মেনু কার্ডে মোক্ষ নেই

যা জানা জরুরি
- ওদিকে রান্নাঘর থেকে মাছের ঝোল কিংবা খাসির মাংসের গন্ধ ভেসে আসছে।
- ততক্ষণে আপনার মোবাইলে এক ধর্মীয় বক্তৃতা এসে হাজির—দুর্গাপুজোর সময় আমিষ খেলে আপনার ভক্তি নাকি মাইনাস হয়ে যাবে।
- অর্থাৎ সকালবেলা আপনি দিব্যি নিষ্ঠাবান ভক্ত, হাতে ফুল নিয়ে অঞ্জলি দিচ্ছেন; দুপুরে ভাতের পাশে এক টুকরো মাছ কিংবা এক পিস মাংস পড়তেই, আপনার সকালের…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অয়ন মুখোপাধ্যায়: অষ্টমীর অঞ্জলি শেষ। আপনি হয়তো প্যান্ডেল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। ধূপের গন্ধ তখনও আপনার জামায় লেগে। ওদিকে রান্নাঘর থেকে মাছের ঝোল কিংবা খাসির মাংসের গন্ধ ভেসে আসছে। ততক্ষণে আপনার মোবাইলে এক ধর্মীয় বক্তৃতা এসে হাজির—দুর্গাপুজোর সময় আমিষ খেলে আপনার ভক্তি নাকি মাইনাস হয়ে যাবে। অর্থাৎ সকালবেলা আপনি দিব্যি নিষ্ঠাবান ভক্ত, হাতে ফুল নিয়ে অঞ্জলি দিচ্ছেন; দুপুরে ভাতের পাশে এক টুকরো মাছ কিংবা এক পিস মাংস পড়তেই, আপনার সকালের অর্জিত পুণ্য সোজা পাপের খাতায় ট্রান্সফার! চিত্র গুপ্ত কেও আপনার জন্য এ বার একটা নতুন কলাম খুলতে হবে—‘অঞ্জলির পরে দুপুরে কী খেয়েছিলেন?’ যমরাজের বিচারসভায় মেনু কার্ডটাও তখন নথি হিসেবে জমা পড়বে।
হঠাৎ ২০২৬ সালে পুজোর মুখে এই প্রশ্ন উঠছে কেন? কারণ অতি সম্প্রতি বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় মাছ-মাংস না খাওয়ার কথা বলেছেন এবং যাঁরা তা খান তাঁদের ‘পাখণ্ডী’ বলেও আক্রমণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকেও বলতে হয়েছে, বাঙালি কী খাবে তা কেউ বাইরে থেকে ঠিক করে দিতে পারে না।
কিন্তু মাছ না মাংস, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায়। কোন খাবার খেলে আপনি খাঁটি হিন্দু—এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আসলে বানালো কে? নতুন সিলেবাসে কি লুচি পাস, মাছ ফেল, আর কষা মাংস দেখলেই সাপ্লিমেন্টারি? কেউ নিরামিষ খাবেন, কেউ উপোস করবেন, কেউ পেঁয়াজ-রসুন ছোঁবেন না—সবই তাঁর নিজের নিজের ধর্মাচার। তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে তা মানুন। কিন্তু নিজের বাড়ির নিয়ম এর বই কে হাতে নিয়ে কয়েক কোটি মানুষের ধর্মের নম্বর দিতে বসলে ইতিহাস চর্চার শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আমাদের আর তো কোন গতি দেখি না।
এই প্রসঙ্গে প্রথমেই বলি ভারতের হিন্দু ধর্মাচার কোনও দিন এক ছাঁচে চলেনি। বরং শৈবরা এক পথে গেছেন, বৈষ্ণবরা অন্য পথে, শাক্তরা আবার অন্য পথে। স্মার্ত, তান্ত্রিক, লোকদেবতার উপাসক—সকলেই এই দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। অঞ্চল বদলেছে, আচার আচরণ বদলেছে, ঈশ্বরকে ভোগ নিও নিবেদনের নিয়ম নীতিও বদলেছে, আবার অন্যদিকে বদলেছে দেবতার সামাজিক চেহারাও। বাংলার দুর্গাপুজো, গুজরাটের নবরাত্রি আর নেপালের দশৈঁ একই দেবীকে ঘিরে, অথচ তিনটির রীতি কিন্তু এক নয়। সুতরাংএই পার্থক্য হিন্দুধর্মের দুর্বলতা নয়; বরং এই বহুরূপের ভিতর দিয়েই তার ইতিহাস এগিয়েছে। এটাই তার বৈশিষ্ট্য।
দুর্গাপুজোর ইতিহাস নিয়ে বিহানি সরকারের বিশ্লেষণ জানাটা আমাদের কাছে অত্যন্ত জরুরি। কারণ তিনি রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের দুর্গাপূজাতত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, মধ্যযুগীয় বাংলার দুর্গাপুজো বহু পুরনো শাস্ত্রীয় বিধি ও প্রচলিত আচারের ভিতর দিয়ে নিজের রূপ পেয়েছিল। তাঁর গবেষণায় আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—পাল যুগ থেকেই বাংলার ধর্মসংস্কৃতিতে দেবীরা বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিলেন। অর্থাৎ কোনও এক সকালে কোনও এক পণ্ডিত বসে বসে আজকের দুর্গাপুজোর নিয়ম-নীতি আদর্শ বানিয়ে দেননি।
পাল যুগ গেছে, মধ্যযুগ এসেছে, জমিদারি পর্ব এসেছে, পারিবারিক পুজো বেড়েছে, বারোয়ারি এসেছে, পরে সর্বজনীন। প্রতিটি সময় দুর্গাপুজোর শরীরে কিছু যোগ করেছে, কিছু বদলেছে। রঘুনন্দনও আগের নানা শাস্ত্রীয় সূত্র ঘেঁটে নিজের বিধান সাজিয়েছিলেন। আমরা আজ যাকে খুব সহজে ‘চিরকালীন’ বলে দিই, তারও জন্ম আছে, ইতিহাস আছে, আঁকাবাঁকা পথ আছে। ইতিহাসে কোনও আচার আচরণ কোনো ফ্রিজে রাখা খাবারের মতো হাজার হাজার বছর একই অবস্থায় থাকবে তা হয় না বরং সেটা ফ্লেক্সিবল এটাই স্বাভাবিক।
বাংলার শাক্তধর্মের ভেতরে ঢুকলে আমরা দেখব এক-খাদ্য, এক-রীতির তত্ত্বর মধ্যে লুকিয়ে আছে আরো এক বিপদ। যেমন বিভিন্ন গবেষক দুর্গা, কালী ও জগদ্ধাত্রী পুজোকে ঘিরে বাংলার উৎসবের ইতিহাস লিখতে গিয়ে দেখেছেন বিভিন্ন রকমের বলি প্রথা , সামাজিক প্রতিযোগিতা, জনসমাগম, মর্যাদার লড়াই এবং তান্ত্রিক আচারের দীর্ঘ উপস্থিতি । বিভিন্ন গবেষক দের লেখায় আমরা স্পষ্ট পাই দেবীপুজোর সঙ্গে রক্তবলির ইতিহাসও। অনেক গবেষক আবার বাংলার শাক্তধর্মকে এক রাস্তার ধর্ম হিসেবে দেখেননি। বরং একে দেখেছেন লোকশাক্ত, তান্ত্রিক-যোগিক শাক্ত, ভক্তিমূলক শাক্ত—বিভিন্ন পথ হিসেবে তাদের মতে এগুলো কখনও পাশাপাশি চলেছে, আবার কখনও একে অন্যের সঙ্গে মিশেছে।
সুতরাং সব শাক্ত একই আচার মানেননি, সব তান্ত্রিকও একই পথে হাঁটেননি। এই কথাটাই আসল। ধর্মীয় পরিসরের ভিতরেই মত, পথ, সাধনা আলাদা ছিল। তাই আজ কারও ব্যক্তিগত খাদ্য পছন্দ কে ইতিহাসের একমাত্র সত্য বানিয়ে দিলে ইতিহাসের আপত্তি সেখানে থাকবেই ।
উল্টো দিকটাও সমান সত্য। বৈষ্ণব ধর্মের বহু ধারায় নিরামিষ আহার, সংযম ও অহিংসা গভীর সাধনার অংশ। বাংলার অসংখ্য পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই নিয়ম মেনে এসেছে। কেউ প্রাণিহত্যা কে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন, কেউ বা খাদ্যসংযমের মধ্যে সাধনা খুঁজে পেয়েছেন—এক্ষেত্রে আমাদেরকে তাঁর বিশ্বাসকে সম্মান করতেই হবে। নিরামিষ ভোজনকে বিদ্রুপ করাও যেমন অজ্ঞতা, তেমনই নিরামিষ ভোজন কে গোটা হিন্দুধর্মের বাধ্যতামূলক ইউনিফর্ম পরিয়ে দেওয়া এক ধরনের এক ধরনের মূর্খামী এক ধরনের অজ্ঞতা।
প্রসঙ্গত সীমারেখাটা এখানে খুব সহজ।আমি নিরামিষ খাইএটাই আমার সাধনা।
আপনাকে ও নিরামিষ খেতে হবেএটা আমার দাবি।আপনি মাছ খেলেই ভণ্ডএটা আমার অহমিকাআমার ঔদ্ধত্য।
নিজের জিভ সামলানো কঠিন। তুলনায় অন্যের জিভ পাহারা দেওয়া অনেক সহজ। সম্ভবত সেই কারণেই দ্বিতীয় কাজটির বাজার এত ভালো ভাবনাটা এত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
আমরা যেন ভুলে না যাই বাংলার খাদ্যের ইতিহাসও নিরামিষ-আমিষ দুই কলামের এক্সেল শিট নয়। নদী, খাল, বিল, পুকুরের এই ভূখণ্ডে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, গুগলি বহু যুগ ধরে আমাদের খাদ্য ও জীবন জীবিকার অংশ। আবার বৈষ্ণব প্রভাবে নিরামিষ রান্নাও বাংলায় নিজস্ব এক বিরাট ঐতিহ্য তৈরি করেছে। এক বাড়ির দুর্গাপুজোর ভোগ অন্য বাড়ির মতো নয়; অঞ্চল বদলালে রান্নাও বদলায়। বাংলার মাটি, জল, জীবিকা, জাতপাত, ধর্ম আর পরিবারের নিজস্ব রীতি মিলেই মানুষের পাত সেজে উঠেছে। অতএব কোনও একটি খাদ্যতালিকাকে ‘বাংলার সনাতন নিয়ম’ বলে চালাতে গেলে তাহলে আমাদের বাংলার ইতিহাসটাকেই অনেকখানি কেটে বাদ দিয়ে দিতে হবে।
খাবারকে ধর্মীয় পরিচয়ের মাপকাঠি বানানোর রাজনীতিও নতুন নয়। ইতিহাসবিদ চারু গুপ্ত ঔপনিবেশিক উত্তর ভারতের হিন্দি রান্নার বই ঘেঁটে দেখিয়েছেন, বিশ শতকের গোড়ায় উচ্চবর্ণীয় হিন্দু মধ্যবিত্তের একাংশ নিরামিষ খাদ্যকে ক্রমশ ‘আদর্শ হিন্দু’ রুচির সঙ্গে বেঁধে ফেলেছিল। নিরামিষ খাওয়া তখন শুরু হয়নি; তার ইতিহাস কিন্তু অনেক পুরনো। নতুন ছিল একটি বিশেষ খাদ্যরুচিকে গোটা হিন্দু পরিচয়ের আদর্শ হিসেবে মানুষের কাছে নমুনা বানানোর চেষ্টা। তখন এইসবের মধ্যে ঢুকে পড়ে।রান্নাঘরের সঙ্গে জাত, শুচিতা, নারী, সংসার ও জাতীয়তার ধারণাও ।
এইখানেই ‘পবিত্রতা’র রাজনীতি রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। কে শুদ্ধ, কে অশুদ্ধ; কে আসল, কে নকল; কার হাতের জল খাব আর কার সঙ্গে বসে খাব না, —তখন এই বিতর্ক গুলো আর শুধু পেটের বিষয় থাকে না। মানুষ খাবার কে সামনে রেখে আর এক মানুষকে সামাজিক খোপে ঢোকাতে শুরু করে। জাত আর শুচিতার পুরনো প্রহরী তখন রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে ।
ঔপনিবেশিক বাংলার খাবার নিয়ে আরও একটা জরুরি কথা আলোচনা করা যেতে পারে। যেখানে দেখা যায় বাঙালি মধ্যবিত্ত নতুন খাবার নিয়েছে, বিদেশি উপকরণকে নিজের স্বাদে বদলেছে, অথচ পুরনো রীতি কে সে কিন্তু পুরো পুরি ছুড়ে ফেলে দেয় নি। তাই আমরা দেখি আধুনিক বাঙালি রান্না একই সঙ্গে নতুনের দিকে হাত বাড়িয়েছে এবং প্রাক্-ঔপনিবেশিক অনেক অভ্যাস কেও সে ধরে রাখতে পেরেছে। সুতরাং রান্নাঘর তাই কোনও জাদুঘর নয়; যেখানে পুরনো আর নতুন একই উনুনে ফুটেছে।
আরও পুরনো ইতিহাসে গেলেও সেই একই জটিলতা। আমরা দেখতে পাই গবেষকরা মনে করেন প্রত্নতত্ত্ব, সাহিত্য, উদ্ভিদবিদ্যা, অঞ্চল ও ধর্মীয় অভ্যাস মিলিয়ে ভারতীয় খাবারের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেখানে মাংস, মাছ, মদ, শস্য, নিরামিষ—সবই বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সমাজে এসেছে; বৌদ্ধ ও জৈন প্রভাবের সঙ্গে নিরামিষতার বিস্তারও আমরা দেখতে পাই।
রামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দকে এই প্রসঙ্গে আনলে ব্যাপারটা বুঝতে আমাদের সহজ হবে । শ্রীরামকৃষ্ণ মানুষের আলাদা রুচি ও আলাদা সাধনক্ষমতা বোঝাতে মাছেরই উদাহরণ দিয়েছিলেন—কেউ ঝোল পছন্দ করে, কেউ ভাজা, কেউ আচার, কেউ পোলাও। অন্যত্র তিনি বলেন, মা যেমন সন্তানদের হজমশক্তি বুঝে একই মাছ আলাদা ভাবে রান্না করেন, তেমনই মানুষের পথও এক নয়। ধর্মের বহুত্ব বোঝাতে তিনি মাছকে উদাহরণ করেছিলেন; আজ আমরা সেই মাছকেই ধর্ম থেকে বহিষ্কার করতে ব্যস্ত।
আর নরেন্দ্রনাথ? ১৮৮৬ সালের কাশীপুরের কথোপকথনে তাঁর সরাসরি স্বীকারোক্তি—তিনি মাংস খান, আবার শুধু ভাত, এমনকি নুন ছাড়াও থাকতে পারেন। অর্থাৎ খাবার তাঁকে শাসন করত না; তিনি খাবারকে নিজের সাধনার মাপকাঠি বানাননি। পরে তাঁর সখার প্রতি কবিতায় লিখলেন—“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” আমরা বোধহয় ‘জীব’ থেকে একটু সরে এসে ‘জিভে’ আটকে পড়েছি। জীবে প্রেমের চেয়ে এখন জিভ পাহারায় বেশি উৎসাহী।
গীতায় খাদ্য নিয়ে আলোচনা আছে। কিন্তু সেই গীতাই কর্ম, জ্ঞান, সংযম, আসক্তি, কর্তব্য আর মানুষের গুণ নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তোলে। এই প্রসঙ্গে আলোচনা কালে আমার মনে পড়ে যায় ১৯৭১-এর হরে রামা হরে কৃষ্ণ ছবিতে আনন্দ বক্সীর লেখা একটা গানের চারটি লাইন
রাম কো সমঝো, কৃষ্ণ কো জানো,
নীন্দ সে জাগো ও মস্তানো,
জিত লো মন কো পড় কে গীতা,
মন হি হারা তো ক্যা জিতা।
কথাটা খুব সোজা। গীতা পড়ে নিজের মনটাকেই যদি জয় করতে না পারি, অথচ পাশের মানুষের পাত জয় করতে বেরিয়ে পড়ি, তা হলে গীতাপাঠের লাভটা কোথায়? মানুষের চরিত্র বিচার কঠিন; তার প্লেট বিচার করতে পাঁচ সেকেন্ড লাগে। সম্ভবত সেই কারণেই আমরা দ্বিতীয় কাজে এত দক্ষ।
একজন নিরামিষভোজী মানুষ মিথ্যা বলতে পারেন, ঘুষ নিতে পারেন, অধস্তনকে অপমান করতে পারেন, কর্মচারীর পাওনা মারতে পারেন। আবার মাছ-মাংস খাওয়া একজন মানুষ সৎ হতে পারেন, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন।তাই খাদ্য সংস্কৃতির অংশ, কারও কাছে সাধনারও অংশ; কিন্তু নৈতিকতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। নবমীতে মাংস না খেয়ে সারাদিন দশজনকে ঠকালে পাতে পনির থাকার জন্য ধর্মরাজ নিশ্চয়ই বোনাস নম্বর দেবেন না।
ধর্মের আসল প্রশ্ন তাই অন্য জায়গায়। ধর্ম কি আমাকে নিজের লোভ, ক্রোধ, হিংসা আর অহংকার সামলাতে শেখাবে, না কি পাশের বাড়ির ফ্রিজে কি খাবার আছে সেটা পরীক্ষা করতে পাঠাবে? প্রথম কাজের জন্য সাধনা লাগে। দ্বিতীয় কাজের জন্য একটা মোবাইল আর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস হলেই চলে।
দুর্গার দশ হাতে দশটি অস্ত্র। একাদশ অস্ত্র হিসেবে মেনু কার্ডটির উল্লেখ অন্তত কোনও পুরনো শাস্ত্রে আজ অব্দি আমার চোখে পড়েনি।
দুর্গার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা প্রতি বছর অসুরবধের গল্প বলি। কিন্তু অসুরকে শুধু প্রতিমার পায়ের নীচে খুঁজলে মূর্খামি হবে। অহংকারও অসুর, অসহিষ্ণুতাও অসুর, নিজের বিশ্বাসকে একমাত্র সত্য ভেবে অন্য মানুষকে অপমান করার ইচ্ছাটাও আসলে অসুর। সেই অসুর যদি আমাদের ভিতরে দিব্যি খেয়ে-দেয়ে বেঁচে থাকে, তাকে চার দিনের পুজো শেষে গঙ্গায় নামিয়ে দিলেই বিসর্জন হবে না।
বিবেকানন্দ ধর্ম নিয়ে একটা কথা বলেছিলেন—“Religion is realization.” ধর্ম শুধু কথা, মতবাদ কিংবা সুন্দর তত্ত্ব নয়; মানুষের ভিতরে তার ফল দেখা চাই। ১৮৯৩ সালের শিকাগো বক্তৃতায় তিনি আরও বলেছিলেন, “Unity in variety is the plan of nature.” বহুত্ব প্রকৃতিরই নিয়ম; নিজের একটিমাত্র ছাঁচ সবাইকে পরিয়ে দেওয়া তার বিপরীত।
ধর্ম যদি মানুষকে আরও সত্যবাদী, সংযমী, ন্যায়পরায়ণ ও সহিষ্ণু না করে, তা হলে রান্নাঘরের শুচিতা দিয়ে সেই অভাব ঢাকা যায় না। ঈশ্বরকে রক্ষা করার দায়ও মানুষের নয়। ঈশ্বর যদি সত্যিই অসীম হন, তাহলে এক টুকরো মাছ কিংবা মাংস তাঁকে ছোট করতে পারবে না।
সুতরাং আজ এই ২০২৬-এ ঈশ্বরের নাম করে অন্য মানুষকে ছোট করতে করতে আমরা হয়তো শেষ পর্যন্ত ঈশ্বর কেও নিজের সংকীর্ণতার মাপে নামিয়ে ফেলেছি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



