মাছ-মাংস ছাড়া দুর্গাপুজোর ডাক, বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে হিন্দুত্বের নতুন ফতোয়া

যা জানা জরুরি
- প্যান্ডেলের আশপাশে মাছ-মাংস বিক্রি বন্ধ রেখে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোকে ‘নিরামিষ’ করে তোলার ডাক ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
- বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পর একই দাবি তুলেছেন বাগেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী।
- অথচ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপি নেতাদেরই হাতে মাছ তুলে ধরে বোঝাতে হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে তাঁরা বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করবেন না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্যান্ডেলের আশপাশে মাছ-মাংস বিক্রি বন্ধ রেখে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোকে ‘নিরামিষ’ করে তোলার ডাক ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পর একই দাবি তুলেছেন বাগেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। অথচ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপি নেতাদেরই হাতে মাছ তুলে ধরে বোঝাতে হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে তাঁরা বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করবেন না। ভোট মিটতেই সেই আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব স্পষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ গত ২৬ আগস্ট দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে একটি পরামর্শ জারি করে। সংগঠনটির বক্তব্য, উৎসবের ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে পুজোমণ্ডপের কাছাকাছি আমিষ খাবার বিক্রি করা উচিত নয়। সেই নির্দেশিকা নিয়ে বিতর্ক চলার মধ্যেই কলকাতায় এসে একই সুরে কথা বলেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। তিনি বাংলার হিন্দুদের উদ্দেশে বলেন, নবরাত্রির সময়ে প্রতিমা স্থাপন না করলেও দেবীমূর্তির কাছে যেন আমিষ খাবার বিক্রি করা না হয়।
শাস্ত্রীর মন্তব্যকে নিছক কোনও ধর্মীয় প্রচারকের ব্যক্তিগত আবেদন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ তাঁর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুধু উপস্থিত থাকাই নয়, তিনি শাস্ত্রীকে পশ্চিমবঙ্গে বাগেশ্বর ধামের একটি কেন্দ্র খোলার আহ্বান জানান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দুর্গাপুজোর সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের সংস্কৃতি রক্ষার জন্য সরকার কাজ করবে। বাংলাকে সাধুসন্ত ও আধ্যাত্মিক জাগরণের ভূমি হিসেবেও বর্ণনা করেন তিনি।
সরকারের প্রধানের এমন মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং শাস্ত্রীর আবেদন কি ভবিষ্যতে কোনও সরকারি বিধিনিষেধের ভিত্তি তৈরি করবে? আপাতত পরিষদের নেতারা অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁরা জোর করে নিরামিষ খাবার চাপিয়ে দিতে চান না। তাঁদের বক্তব্য, প্যান্ডেলের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং দেবীপ্রতিমার পবিত্রতা রক্ষা করাই এই আবেদনের উদ্দেশ্য।
সনাতন সংস্কৃতি সংসদের সম্পাদক স্বামী নির্গুণানন্দ পুজো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, প্রতিমার পবিত্রতা ও মণ্ডপসংলগ্ন এলাকার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা সনাতনীদের কর্তব্য। উৎসবের সময় আমিষ খাবার বিক্রি হলে তার জন্য পুজোস্থল থেকে দূরে আলাদা এলাকা নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য, ‘পরামর্শ’ হিসেবে শুরু হলেও এমন নির্দেশ অচিরেই সামাজিক চাপ এবং পরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের চেহারা নিতে পারে।
বিতর্কটির কেন্দ্রে রয়েছে বাংলার নিজস্ব শাক্ত সংস্কৃতি। পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো উত্তর ভারতের নবরাত্রির অবিকল প্রতিরূপ নয়। বাংলার বহু পরিবারে দুর্গাপুজোর দিনেও মাছ খাওয়ার রীতি রয়েছে। কোথাও কোথাও দেবীকে মাছ কিংবা আমিষ ভোগও নিবেদন করা হয়। শাক্তপীঠ এবং বিভিন্ন বনেদি বাড়ির পুজোয় বলি, মাছের ভোগ ও আমিষ নৈবেদ্যের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ফলে গোটা উৎসবের উপর এক ধরনের নিরামিষ খাদ্যবিধি চাপানোর চেষ্টা বাংলার ধর্মীয় বৈচিত্র্যের সঙ্গেই সংঘাত তৈরি করছে।
প্রশ্ন উঠছে, দেবীর পবিত্রতা কীসে নষ্ট হয়, তা নির্ধারণের অধিকার কোনও একটি সংগঠনকে কে দিয়েছে? বাংলার দুর্গাপুজোয় কুমোরটুলি থেকে ঢাকিপাড়া, মণ্ডপশিল্প থেকে খাদ্যের দোকান—সব ক্ষেত্রেই নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। বিরিয়ানি, মাছভাজা, কবিরাজি কিংবা মোগলাই পরোটা প্যান্ডেল-পরিক্রমার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে, খাদ্যকে বাদ দিয়ে কলকাতার পুজোর জনজীবন কল্পনা করাই কঠিন।
রাজনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপির নেতারা মাছ হাতে ছবি তুলে এবং বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের প্রতি সম্মান জানানোর কথা বলে নিরামিষবাদ চাপানোর অভিযোগ খণ্ডন করেছিলেন। ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির এমন দাবি এবং মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় নেতার প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা সেই পুরনো আশঙ্কাই ফিরিয়ে এনেছে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে কলকাতার দুর্গাপুজোকে মানবজাতির অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল ইউনেস্কো। স্বীকৃতি দেওয়ার সময় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছিল উৎসবটির সাম্প্রদায়িক সীমানা অতিক্রমকারী চরিত্র—যেখানে শ্রেণি, ধর্ম ও জাতিগত বিভাজন সাময়িকভাবে মিলিয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে ৪০ হাজারের বেশি সর্বজনীন দুর্গাপুজো হয়; কলকাতাতেই সংখ্যাটি প্রায় তিন হাজার।
২০১৮ সাল থেকে তৃণমূল সরকার সর্বজনীন পুজোগুলিকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার প্রথা চালু করেছিল। নতুন বিজেপি সরকার সেই অনুদান চালু রাখবে কি না, এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। কিন্তু অনুদানের সিদ্ধান্তের আগেই প্যান্ডেলের খাবার নিয়ে ধর্মীয় উপদেশ এসে পৌঁছেছে। ফলে এবারের পুজোয় বিতর্ক শুধু দেবীর আরাধনা ঘিরে নয়; বাঙালির থালায় কী থাকবে, সেই সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত বাঙালি নেবে, না হিন্দুত্বের নতুন পাহারাদারেরা—প্রশ্ন এখন সেটিই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



