ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললে প্রথমে কোন ছবি, খবর কিংবা ভিডিও দেখা যাবে, সেই সিদ্ধান্ত অনেকাংশেই নেয় সংস্থার অ্যালগরিদম। ব্যবহারকারীর সেই নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার সুযোগ বাড়াতে চাইছে অস্ট্রেলিয়া। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি অ্যালবানিজির সরকার ৮ সেপ্টেম্বর যে প্রস্তাব জানিয়েছে, তাতে মানুষ চাইলে স্বয়ংক্রিয় সুপারিশনির্ভর বিষয়বস্তুর প্রবাহ থেকে সরে আসতে পারবেন। উদ্যোগটির মর্মকথা: নিজের পাতায় কী দেখবেন, তা বাছবেন নিজেই। তবে এটি এখনও কার্যকর আইন নয়; পরামর্শ গ্রহণের পরে সংসদে বিল আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সামাজিক মাধ্যম সংস্থাগুলিকে ব্যবহারকারীর সামনে স্পষ্টভাবে দুটি বিকল্প রাখতে হবে। প্রথমটি, তাঁর সম্ভাব্য পছন্দ অনুমান করে যন্ত্রের সাজানো বিষয়বস্তু দেখা। দ্বিতীয়টি, কেবল নিজের বেছে নেওয়া বন্ধু, ব্যক্তি বা নির্মাতাদের প্রকাশনা দেখা। কোনটি মূল প্রদর্শনব্যবস্থা হবে, তা জানাতে পর্দায় বিজ্ঞপ্তি আসবে। ফলে বিকল্পটি খুঁজতে ব্যবহারকারীকে জটিল ব্যবস্থার মধ্যে ঘুরতে হবে না। পছন্দ পরে বদলানোর সুযোগও থাকবে। সরকারি বক্তব্য, প্রযুক্তি সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার একটি অংশ সাধারণ মানুষের হাতে ফেরানোই লক্ষ্য।

অ্যালগরিদম আসলে নির্দেশ ও গণনাপদ্ধতির সমষ্টি। সামাজিক মাধ্যমে সেটি অনুমান করে কোন প্রকাশনায় আপনার আগ্রহ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মেটার নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের আগের আচরণ, প্রতিক্রিয়া এবং কোনও প্রকাশনা অন্যকে পাঠানোর সম্ভাবনার মতো বিভিন্ন সংকেত মিলিয়ে এই বাছাই হয়। তাই আপনি যাঁদের অনুসরণ করেন না, তাঁদের বিষয়বস্তুও সামনে আসে। ধরা যাক, কয়েকটি রান্নার ভিডিওতে আগ্রহ দেখালেন; ব্যবস্থাটি আরও রান্নার ভিডিও সুপারিশ করতে পারে। একই যুক্তিতে অন্য বিষয়ও বারবার সামনে আসতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার উদ্বেগ, এই সুপারিশব্যবস্থা বিপজ্জনক ও বিভাজনমূলক বিষয়বস্তুও মানুষের সামনে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষত নারীবিদ্বেষ, অপরাধের মহিমান্বয়ন কিংবা মানসিক অস্থিরতা বাড়ায় এমন উপাদান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ব্যবহারকারীর আগ্রহ ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় তাঁর নিরাপত্তা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিই প্রশ্ন। সরকারের যুক্তি, মানুষকে শুধু কোনও নির্দিষ্ট প্রকাশনা লুকোনোর সুযোগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; কীভাবে তাঁর দেখার জগৎ সাজানো হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাটি বেছে নেওয়ার ক্ষমতাও প্রয়োজন। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে স্বাগত জানিয়েছেন নিরাপত্তার প্রচারকেরা।

উদ্যোগটি বৃহত্তর অনলাইন সুরক্ষার দায়িত্ববিধির অংশ। প্রস্তাবিত কাঠামোয় শিশুদের খাদ্যাভ্যাসের ক্ষতিকর বিকার, পর্নোগ্রাফি, বিপজ্জনক কসরত বা গুরুতর মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে এমন বিষয়বস্তু থেকে রক্ষার কথা রয়েছে। অনলাইন খেলা, বিভিন্ন প্রয়োগব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথোপকথন পরিষেবাও সুরক্ষার আলোচনায় রয়েছে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ষোলো বছরের কম বয়সিদের বড় সামাজিক মাধ্যমে হিসাব খোলায় নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে। এবার বয়সের সীমার বাইরে গিয়ে পরিষেবার নকশা এবং মানুষের অভিজ্ঞতার উপর সংস্থার দায়িত্ব নির্দিষ্ট করতে চাইছে সরকার।

নিয়ম অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১০ কোটি ৯২ লক্ষ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। নজরদারির দায়িত্বে থাকবে দেশের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক ইসেফটি। প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে ঝুঁকি বিচার করে তা কমানোর ব্যবস্থাও জানাতে হবে। অর্থাৎ কোনও ক্ষতিকর ঘটনা ঘটার পরে শুধু প্রকাশনা সরানোর প্রশ্নেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকছে না।

সংস্থাগুলির প্রতিক্রিয়ায় সতর্কতা স্পষ্ট। ঘোষণার অব্যবহিত পরে মেটা ও টিকটক মন্তব্য করতে চায়নি; অ্যালফাবেটও তখন প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে মেটার আগের প্রকাশিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সুপারিশের উদ্দেশ্য ব্যবহারকারীর কাছে প্রাসঙ্গিক ও আকর্ষণীয় বিষয় পৌঁছনো। সংস্থাটি এটিও জানিয়েছে, ফেসবুকের পৃথক প্রকাশনাপাতা এবং ইনস্টাগ্রামে অনুসরণ করা হিসাবগুলির বিভাগে সময়ক্রমে বিষয় দেখার সুযোগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাব সেই ধরনের পছন্দকে প্রধান প্রদর্শনব্যবস্থা হিসেবে স্পষ্টভাবে বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে চাইছে।

ইনস্টাগ্রামপ্রধান অ্যাডাম মোসেরির আশঙ্কা, সময়ক্রমে সাজানো পাতায় বেশি প্রকাশনা দেওয়া বাণিজ্যিক সংস্থার ভিড়ে বন্ধুদের বিষয়বস্তু চাপা পড়তে পারে।

অন্যত্র সবচেয়ে সরাসরি নজির ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তার ডিজিটাল পরিষেবা আইনে বৃহৎ সামাজিক মাধ্যমগুলিকে ব্যক্তিগত আচরণভিত্তিক বাছাইয়ের বিকল্প দিতে হয়। ইউরোপে মাসিক সাড়ে চার কোটির বেশি ব্যবহারকারী রয়েছে এমন বড় পরিষেবায় মানুষ ব্যক্তিগত সুপারিশের বদলে সময়ক্রমের মতো অন্য ভিত্তিতে বিষয় দেখতে পারেন। পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর বোতাম বা সম্মতি আদায়ের কৌশলের বিরুদ্ধেও বিধান রয়েছে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার ভাবনা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন নয়। ইউরোপের অভিজ্ঞতা দেখায়, বিকল্পের আইনি স্বীকৃতির সঙ্গে সেটি সহজে ব্যবহার করার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এই তুলনায় একটি পার্থক্য মাথায় রাখা দরকার। ব্যবহারকারীর বয়স বেঁধে দেওয়া এবং সুপারিশনির্ভর বিষয়বস্তু এড়িয়ে চলার অধিকার এক বিষয় নয়। প্রথমটি ঠিক করে কারা পরিষেবা ব্যবহার করতে পারবেন; দ্বিতীয়টি ঠিক করে পরিষেবায় ঢোকার পরে তাঁরা কীভাবে বিষয়বস্তু দেখবেন। অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগ দ্বিতীয় প্রশ্নটিকেই সামনে আনছে, যদিও শিশুদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও সঙ্গে রয়েছে।

তবে সুপারিশ বন্ধ করা মানে সামাজিক মাধ্যমের সমস্ত অ্যালগরিদম বন্ধ করা নয়। সময় অনুযায়ী প্রকাশনা সাজাতেও গণনাপদ্ধতি লাগে; ক্ষতিকর বিষয় শনাক্ত করার ব্যবস্থাও আলাদা। এখানে মূল প্রশ্ন ব্যক্তিগত আচরণ থেকে আগ্রহ অনুমান করে অযাচিত সুপারিশ সামনে আনা হবে কি না। আবার শুধু পরিচিতদের প্রকাশনা দেখলেই যে ভুল তথ্য বা বিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হবে না, এমন নিশ্চয়তাও নেই। পরিচিত মানুষও সেসব ছড়াতে পারেন। তাই পছন্দের স্বাধীনতা নিরাপত্তার একটি উপায়; সব সমস্যার সমাধান নয়।

প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্পটি কি প্রথমবারেই সহজ ভাষায় বোঝানো হবে? একবার বাছার পরে সেই সিদ্ধান্ত কতদিন বহাল থাকবে? সংস্থা কি বারবার পুরনো ব্যবস্থায় ফেরার অনুরোধ জানাবে? স্বাধীনভাবে এসব যাচাই করার সুযোগ কতটা থাকবে? প্রস্তাবের কার্যকারিতা বিচার করতে এই খুঁটিনাটিই গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর বিষয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যাতে বৈধ মতপ্রকাশে বাধা দেওয়ার অস্ত্র না হয়, সেই সীমারেখাও স্পষ্ট করতে হবে। মানুষের পছন্দকে বাস্তবে সম্মান করার পরীক্ষাতেই উদ্যোগটির সাফল্য নির্ধারিত হবে।