রাজ্য

খাদ্য সুরক্ষায় গলদ, কলকাতার ৪০ খাবারের দোকানের লাইসেন্স স্থগিত

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পুজোর আগে কলকাতার খাবারের দোকানগুলিতে খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে বড়সড় অভিযানের পর ৪০টি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ব্যবসার লাইসেন্স স্থগিত করল কলকাতা পুরসভা।
  • মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
  • তালিকায় একাধিক পরিচিত রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানের নাম রয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পুজোর আগে কলকাতার খাবারের দোকানগুলিতে খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে বড়সড় অভিযানের পর ৪০টি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ব্যবসার লাইসেন্স স্থগিত করল কলকাতা পুরসভা। মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। তালিকায় একাধিক পরিচিত রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানের নাম রয়েছে। তবে বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন, তালিকায় উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁদের সংস্থার সম্পর্ক নেই।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরসভার তালিকায় রয়েছে পার্ক স্ট্রিটের ডন জিওভানিস, মির্জা গালিব রোডের করিমস এবং রাজা রামমোহন সরণির দাদা বৌদি হোটেল। ফলে একই নামের অন্য দোকান কিংবা কোনও সংস্থার সমস্ত শাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। কোন ঠিকানার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত হয়েছে, সেই তথ্য এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

পুর প্রশাসক তথা কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শহরের ৫৯২টি রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও মিষ্টি তৈরির প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়। নজরদারির আওতায় ছিল বিপণিবিতানের খাবারের কেন্দ্র, ক্লাব এবং বাজারও। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের উপশিরোনামে সংখ্যাটি ৫২৯ লেখা হলেও মূল প্রতিবেদনে প্রশাসকের বক্তব্যে ৫৯২ রয়েছে; অন্য প্রতিবেদনেও এই সংখ্যাই পাওয়া যাচ্ছে।

অভিযানে পরীক্ষার জন্য ১৬১টি খাদ্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নোটিস দেওয়া হয়েছে ১১২টি প্রতিষ্ঠানকে। পুর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, খাদ্য সুরক্ষার নির্ধারিত মান পূরণ না করায় মোট ১,২২৪ কিলোগ্রাম খাদ্যসামগ্রী নষ্ট করে দেওয়া হয়। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, ব্যবস্থা কেবল কয়েকটি নামী রেস্তোরাঁর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; খাদ্য প্রস্তুতি ও বিক্রির বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষা করা হয়েছে।

পুর আধিকারিকদের অভিযোগ, একাধিক জায়গায় খাবার রাখার ঘরে আরশোলা ও ইঁদুরের উপদ্রব দেখা গিয়েছে। কোথাও খাদ্যসামগ্রীতে ছত্রাক জন্মেছে, কোথাও পাওয়া গিয়েছে পচা বা দূষিত খাবার। সংরক্ষণস্থলের অপরিচ্ছন্নতাও ছিল উদ্বেগের কারণ। পিটিআইয়ের খবর অনুযায়ী, একটি ক্ষেত্রে বিরিয়ানিতে দেওয়ালের রঙের চিহ্ন মেলার কথাও জানিয়েছেন আধিকারিকেরা। তবে ওই অভিযোগকে নির্দিষ্ট কোনও নামী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার মতো তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই।

মিষ্টি তৈরির কয়েকটি জায়গায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অনাবৃত খাবার এবং কর্মীদের মাথা ঢাকার ব্যবস্থা বা অ্যাপ্রন ব্যবহার না করার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবহৃত রান্নার তেল কীভাবে সরানো হচ্ছে, তার নথিপত্রেও ঘাটতি মিলেছে বলে পরিদর্শকদের দাবি। মাছ ও মাংস সংরক্ষণের পদ্ধতি নিয়েও আপত্তি রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, তালিকায় থাকা রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের গিরিশচন্দ্র দে অ্যান্ড কোং উত্তর কলকাতার গিরিশচন্দ্র দে ও নকুড়চন্দ্র নন্দীর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিকের পরিচালক সুদীপ মল্লিক টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছেন, পুরসভার তালিকায় বি এল সাহা রোডের যে ঠিকানা রয়েছে, সেটি তাঁদের সংস্থার নয়। তাঁর দাবি, শহরে তাঁদের ১৮টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে এবং সম্প্রতি সল্টলেক সিটি সেন্টারের শাখা পরিদর্শন করে কোনও ত্রুটি পায়নি পুরসভার দল। অর্থাৎ, নাম প্রকাশিত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার বক্তব্যের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

নিউ মার্কেটের নিজামস মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংস্থার চেয়ারম্যান সমর নাগের বক্তব্য, তাঁদের চিকেন বিরিয়ানির আলুতে অনুমোদিত সীমার বেশি একটি খাদ্যরং থাকার কথা জানানো হয়েছে। তিনি পরীক্ষার ফলকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। স্বাধীন সংস্থাকে দিয়ে আলাদা পরীক্ষা করিয়ে সেই প্রতিবেদন পুরসভায় জমা দেওয়ার সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন। আপাতত পুরসভার সাংবাদিক বৈঠকের ঘোষণাকেই নির্দেশ হিসেবে ধরে রেস্তোরাঁ বন্ধ রেখেছেন তাঁরা।

অন্যদিকে, আরসালানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, নাগেরবাজারের শাখা নিয়ে বন্ধের কোনও নির্দেশ তাঁদের কাছে পৌঁছয়নি। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সেটি চালু ছিল। শিমলা বিরিয়ানির তপসিয়া শাখা এবং ট্যাংরার বিগ বস অবশ্য নির্দেশ পাওয়ার পরে কাজ বন্ধ করার কথা জানিয়েছে। ফলে তালিকা ঘোষণার পরেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্দেশ পৌঁছনো এবং কার্যকর হওয়া নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছে।

পুর প্রশাসক জানিয়েছেন, সংশোধনের পরে ফের খোলার সুযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলিকে পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য সুরক্ষার ঘাটতি মিটিয়ে আবেদন করতে হবে। তারপর পুরসভার দল আবার পরিদর্শন করবে। নিয়ম মানা হয়েছে বলে নিশ্চিত হলে ব্যবসা চালুর অনুমতি মিলবে। তাঁর বক্তব্য, পুজোয় মানুষ যাতে নিশ্চিন্তে খেতে পারেন, সেটাই লক্ষ্য। ব্যবসায়ীরা যত দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধন করবেন, পুনরায় খোলার প্রক্রিয়াও তত দ্রুত এগোতে পারবে।

রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের সংগঠনও স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রয়োজন স্বীকার করেছে। জাতীয় রেস্তোরাঁ সংগঠনের সভাপতি সাগর দরিয়ানির বক্তব্য, পরিচ্ছন্নতা, ভেজাল প্রতিরোধ এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাদ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তিনি প্রশিক্ষণ, ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ এবং পরিকাঠামোর উন্নতিতে গুরুত্ব দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। পূর্ব ভারতের হোটেল ও রেস্তোরাঁ সংগঠনের সভাপতি সুদেশ পোদ্দার সদস্যদের দ্রুত ঘাটতি মেটানোর অনুরোধ করেছেন।

এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলার প্রতিবেদনে পার্ক স্ট্রিটের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় পরিদর্শনের কথা প্রকাশিত হয়েছিল। কিছু জায়গায় সংরক্ষিত মাছ ও মাংসে প্রয়োজনীয় লেবেল না থাকায় সেগুলি কত দিনের পুরনো, তা বোঝা যাচ্ছিল না। সেই খাদ্যসামগ্রী সরিয়ে দেওয়া হয়। পিটার ক্যাট ও মোকাম্বোর মালিক নীতিন কোঠারি তখন দাবি করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে গুরুতর ত্রুটি পাওয়া যায়নি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রান্নায় ব্যবহৃত তেল, মশলা ও অন্যান্য উপকরণের মানের দিকে আরও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। যেসব জায়গায় ত্রুটি চিহ্নিত হয়েছে, সেখানে পরবর্তী নজরদারি চলবে বলেও পুরসভার স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছিল। অর্থাৎ, পরিদর্শনের পাশাপাশি সংশোধনের নির্দেশও দেওয়া হচ্ছিল।

এই ঘটনায় ক্রেতাদের সামনে দুটি বিষয় একসঙ্গে এসেছে: খাবারের নিরাপত্তা যাচাই এবং অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের নির্ভুল পরিচয়। প্রকাশিত তালিকায় ঠিকানা, অভিযোগ ও সংশোধনের অগ্রগতি স্পষ্ট থাকলে বিভ্রান্তি কমবে। পুজোর মুখে ব্যবসা ফের চালুর প্রশ্নের সঙ্গে তাই জড়িয়ে রয়েছে জনসাধারণকে সঠিক তথ্য দেওয়ার দায়িত্বও।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles