দেশভাগের মানচিত্র ভারত ও পাকিস্তানের মাঝখানে কাঁটাতারের রেখা টেনে দিয়েছিল। কিন্তু সেই রেখা অতিক্রম করেই এক তরুণীর প্রেমের সঙ্গে পাকিস্তানে পৌঁছেছিল দক্ষিণ ভারতের শাস্ত্রীয় নৃত্য ভরতনাট্যম। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিকূলতার মধ্যে সেই নৃত্যধারাকে বাঁচিয়ে রাখা ইন্দু মিঠা ৩১ আগস্ট ডাবলিনে প্রয়াত হয়েছেন। বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

১৯২৯ সালে লাহোরে জন্ম ইন্দু চট্টোপাধ্যায়ের। তাঁর বাবা জ্ঞানেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক। ব্রাহ্মণ পরিবারটি আগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। দেশভাগের পরে পরিবার লাহোর ছেড়ে দিল্লিতে চলে আসে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন নিয়ে পড়ার পাশাপাশি ইন্দু ভরতনাট্যমের তালিম নেন ললিতা শাস্ত্রীর কাছে। ললিতা ছিলেন রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেলের প্রতিষ্ঠিত কলাক্ষেত্রের প্রথম দিকের ছাত্রী। ইন্দু আধুনিক ও সৃজনশীল নৃত্যও শিখেছিলেন জোহরা সেহগল এবং তাঁর স্বামী কামেশ্বর সেহগলের কাছে।

দেশভাগের অল্প পরেই এক আত্মীয়ের বাড়ির অনুষ্ঠানে ইন্দুর সঙ্গে পরিচয় হয় পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আবুবকর ওসমান মিঠার। প্রথম দর্শনেই ইন্দুর প্রেমে পড়েছিলেন মিঠা। কিন্তু সদ্য দ্বিখণ্ডিত উপমহাদেশে এক বাঙালি খ্রিস্টান তরুণীর সঙ্গে মুসলমান সেনা কর্মকর্তার বিবাহ দুই পরিবারের কাছেই ছিল প্রায় অকল্পনীয়। ধর্ম, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির ব্যবধান দেখিয়ে প্রবল আপত্তি ওঠে।

সব বাধা অগ্রাহ্য করে ১৯৫১ সালে ২২ বছরের ইন্দু করাচি গিয়ে মিঠাকে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন কন্যা জন্মায়। আবুবকর পরে মেজর জেনারেল হন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য ‘এসএসজি-র জনক’ হিসেবে পরিচিতি পান।

দিল্লি থেকে করাচি যাওয়ার সময় ইন্দু সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—ভরতনাট্যম। পাকিস্তানে এই নৃত্যের সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল অত্যন্ত সীমিত। তার উপর আশির দশকে ইসলামিকরণের আবহে প্রকাশ্যে শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবেও ইন্দুর প্রকাশ্যে নাচ নিয়ে আপত্তি ছিল। তবু তিনি থামেননি।

করাচি থেকে লাহোর, পরে ইসলামাবাদ—যেখানেই থেকেছেন, শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন। সাত দশকে তাঁর কাছে নাচ শিখেছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ। লাহোর গ্রামার স্কুলের ছাত্রীদের ভরতনাট্যম শেখানোর পাশাপাশি তিনি ‘মজমুন-এ-শওক’ নামে নিজস্ব শিক্ষাকেন্দ্রও গড়ে তোলেন। তামিল, তেলুগু ও সংস্কৃতনির্ভর ভরতনাট্যমকে পাকিস্তানি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে উর্দু কবিতা ও স্থানীয় সঙ্গীত ব্যবহার করেছিলেন। নৃত্যের বিষয়বস্তুতে এনেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নারীর স্বাধীনতার ভাবনা।

ইন্দুর উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে রয়েছেন আমনা মওয়াজ খান, ইফতিকার মাসিহ এবং তাঁর কন্যা তেহরিমা মিঠা। বর্তমানে আমেরিকায় নৃত্যশিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা করেন তেহরিমা। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে পাকিস্তান সরকার ইন্দুকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ সম্মানে ভূষিত করে।

ইন্দু মিঠার জীবন তাই কেবল এক নৃত্যশিল্পীর জীবনী নয়। প্রেম তাঁকে সীমান্ত পার করিয়েছিল; শিল্প তাঁকে সেই সীমান্তের ঊর্ধ্বে তুলে দিয়েছিল। রাজনীতি যে সাংস্কৃতিক সেতু ভেঙেছিল, নাচের ছন্দে সারা জীবন সেই সেতুই পুনর্নির্মাণ করেছেন তিনি।