ভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে অমিত শাহের ঘোষণায় এনডিএর অন্দরে ভিন্ন সুর প্রকাশ্যে এল। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে জোটশাসিত ২১টি রাজ্যে এই বিধি চালুর লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তেলুগু দেশম পার্টি এবং শিবসেনা। কিন্তু নীতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেডের বক্তব্য, বিহারে তা কার্যকর করতে দেওয়া হবে না। ফলে বিজেপির দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে শরিকদের সম্মতি আদায়ের প্রশ্নটি ফের সামনে এসেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে লোকসভায় টিডিপির নেতা লাভু কৃষ্ণ দেবরায়ালু জানিয়েছেন, তাঁরা অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে সমর্থন করবেন। তবে অন্ধ্রপ্রদেশে বিষয়টি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে না। প্রয়োজন হলে তাঁরা বিবেচনা করবেন এবং গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে অবশ্যই কথা বলবেন। অর্থাৎ সমর্থন জানালেও তাৎক্ষণিক প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না চন্দ্রবাবু নায়ডুর দল।

টিডিপির এই অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে নায়ডু এই প্রশ্নে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন। পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়া আইন আনার ব্যাপারেও দলের আপত্তি ছিল। এখন অবস্থান কিছুটা নমনীয়। শিবসেনার পাশাপাশি হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চার সভাপতি সন্তোষকুমার সুমনও শাহের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে সমর্থনকারী দলগুলির বক্তব্য থেকেই সব রাজ্যে একই সময়ে, একই বিধান কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।

বিহারে আপত্তির কথা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন জেডিইউ নেতা শ্যাম রজক। তাঁর দাবি, জাতীয় স্তরে সংশ্লিষ্ট আইনকে সমর্থন করার সময়েও দল জানিয়েছিল, বিহারে তার প্রয়োগ মেনে নেবে না। সেই অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। বক্তব্যটি রজকের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; কেন্দ্রীয় কোনও আইন থেকে রাজ্যের অব্যাহতি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত এর ভিত্তিতে টানা যায় না।

জেডিইউর জাতীয় কার্যকরী সভাপতি সঞ্জয় ঝা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন। অন্যদিকে বিজেপি নেতা রামকৃপাল যাদব বলেছেন, সব শরিককে আস্থায় নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে। আবার শাহ যখন ঘোষণা করেছেন, তা বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। এই দুই বক্তব্যেই বিহারের জোটরাজনীতির টানাপোড়েন ধরা পড়ছে: বিজেপি এগোতে চায়, জেডিইউ নিজের আপত্তি জানাচ্ছে।

বিরোধী আরজেডির অভিযোগ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মাধ্যমে বিজেপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করতে চাইছে; এর প্রভাব সব ধর্মের মানুষের ওপর পড়বে। কংগ্রেসও বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি তুলেছে। ফলে বিতর্কটি এখন শরিকদের বৈঠকের গণ্ডি পেরিয়ে বিহারের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে জায়গা করে নিয়েছে।

আরেক শরিক চিরাগ পাসোয়ানের লোক জনশক্তি পার্টি, রামবিলাস শিবির, চূড়ান্ত অবস্থান জানানোর আগে খসড়া দেখতে চায়। চিরাগের বক্তব্য, ভারতের সামাজিক বিন্যাস বৈচিত্র্যময়; বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব প্রথা ও রীতিনীতি রয়েছে। সংবিধানেও সেই বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি আছে। তাই খসড়া প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট সকলের স্বার্থের মূল্যায়ন এবং বিস্তৃত আলোচনার পর দল সিদ্ধান্ত জানাবে।

চিরাগ বিশেষভাবে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল এবং ৩৭১এ ও ৩৭১জি অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর দলের ঘোষিত অবস্থান, সমতা এবং বৈচিত্র্য দুটিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক অর্থ, অভিন্নতার নীতিকে সমর্থন করা আর সরকারের তৈরি নির্দিষ্ট খসড়ায় সম্মতি দেওয়া এক বিষয় নয়। বিধানের ভাষা, ব্যতিক্রম এবং প্রয়োগের পরিণতি দেখার দাবি তাই জোটের ভেতর থেকেই উঠছে।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক এবং পারিবারিক অধিকারের মতো বিষয়। সংবিধানের সপ্তম তফসিলের যুগ্ম তালিকার পঞ্চম বিষয়ভুক্ত এসব ক্ষেত্রে সংসদ ও রাজ্য বিধানসভা উভয়েরই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে। সেই কারণেই রাজ্য ধরে আইন আনার সাংবিধানিক সুযোগ আছে।

সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে রাষ্ট্রকে বলা হয়েছে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির অন্তর্গত। আবার ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই নীতিগুলি শাসন পরিচালনায় মৌলিক হলেও আদালতের মাধ্যমে সরাসরি বলবৎযোগ্য নয়। ফলে সংবিধানে লক্ষ্যটির উল্লেখ থাকাই কোনও নির্দিষ্ট খসড়ার সমস্ত বিধানকে প্রশ্নাতীত করে দেয় না। কীভাবে সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও স্বীকৃত প্রথার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য কী হবে, সেই বিচারও প্রয়োজন।

এখানে পার্থক্য জরুরি। রাজ্য নিজে আইন করবে কি না, সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সংসদের প্রণীত বৈধ আইন রাজ্যে প্রযোজ্য হবে কি না, সেই সাংবিধানিক প্রশ্ন আলাদা। তাই কোনও শরিকের আপত্তিকে আইনি ছাড় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণাও নিজে আইন নয়; বাস্তব প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, অনুমোদন এবং কার্যকর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। বিতর্কের পরবর্তী পর্যায়ে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বিজেপির রাজ্যভিত্তিক পথ বেছে নেওয়ার রাজনৈতিক সুবিধাও রয়েছে। একসঙ্গে জাতীয় আইন আনলে বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যক্তিগত আইন ও প্রথার বিপুল পার্থক্য সামলাতে হবে। আলাদা রাজ্যে এগোলে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী বিধান তৈরি এবং প্রয়োগের অভিজ্ঞতা যাচাই করা যায়। উত্তরাখণ্ড, গুজরাত, অসম ও মধ্যপ্রদেশে সংশ্লিষ্ট আইন পাস হয়েছে; কার্যকর হয়েছে উত্তরাখণ্ডে।

উত্তরাখণ্ডের বিধিতে বিবাহ, বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারের পাশাপাশি সহবাসের সম্পর্ক নথিভুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। অন্য রাজ্যগুলির বিধানের সঙ্গে মিল থাকলেও সব আইন অভিন্ন নয়। তফসিলি জনজাতির জন্য ছাড়ও রয়েছে। ফলে বিতর্কের বাস্তব প্রশ্ন, কোন বিষয়ে সবার জন্য এক নিয়ম হবে এবং কোন ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা বজায় থাকবে। শাহের সময়সীমা এই দীর্ঘ বিতর্ককে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করেছে।

শরিকদের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে আপাতত যে ছবি পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ঘোষণার পরে সমঝোতার কাজ এখনও বাকি। টিডিপির সমর্থন বিজেপিকে উৎসাহ দেবে, কিন্তু বিহারের আপত্তি এবং চিরাগের খসড়া দেখার দাবি এড়িয়ে অগ্রগতি সহজ হবে না। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হবে শাহের সঙ্গে জেডিইউর আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির স্পষ্ট সিদ্ধান্ত।