সুমন নামা

হরিষে বিষাদ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: এই ভয়ানক ডিজিটাল-কালের চরিত্র লক্ষণ হলো, পান থেকে চুন খসে যাওয়ার পরমুহূর্ত থেকেই আপনাকে খবর টের পাওয়ানো শুরু হবে।
  • হোয়াটস অ‍্যাপ মেসেজ, এস এম এস, মেসেঞ্জার, ইনস্টা অথবা এক্স, না চাইলেও আপনাকে জানিয়ে দেবে, ‘এসেছি বধূ হে, নিয়ে এই হাসি-রূপ-গান/ আমার যা কিছু…
  • যে সুধীজন জানে সংবাদপত্র পড়িবার অভ‍্যাস আমি বহুকাল ত‍্যাগ করিয়াছি, তাদের কেউ কেউ একটি সরকারি বিজ্ঞাপনের ছবি পাঠিয়ে বুঝিয়ে দিল, কেসটা কোথায় জনডিস হয়ে…

বিস্তারিত প্রতিবেদন

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: এই ভয়ানক ডিজিটাল-কালের চরিত্র লক্ষণ হলো, পান থেকে চুন খসে যাওয়ার পরমুহূর্ত থেকেই আপনাকে খবর টের পাওয়ানো শুরু হবে। হোয়াটস অ‍্যাপ মেসেজ, এস এম এস, মেসেঞ্জার, ইনস্টা অথবা এক্স, না চাইলেও আপনাকে জানিয়ে দেবে, ‘এসেছি বধূ হে, নিয়ে এই হাসি-রূপ-গান/ আমার যা কিছু আছে, এনেছি তোমার কাছে, তোমারে করিতে সব দান।’

গতকাল সোমবার সকালে যেমন খবর ভাইরাল হয়ে গেল যে মা দুর্গা অকস্মাৎ এবার একাদশভূজা হয়ে বাপের বাড়ি আসছেন। যে সুধীজন জানে সংবাদপত্র পড়িবার অভ‍্যাস আমি বহুকাল ত‍্যাগ করিয়াছি, তাদের কেউ কেউ একটি সরকারি বিজ্ঞাপনের ছবি পাঠিয়ে বুঝিয়ে দিল, কেসটা কোথায় জনডিস হয়ে গেছে।

যে কোনও বিষয়েই খিল্লি করা জনতা যে প্রতিক্রিয়া ব‍্যক্ত করে থাকে, স্বভাবদোষে আমি ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটা পছন্দ করি। বলতে পারেন আমার জিনের দোষ। জনতা ‘ছিঃ ছিঃ’ করলেই আমি ‘হিঃ হিঃ’। জনতা যখন হিঃ হিঃ করে, অবধারিতভাবে আমি সঙ্গে সঙ্গে ছিঃ ছিঃ।কারও তুলোয় এলার্জি হয়, কারও ফুলের রেণুতে, আমার জন্মাবধি, জনতায়।

লক্ষ‍্য করে দেখবেন জগতে যাহা কিছু অকল‍্যানকর, যত অনাসৃষ্টি, তার শুরুতে থাকে একটি ইংরেজি শব্দ। Mob। মব-রুল, মব-ভায়োলেন্স,মব-মেন্টালিটি, মব-লিঞ্চিং,মব-ফিউরি,মব-ফ্রেঞ্জি,মব-ইন্টিমিডেশন, মব-অ‍্যাটাক, মবোক্রাসি,মব-স্টার।মদ-মেয়ে-মমতার মতো এখানেও ওই ‘ম’-এর দোষ আর কী!

অতএব একাদশভূজাকে দেখে আমার প্রাণে খুশির তুফান উঠল, ভাদ্রের সকালে তাল পাকানো ভ‍্যাপসা গরমকে বেশ সহনীয় মনে হতে শুরু করল, যে ক্ষণজন্মা, সৃষ্টি ও উদ্ভাবনশীল পুরুষ অথবা নারী, এই অসাধ‍্য সাধন করেছেন, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথাটা অবনত হতে হতে পায়ের পাতা অবধি পৌঁছে গেল, ইচ্ছা হোল নবান্নের পরিচিতজনকে ফোন করে এই অমর-কীর্তির সুলুক সন্ধান করি। এক্কেবারে ‘ আউট অব দ‍্য বক্স’ একটি পরাবাস্তব ভাবনা, মনে হোল সালভাদর দালির বোধহয় নবান্নের কোলে নব-জন্ম হয়েছে।

অনেক কাল মহালয়া শোনা হয়না বলে দুর্গার ধ‍্যানমন্ত্র ও দেবী-মাহাত্ম‍্য নতুন করে একবার ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা গেল।দেবীর ডান দিকের পাঁচ হাতে থাকে ত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, তির ও শক্তি। বাঁ দিকের পাঁচ হাতে থাকে ঢাল, ধনুক, পাশ, অঙ্কুশ এবং ঘণ্টা অথবা কুঠার। শ্রীশ্রীচণ্ডীর দ্বিতীয় অধ্যায়ের বর্ণনা অনুসারে, শিব নিজের ত্রিশূল থেকে আরেকটি ত্রিশূল সৃষ্টি করে দেবীকে দিয়েছিলেন। বিষ্ণুও নিজের চক্র থেকে একটি চক্র সৃষ্টি করে তাঁর হাতে তুলে দেন। খড়্গ ও ঢাল দিয়েছিলেন কাল বা সময়ের দেবতা। বায়ু বা মরুৎ দিয়েছিলেন ধনুক এবং তিরে ভরা দুটি তূণীর। অগ্নি দিয়েছিলেন ‘শক্তি’ নামের বর্শাজাতীয় অস্ত্র। শত্রুকে বেঁধে ফেলার পাশ দিয়েছিলেন বরুণ, যা প্রতিমায় নাগপাশ হিসেবে দেখা যায়। ইন্দ্র তাঁর বাহন ঐরাবতের ঘণ্টা থেকে একটি ঘণ্টা নিয়ে দেবীকে দিয়েছিলেন। পরশু বা কুঠার দিয়েছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা, সঙ্গে দিয়েছিলেন আরও নানা অস্ত্র এবং অভেদ্য বর্ম। তবে ধ্যানমন্ত্রে অঙ্কুশের উল্লেখ থাকলেও চণ্ডীর এই অস্ত্রদানপর্বে তার দাতার নাম আলাদা করে বলা নেই।

কিঞ্চিৎ জ্ঞানার্জন অবশ‍্যই হলো, অবাধ‍্য কৌতুহল মিটলনা।নিত‍্যকার দ্বিপ্রাহরিক দিবানিদ্রার আগে শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকলাম, দেবীর একাদশতম বাহু সংযোজনের অভিনব আইডিয়াটি মাথায় এল কী করে? একটিই যুক্তিগ্রাহ‍্য উত্তর খুঁজে পেলাম। যা দিনকাল পড়েছে তাতে ঠাঁটিয়ে চড় কষিয়ে দেওয়ার জন‍্য মায়ের একটি হাত খোলা রাখা বড্ড প্রয়োজন। কখন কোন স্ব-নিযুক্ত ফুড ইন্সপেক্টর মন্ডপে ঢুকে পড়ে তার কোনও নিশ্চয়তাই তো নেই!

পরক্ষণেই বুঝে গেলাম, এ আমার বৃথা কল্পনা, ভক্তি-গদ-গদ জাতীয়তাবাদী সরকারের জমানায় মায়ের হাত খালি রাখার স্পর্ধা কেউ দেখাবেনা। যাদবপুরের কলাবিদ‍্যা ভবনে যদি এবার পুজোর আয়োজন হয় খ‍্যাঁকশালরাও এই দাবি নিয়ে উপাচার্যকে ঘেরাও করবেনা। মায়ের উদ্বৃত্ত মুষ্টিতে কিছু না কিছু থাকতেই হবে। এমন কিছু যা সনাতন-সিদ্ধ, বাবা বাগাড়ম্বরেশ্বর অনুমোদিত এবং দিমাগি নকশালদের কল্পনার অতীত।

ভাবলাম, সবচেয়ে ভালো হয় যদি মহানুভব সরকার বাহাদুর এইটুকু স্বাধীনতা পুজো কমিটির হাতেই ছেড়ে দেয়। তা কী হবার জো আছে! এত বছর ধরে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো যে সব ক্লাব বছরের পর বছর দেবী প্রলয়ঙ্করীর পবিত্র হাত থেকে ফোকটে বার্ষিক অনুদান পেতে অভ‍্যস্ত, তাদের মতিগতি আগাম আন্দাজ করার সাধ‍্যি আছে কার? স্বাধীনতা পেলে হয়তো দেখা যাবে কোনও একটা বা একাধিক ক্লাব মায়ের একাদশী হাতে ছোট্ট একটি পোস্টার গুঁজে দিয়েছে যাতে লেখা,’ এপাং ওপাং ঝপাং/ আমরা সবাই ড‍্যাং ড‍্যাং।’ তখন তো কেলোর কীর্তি!

বিকেলে চোখ খোলার পর রুটিন মাফিক গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে টি ভি-তে খবরের চ‍্যানেল খুলতেই আমার হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার জোগাড়! শুনতে পাচ্ছি সরকারি বিজ্ঞাপনে একাদশভূজা দেবীর ছবি প্রকাশ করার জন‍্য খোদ মুখ‍্যমন্ত্রী সবিনয়ে রাজ‍্যবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। কালো কফি এমনিতেই তেতো, এবার তা বিষবৎ! রোমহর্ষক উত্তেজনার মধ্যে সারাটা দিন কাটানোর পরে কাহানি মে অ‍্যায়সা টুইস্ট! এমন পিলে চমকানো অ‍্যান্টি-ক্লাইম‍্যাক্স!

মুখ‍্যমন্ত্রী সম্ভবত নিজেও জানেননা তিনি আসলে ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালে টাই-ব্রেকারের পেনাল্টি মিস করলেন! বহু জন্মের সাধনা না থাকলে এমন ঈশ্বর-প্রেরিত সুযোগ কারও সামনে আসেনা! নবান্নের সালভাদর দালি লেটুস পাতার ড্রেসিং দিয়ে তাঁর সামনে সোনার থালা সাজিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তা হাতছাড়া করলেন!

কী ছিল সেই সুযোগ? বলতে পারি কিন্তু বলব কেন?

আপনারা অনুমান করে কমেন্ট বক্সে লিখুন যদি ইচ্ছে করে।

 

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

সুমন চট্টোপাধ্যায়

<p data-path-to-node="3">সুমন চট্টোপাধ্যায় (জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৯৫৭) একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাংবাদিক, সম্পাদক এবং লেখক, যিনি তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও অনন্য রচনাশৈলীর জন্য সুপরিচিত। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক সম্পন্ন করে ১৯৮১ সালে <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="239">আজকাল</i> পত্রিকায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৫ বছর <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="337">আনন্দবাজার পত্রিকা</i>-র কার্যকরী সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ভারত ও শ্রীলঙ্কার নির্বাচন, ভূ-রাজনীতি ও সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সাহসিকতার সাথে কভার করার পাশাপাশি স্টার আনন্দ, কলকাতা টিভি ও তারা বাংলার মতো টেলিভিশন মাধ্যমেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব সংবাদপত্র <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="664">একদিন</i> চালু করেন এবং ২০১২ সালে 'দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া' গ্রুপের বাংলা দৈনিক <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="738">এই সময়</i>-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি তাঁর নিজস্ব ব্লগ 'বাংলাস্ফিয়ার' (Banglasphere)-এ নিয়মিত বস্তুনিষ্ঠ লেখা ও মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="950">মাই ডেট উইথ হিস্ট্রি</i>, <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="972">প্রথম নাগরিক</i>, <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="986">সেদিনের সপ্তারোহী</i> ও <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="1006">গুমঘর গুলজার</i>-এর মতো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।</p>

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles