাঠামো বদলাতে পারে না। পরের মুদ্রানীতি পর্যন্ত সরকারি তথ্য ও বাজারের অনুমান আলাদা রেখেই পরিস্থিতি বিচার করা দরকার।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



