সাত বছর পরে ভারতে শি, বাণিজ্য ও সম্পর্ক মেরামতির পরীক্ষা দিল্লিতে

যা জানা জরুরি
- প্রায় সাত বছরের বিরতির পরে ভারতে আসছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
- বেজিং নিশ্চিত করেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবেন তিনি।
- বহুপাক্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে এই সফর হলেও তার তাৎপর্য অনেকটাই ভারত ও চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ঘিরে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রায় সাত বছরের বিরতির পরে ভারতে আসছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বেজিং নিশ্চিত করেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবেন তিনি। বহুপাক্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে এই সফর হলেও তার তাৎপর্য অনেকটাই ভারত ও চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ঘিরে। দীর্ঘ সীমান্ত উত্তেজনার পরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা এবং বাণিজ্যিক বাধা কমানোর প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।
সফরের অর্থনৈতিক দিকটিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনের ফাঁকে চিনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও এবং ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গয়ালের আলোচনা হওয়ার কথা। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্যের বাস্তব সমস্যাগুলির কতটা সুরাহা হয়, সেই প্রশ্নে এই বৈঠক তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আলোচনা হওয়ার খবর এবং কোনও চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা এক বিষয় নয়; সফরের আগেই নির্দিষ্ট ছাড় বা সমঝোতাকে নিশ্চিত ফল হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।
শি শেষবার ভারতে এসেছিলেন ২০১৯ সালের অক্টোবরে। তামিলনাড়ুর মামল্লপুরমে মোদীর সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠক হয়েছিল। তখন দুই নেতৃত্ব মতপার্থক্যকে বিরোধে পরিণত হতে না দেওয়ার কথা বলেছিলেন। মোদী সেই সাক্ষাৎকে সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে তুলে ধরেন। ঐতিহাসিক স্থাপত্যের পটভূমিতে দুই নেতার সৌজন্যের ছবি সম্পর্কের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছিল। সাত বছর পরে শির প্রত্যাবর্তনের সময়ে সেই আশাবাদের পাশাপাশি পরবর্তী তিক্ত অভিজ্ঞতাও প্রাসঙ্গিক।
কারণ, ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গলওয়ানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সম্পর্ককে গভীর সঙ্কটে ঠেলে দেয়। সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন; চিন চার সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে। সীমান্তে সামরিক অচলাবস্থার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বাড়ে। ভারত চিনা বিনিয়োগের যাচাই কঠোর করে এবং বহু জনপ্রিয় চিনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে। ফলে বর্তমান স্বাভাবিকীকরণ আসলে কয়েক বছরের জমে থাকা অবিশ্বাস কাটানোর একটি জটিল, ধাপে ধাপে চলা প্রক্রিয়া।
সম্পর্ক মেরামতির পথে উল্লেখযোগ্য বাঁক আসে ২০২৪ সালের অক্টোবরে। বিতর্কিত সীমান্তে টহলদারি নিয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছয়। ওই মাসেই রাশিয়ায় ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে মোদী ও শির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। তাঁরা যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হন। পরে সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধিদের আলোচনাও এগোয়। তবে টহলদারির ব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতা হওয়া আর দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া এক কথা নয়।
২০২৫ সালের অগস্টে চিনের তিয়ানজিনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন উপলক্ষে মোদী ও শি আবার মিলিত হন। সেখানে সীমান্তের মতপার্থক্য সামলানো এবং সহযোগিতা বাড়ানোর কথা ওঠে। মোদী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির জন্য সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। শি উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে পরস্পরকে দেখার ওপর জোর দেন। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় দিল্লির সফর সম্পর্কের রাজনৈতিক গতি বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করছে।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা ভারসাম্যহীনতা। ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে চিন থেকে ভারতের পণ্য আমদানি ছিল প্রায় ১১,৩৫০ কোটি ডলার, সেখানে রফতানি প্রায় ১,৪৩০ কোটি ডলার। ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৯,৯২০ কোটি ডলারে। এই নির্দিষ্ট অর্থবর্ষের হিসাব দেখায়, শুধু মোট বাণিজ্য বাড়লেই ভারতের উদ্বেগ মেটে না। ভারতীয় পণ্য চিনের বাজারে কতটা জায়গা পাচ্ছে, সেই প্রশ্নও সমান জরুরি।
এই নির্ভরতার পিছনে শিল্পের কাঠামোগত প্রয়োজন রয়েছে। বৈদ্যুতিন সামগ্রী, ওষুধ এবং যন্ত্রশিল্পের বিভিন্ন উপকরণের জন্য ভারতীয় উৎপাদকেরা চিনের সরবরাহের ওপর নির্ভর করেন। সস্তায় উপকরণ পাওয়া উৎপাদনের সুবিধা করলেও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সমস্যা বাড়ে। ফলে বাণিজ্য আলোচনার গুরুত্ব আমদানি কমানো বা বাড়ানোর সরল হিসাবের বাইরেও বিস্তৃত: দেশীয় উৎপাদন, প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহের নিশ্চয়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।
তবে রাজনৈতিক সৌজন্য ফিরলেই ব্যবসার সব দরজা খুলছে না। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ভিসা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, বিনিয়োগ যাচাই এবং প্রযুক্তি সরবরাহ ঘিরে বাধার কথা উঠে এসেছে। ভারত কিছু চিনা বিনিয়োগের বিধিনিষেধ শিথিল করলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে চিনের দিক থেকেও কিছু প্রযুক্তি ও উৎপাদন সরঞ্জাম ভারতে পাঠানো নিয়ে অনীহা আছে। অর্থাৎ সন্দেহের প্রাচীর কেবল এক দেশের তৈরি নয়।
এর অর্থ, শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছাকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা জরুরি। কোনও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে সম্পর্কের উন্নতি তখনই অর্থবহ, যখন প্রয়োজনীয় যন্ত্র সময়মতো পৌঁছয়, বিশেষজ্ঞের আসার অনুমতি মেলে এবং বিনিয়োগের নিয়ম স্পষ্ট থাকে। এই বাস্তব সমস্যাগুলির অগ্রগতি দিয়েই বাণিজ্যমন্ত্রীদের আলোচনার কার্যকারিতা অনেকটা বোঝা যাবে। প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত।
মানুষের যাতায়াতও স্বাভাবিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। পাঁচ বছরের বেশি বিরতির পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সরাসরি বিমান চলাচল ফের শুরুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল দুই দেশ। ব্যবসায়ী, পর্যটক ও পেশাজীবীদের যোগাযোগ সহজ করার সঙ্গে এর যোগ রয়েছে। এই ধরনের পদক্ষেপের তাৎপর্য হল, সম্পর্কের উন্নতি সরকারি বৈঠকের বাইরেও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় পৌঁছতে পারে। আস্থা বাড়ানোর কাজ তাই শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের সাক্ষাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
ব্রিকসের মঞ্চ এই যোগাযোগের জন্য একটি রাজনৈতিক সুযোগ দেয়। ভারত ও চিন উভয়েই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য; আবার তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও কৌশলগত উদ্বেগও রয়েছে। ফলে একই মঞ্চে উপস্থিতি থেকে সব বিষয়ে ঐকমত্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সফরের তাৎপর্য বিচার করতে হবে আলোচনা কতটা ধারাবাহিক হয়, পুরনো সমস্যার সমাধানে কী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং ঘোষণার পরে বাস্তবে কী পরিবর্তন আসে, তার ভিত্তিতে।
সাত বছর পরে শির ভারত সফর তাই সম্পর্কের বরফ গলার উল্লেখযোগ্য ইঙ্গিত। কিন্তু স্থায়ী উন্নতির পরীক্ষা হবে সীমান্তের স্থিতি, বাণিজ্যের বাধা কমা এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে। ওয়াং–গয়াল আলোচনা সেই পরীক্ষার অর্থনৈতিক দিকটিকে সামনে আনবে। দিল্লির সম্মেলনে সৌজন্যের পাশাপাশি কার্যকর অগ্রগতি হয় কি না, এখন নজর থাকবে সেদিকেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



