সংস্কৃতি ও বিনোদন

যে ৪৮ ঘণ্টায় ফুলন হয়ে উঠলেন ‘দস্যুরানি’, রিচি মেহতার নতুন ছবিতে সেই অধ্যায়

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • প্রশংসিত ‘দিল্লি ক্রাইম’ ধারাবাহিকের কাজ সবে শেষ করেছেন কানাডার চলচ্চিত্র পরিচালক রিচি মেহতা।
  • সেই সময় তাঁর কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে নমাহ পিকচার্স।
  • প্রযোজনা সংস্থাটি ফুলন দেবীর আত্মজীবনী ‘আই, ফুলন: দ্য অটোবায়োগ্রাফি অব ইন্ডিয়াস ব্যান্ডিট কুইন’-এর স্বত্ব কিনেছিল।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: ২০১৯ সাল। প্রশংসিত ‘দিল্লি ক্রাইম’ ধারাবাহিকের কাজ সবে শেষ করেছেন কানাডার চলচ্চিত্র পরিচালক রিচি মেহতা। সেই সময় তাঁর কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে নমাহ পিকচার্স। প্রযোজনা সংস্থাটি ফুলন দেবীর আত্মজীবনী ‘আই, ফুলন: দ্য অটোবায়োগ্রাফি অব ইন্ডিয়াস ব্যান্ডিট কুইন’-এর স্বত্ব কিনেছিল। সমকালীন প্রেক্ষাপটে ফুলনের কাহিনি নতুন করে বলতে চেয়েছিলেন প্রযোজকেরা। প্রথমে অবশ্য ইতস্তত করেছিলেন চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক মেহতা। তাঁর নিজের কথায়, তিনি যে “একজন প্রবাসী ভারতীয়, পঞ্জাবি এবং পুরুষ চলচ্চিত্রকার”। কিন্তু বইটি পড়ার পরে তাঁর মন বদলে যায়।

ফুলনের গোটা জীবন তুলে ধরার বদলে মেহতা বেছে নেন একটি বিশেষ অধ্যায়। আত্মজীবনীর সেই অংশে রয়েছে, কী ভাবে সতেরো বছরের ফুলনকে ধরতে দু’হাজার সশস্ত্র লোক মোতায়েন করা হয়েছিল। অবরোধ চলেছিল টানা ৪৮ ঘণ্টা। সেই অবরোধ, তাঁর সঙ্গীর খুন এবং পরবর্তী গণধর্ষণের অভিজ্ঞতাই গড়ে দিয়েছিল ‘দস্যুরানি’ ফুলনের পরিচয়।

ওই অবরোধের কাহিনি নিয়েই মেহতার ছবি ‘ফুলন’। শুক্রবার টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ‘স্পেশাল প্রেজেন্টেশন’ বিভাগে ছবিটির প্রথম প্রদর্শন হল।

মেহতা বলেন, “বইয়ে ঘটনাটি তিনি লিখেছেন একেবারে নিরাবেগ ভঙ্গিতে—জীবনের আরও অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে এটিও যেন একটি। তাঁর বিরুদ্ধে পরিস্থিতি কতখানি প্রতিকূল ছিল, বিশ্ববাসীর কাছে তা যথাযথ ভাবে তুলে ধরার পথ হয়ে উঠল এই ঘটনাটি।”

২০০৭ সালে ‘অমল’ দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন মেহতা। তিনি বলেন, “ফুলন দেবীর জীবন দেখায়, একেবারে নিঃসম্বল অবস্থা থেকে কী ভাবে একজন নারী নিজের শক্তি অর্জন করেছিলেন। আমার মনে হয়েছিল, হয়তো এই জরুরি কাহিনিটি পৃথিবীকে দেখানোর সময় এসেছে।”

১৯৬৩ সালে উত্তরপ্রদেশের ছোট্ট গ্রাম ঘুরা কা পুরওয়ায় জন্ম ফুলন দেবীর। পরবর্তী জীবনে চম্বল উপত্যকার দস্যু হয়ে ওঠেন তিনি। হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম আলোচিত ও বিস্ময়জাগানো ব্যক্তিত্ব।

১৯৮৩ সালে আত্মসমর্পণ করেন ফুলন। এগারো বছর কারাগারে কাটানোর পরে ১৯৯৪ সালে মুক্তি পান। তার পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুর থেকে দু’বার সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ২৫ জুলাই নয়াদিল্লিতে নিজের বাসভবনের বাইরে তাঁকে হত্যা করা হয়।

পর্দায় ফুলনের কাহিনি নতুন করে বলতে গিয়ে তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া ও জীবনকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন মেহতা। তিনি বলেন, “আমরা যেন ফুলনকে কেবল নির্যাতিতের ভূমিকায় হাজির না করি, সেটা জরুরি ছিল। তিনি ছিলেন নিজের শক্তিতে পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষমতাসম্পন্ন একজন মানুষ। বাস্তব হল, সমস্ত প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই তিনি সেই জায়গায় পৌঁছেছিলেন।”

ফুলন নিজের জীবনকে কী ভাবে দেখতেন, তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির কী ব্যাখ্যা করতেন—আত্মজীবনী থেকে তার স্পষ্ট ধারণা পেয়েছিলেন পরিচালক।

মেহতার কথায়, “তাঁর নিজের কথাকেই আমি ভিত্তি করেছি—তার বেশি বা কম কিছু নয়। লেখায় কয়েকটি বিষয়ে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন। সেগুলিই আমার মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। সবচেয়ে জরুরি ছিল দারিদ্র্য এবং নারী হওয়ার বাস্তবতা কী ভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে তাঁর জীবনের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই ছবিটি গড়ে তুলতে চেয়েছি। নিজের অভিজ্ঞতার মূল বাস্তবতা বলে তিনি যাকে চিহ্নিত করেছিলেন, তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চেয়েছি।”

পরিচালকের কাছে এই বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সংস্কৃতি ও লিঙ্গসমতার প্রশ্নে পিছিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এখনও দূর হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০১২ সালের দিল্লির গণধর্ষণের ঘটনার কথা বলেন, যা গোটা দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ‘দিল্লি ক্রাইম’-এর প্রথম পর্বমালার ভিত্তিও সেই ঘটনা।

মেহতা বলেন, “বাস্তবে আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে আছি, যেখানে ২০১২ সালের পরেও অবস্থার উন্নতি হয়নি।”

চলচ্চিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর মনে হয়, ফুলনের কাহিনি এমন এক সশস্ত্র সংঘর্ষকে সামনে আনে, যার কেন্দ্রে রয়েছে নারী-পুরুষের বৈষম্য। তাঁর কথায়, “এমন ঘটনা আগে শোনা যায়নি। আমাদের স্বীকার করা জরুরি যে, গোটা পৃথিবীতে আমরা প্রতিনিয়ত ভয়াবহ শ্রেণিভিত্তিক হিংসার সাক্ষী হচ্ছি।”

চম্বল অঞ্চলেই ছবিটির শুটিং হয়েছে। কাজ শুরুর আগে সেখানকার স্থানীয় মানুষের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন মেহতা। তিনি বলেন, “বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বীকার করা জরুরি। একই সঙ্গে এই ছবির একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে সতেরো বছরের একটি মেয়ের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা।”

তিন মাস ধরে ‘ফুলন’-এর শুটিং হয়েছে। মেহতার মতে, শারীরিক পরিশ্রমের বিচারে এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন শুটিং।

তিনি বলেন, “কাজটা শরীরের উপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে, কারণ ওই ভূপ্রকৃতি এতটুকু ছাড় দেয় না। ভয়ানক গরম ছিল। তার উপর সেখানে পৌঁছনোও কঠিন। শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে যাওয়া এবং আমরা যে ব্যাপ্তিতে ছবিটি তৈরি করতে চেয়েছিলাম, তার আয়োজন করা সহজ ছিল না। তবে গোটা দল বিশ্বাস করত, এই কাহিনি বলা প্রয়োজন। সেই বিশ্বাসই সাহায্য করেছে।”

অন্ধকার বিষয় নিয়ে কাজ করা মেহতার কাছে নতুন নয়। ‘দিল্লি ক্রাইম’ কিংবা ২০২৪ সালের মালয়ালম ধারাবাহিক ‘পোচার্স’ তার সাক্ষ্য দেয়। তা সত্ত্বেও পৃথিবীতে আশার খোঁজ চালিয়ে যান তিনি।

মেহতা বলেন, “আমাদের চারপাশের এত ভয়াবহতার মধ্যে নিজের মনকে সামলে রাখার একমাত্র উপায় আমার কাছে এমন সব গল্প খুঁজে পাওয়া, যেখানে আছে হার না-মানার জেদ, আছে আলো।”

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles