খবর

২,৮৪৩ কিলোমিটার পথে চারশোর বেশি মালগাড়ি, সময়-খরচ কমাচ্ছে পৃথক রেল করিডর

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: যাত্রীবাহী ট্রেনকে পথ ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার বাধ্যবাধকতা কমছে।
  • বন্দর থেকে শিল্পাঞ্চলে পণ্য পৌঁছচ্ছে দ্রুত, পরিবহণে সময় ও খরচ বাঁচানোর সুযোগও বাড়ছে।
  • ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমের দুই বিশেষ পণ্যবাহী রেল করিডর মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ২,৮৪৩ কিলোমিটারের পৃথক পরিবহণ ব্যবস্থা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: যাত্রীবাহী ট্রেনকে পথ ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার বাধ্যবাধকতা কমছে। বন্দর থেকে শিল্পাঞ্চলে পণ্য পৌঁছচ্ছে দ্রুত, পরিবহণে সময় ও খরচ বাঁচানোর সুযোগও বাড়ছে। ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমের দুই বিশেষ পণ্যবাহী রেল করিডর মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ২,৮৪৩ কিলোমিটারের পৃথক পরিবহণ ব্যবস্থা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুই পথে এখন প্রতিদিন প্রায় ৪২৬টি মালগাড়ি চলাচল করছে। দেশের পণ্য পরিবহণে রেলের ভূমিকা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই পরিকাঠামো তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, গুজরাতের ভদোদরায় পশ্চিমাঞ্চলীয় পণ্যবাহী করিডরের শেষ তিনটি অংশের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মোট ৩২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অংশগুলি তৈরিতে খরচ হয়েছে ২০,৭০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রয়েছে নিউ সানন্দ–নিউ মকরপুরা, নিউ উম্বরগাঁও–নিউ সাফালে এবং নিউ সাফালে–জওহরলাল নেহরু বন্দর সংযোগ। এর ফলে পশ্চিম করিডরের সম্পূর্ণ পথের উদ্বোধন সম্পন্ন হল।

এই ব্যবস্থার দুই বাহুর কাজ কিছুটা আলাদা। পশ্চিম করিডর উত্তরপ্রদেশের দাদরি থেকে নবি মুম্বইয়ের জওহরলাল নেহরু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত; দৈর্ঘ্য ১,৫০৬ কিলোমিটার। পূর্ব করিডরের দৈর্ঘ্য ১,৩৩৭ কিলোমিটার, পঞ্জাবের লুধিয়ানা থেকে বিহারের সোননগর পর্যন্ত। পূর্ব ভারতের খনিজসম্পদ পরিবহণে পূর্ব করিডরের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমের বন্দরগুলির সঙ্গে উত্তর ভারতের উৎপাদন ও বাজারকেন্দ্রগুলির যোগাযোগ সহজ করে পশ্চিম করিডর।

পশ্চিমের পথে পণ্যবাহী বাক্স বা কন্টেনার পরিবহণের গুরুত্ব বেশি। গুজরাতের পিপাভাভ ও মুন্দ্রার মতো বন্দর থেকে উত্তর ভারতের অভ্যন্তরীণ পণ্যকেন্দ্রে মাল পাঠানোর সুবিধা তৈরি হয়েছে। এই বিশেষ রেলপথে একটির উপরে আরেকটি কন্টেনার বসিয়ে মালগাড়ি চালানো যায়। বেশি ভার বহনের উপযোগী ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে একই পথে বেশি পণ্য সরানোর ক্ষমতা বাড়ে। শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগকারী শাখাপথ ও নতুন পণ্য ওঠানামার কেন্দ্র এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে।

আলাদা রেলপথের প্রয়োজন হয়েছিল পুরনো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থেকেই। যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন একই লাইন ব্যবহার করলে তাদের চলাচলের মধ্যে সমন্বয় করতে হয়। ব্যস্ত মূল পথে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ মালগাড়ির গতি এবং নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছনোর নিশ্চয়তা কমায়। বিশ্বব্যাঙ্কের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথক পণ্যবাহী করিডর চালু হওয়ার পরে মালগাড়ির গতি সাধারণত দ্বিগুণ হয়ে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি বেড়েছে পণ্য পরিবহণের সামর্থ্য।

সাম্প্রতিক হিসাবেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত রেলের তথ্য বলছে, এপ্রিল ও মে মাসে পূর্ব করিডরে গড় গতি ছিল যথাক্রমে ঘণ্টায় ৪৪.৯ এবং ৪৪.৭ কিলোমিটার। পশ্চিম করিডরে তা ছিল ৫৩.৬ এবং ৫২.৩ কিলোমিটার। অর্থাৎ দুই করিডরের গতি এক নয়; তবে পণ্য পরিবহণে পৃথক রেলপথের সুবিধা পরিসংখ্যানেও ধরা পড়ছে।

সময় বাঁচার অর্থ কেবল গন্তব্যে আগে পৌঁছনো নয়। এর অর্থনৈতিক যুক্তিটি সহজ: পথে পণ্য যত কম সময় আটকে থাকবে, ব্যবসার টাকা তত তাড়াতাড়ি ফের কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। সরবরাহের সময় নির্ভরযোগ্য হলে কারখানায় কাঁচামাল আনা এবং তৈরি পণ্য পাঠানোর পরিকল্পনাও সহজ হয়। তবে এই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ক্রেতার দামে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নির্ভর করবে ভাড়া, ওঠানামার খরচ এবং সামগ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থার উপর।

সেই কারণেই যাত্রার শেষ অংশের যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। বড় রেলপথ দিয়ে দ্রুত মাল এলেও সেখান থেকে গুদাম, কারখানা বা ক্রেতার কাছে পৌঁছতে দেরি হলে লাভ কমে যায়। উৎপাদনকেন্দ্র থেকে রেলে পণ্য তোলার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। কার্যকর পরিবহণের জন্য মূল করিডরের পাশাপাশি প্রয়োজন সংযোগকারী পথ, মাল সংগ্রহের ব্যবস্থা, গুদাম এবং দ্রুত পণ্য ওঠানো-নামানোর সুবিধা। রেল ও সড়কের সমন্বয় এখানেই বাস্তব প্রয়োজন।

এই পরিকাঠামো বাড়াতে গতিশক্তি পণ্য টার্মিনাল নীতি চালু করেছে রেল। রেলমন্ত্রকের ২৩ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৪২টি এমন কেন্দ্র চালু হয়েছে; আরও ৩১০টি জায়গায় কেন্দ্র তৈরির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চালু কেন্দ্রগুলির সম্মিলিত বার্ষিক পণ্য সামলানোর ক্ষমতা প্রায় ২২ কোটি ৪০ লক্ষ টন। এগুলির মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ এসেছে।

রেলমন্ত্রকের বক্তব্য, উৎপাদন ও ব্যবহারকেন্দ্রের কাছে এই পরিকাঠামো গড়ে উঠলে প্রথম ও শেষ অংশের পরিবহণ খরচ কমে। গুদাম, শস্য সংরক্ষণাগার ও হিমঘরের সুবিধা কৃষিপণ্যকেও রেলের কাছে আনতে পারে। সিমেন্ট, ইস্পাত, কয়লা, সার, খাদ্যশস্য কিংবা মোটরগাড়ি—বিভিন্ন ধরনের পণ্যের জন্য দ্রুত ওঠানামার ব্যবস্থা থাকলে ওয়াগনও তাড়াতাড়ি পরবর্তী যাত্রায় ব্যবহার করা সম্ভব।

সুবিধা মিলতে পারে যাত্রীদেরও। রেলমন্ত্রকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পুরনো লাইন থেকে মালগাড়ির একাংশ বিশেষ করিডরে সরিয়ে দেওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত ট্রেন চালানোর জায়গা তৈরি হয়। ফলে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী, উভয় পরিষেবার সংখ্যা এবং সময়ানুবর্তিতা উন্নত করার সুযোগ বাড়ে। সেই হিসাবে পণ্য পরিবহণের এই বিনিয়োগের প্রভাব শুধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সামগ্রিক রেল পরিষেবাতেও পৌঁছতে পারে।

তবে করিডর তৈরি হলেই সমস্ত শিল্প স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেলমুখী হবে না। বিশ্বব্যাঙ্কের বিশ্লেষণে আধুনিক পণ্য টার্মিনালের ঘাটতি, ছোট ব্যবসায়ীদের উপযোগী পরিষেবা এবং নির্দিষ্ট সময়ে মাল পৌঁছনোর নিশ্চয়তার, সুবিধাজনক ভাড়া, প্রয়োজন তুলে ধরা হয়েছে। কয়লা বা সিমেন্টের বাইরে তৈরি পোশাক, যন্ত্রাংশসহ নানা পণ্যকে রেলে আনতে হলে পরিষেবাকেও সেই চাহিদার উপযোগী করতে হবে। তাই নির্মিত রেলপথের পূর্ণ সুফল পাওয়ার সঙ্গে ব্যবসার বাস্তব প্রয়োজন মেটানোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা ডানকুনি–সুরাট পণ্যবাহী করিডর। ২০২৬–২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে পূর্ব ও পশ্চিমকে যুক্ত করার এই নতুন পথ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, এর লক্ষ্য আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য সহজ করা, বর্তমান রেলপথের চাপ কমানো এবং শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলার উৎপাদনকেন্দ্রগুলির সামনে পশ্চিম ভারতের বাজারে পৌঁছনোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles