ঝিরামঘাটি হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পরে দোষী সাব্যস্ত ১০ মাওবাদী

যা জানা জরুরি
- ছত্রিশগড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ঘটনা ঝিরামঘাটি হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পরে মামলার দশ অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করল জগদলপুরের বিশেষ এনআইএ আদালত।
- ২০১৩ সালের ২৫ মে বস্তারের ঝিরামঘাটিতে কংগ্রেসের ‘পরিবর্তন যাত্রা’র গাড়িবহরে অতর্কিত মাওবাদী হামলায় রাজ্য কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের প্রায় গোটা প্রজন্ম নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।
- বিশেষ বিচারক অজয় সিং রাজপুত আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর দোষীদের সাজা ঘোষণা করবেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ছত্রিশগড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ঘটনা ঝিরামঘাটি হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পরে মামলার দশ অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করল জগদলপুরের বিশেষ এনআইএ আদালত। ২০১৩ সালের ২৫ মে বস্তারের ঝিরামঘাটিতে কংগ্রেসের ‘পরিবর্তন যাত্রা’র গাড়িবহরে অতর্কিত মাওবাদী হামলায় রাজ্য কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের প্রায় গোটা প্রজন্ম নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ বিচারক অজয় সিং রাজপুত আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর দোষীদের সাজা ঘোষণা করবেন।
দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিরা হলেন প্রমীলা মোদিয়াম, চৈতু লেকাম ওরফে মুন্না, সুমিত্রা পুনেম মোদিয়াম, মুক্কা মাণ্ডবী, কোসা কাভাসি ওরফে কোসারাম, আয়তা মারকম, মাদকামি দেবা, যোগা মাদকামি, বনজামি সান্না ওরফে চামরু এবং মহাদেব নাগ। তাঁদের মধ্যে দু’জন মহিলা। মূল মামলায় ১১ জনের বিচার শুরু হয়েছিল। বিচার চলাকালীন এক অভিযুক্তের মৃত্যু হওয়ায় বাকি দশজনের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সকলেই বর্তমানে জগদলপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। রায়ের প্রতিলিপি হাতে পাওয়ার পরে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিরক্ষা আইনজীবী অরবিন্দ চৌধুরী। বিচারপর্বে ১০১ জন সাক্ষীর বক্তব্য গ্রহণ করা হয়।
২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের তৎকালীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেস ‘পরিবর্তন যাত্রা’ শুরু করেছিল। ২৫ মে বিকেলে সুকমায় সভা সেরে কংগ্রেস নেতাদের প্রায় ২০টি গাড়ির বহর জগদলপুরের দিকে ফিরছিল। বস্তার ও সুকমা জেলার সীমানার কাছে দুর্গম ঝিরামঘাটিতে দেড়শোর বেশি সশস্ত্র মাওবাদী চারদিক থেকে বহরটি ঘিরে ফেলে।
প্রথমে একটি লাল রঙের বোলেরোর নীচে শক্তিশালী স্থলমাইন ফাটানো হয়। বিস্ফোরণে রাস্তায় প্রায় পাঁচ ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয় এবং গাড়িবহরের এগোনোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। তার পর আশপাশের পাহাড় ও জঙ্গল থেকে শুরু হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গ্রেনেড হামলা। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে সেই আক্রমণ। ঘটনাস্থলে ২৪ জন নিহত হন; গুরুতর আহত কয়েকজন পরে মারা যান।
সরকারি নথিতে হামলায় নিহতের সংখ্যা ২৭ বলা হয়েছে; অন্য কয়েকটি হিসাবে পরে আহতদের মৃত্যুসহ সংখ্যাটি ২৯। নিহতদের মধ্যে দশজন নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন। মাওবাদীরা ঘটনাস্থল থেকে দুটি একে-৪৭ রাইফেল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ৪৫৫টি গুলি, একটি নাইন মিলিমিটার পিস্তল, দশটি হাতবোমা এবং যোগাযোগের সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায়।
হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিলেন ছত্রিশগড়ের প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা মহেন্দ্র কর্মা। বস্তারে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সমর্থনে গড়ে ওঠা বিতর্কিত সশস্ত্র আন্দোলন ‘সালওয়া জুডুম’-এর অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই বাহিনীকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। ঝিরামঘাটিতে মাওবাদীরা কর্মাকে আলাদা করে চিহ্নিত করার পরে হত্যা করে।
হামলায় কর্মা ছাড়াও নিহত হন তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি নন্দকুমার পটেল, তাঁর ছেলে দীনেশ পটেল, প্রাক্তন বিধায়ক উদয় মুদলিয়ার এবং কংগ্রেস নেতা যোগেন্দ্র শর্মা। গুলিবিদ্ধ প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিদ্যাচরণ শুক্ল প্রায় দু’সপ্তাহ পরে হাসপাতালে মারা যান। ফলে হামলাটি ছত্রিশগড় কংগ্রেসের সাংগঠনিক নেতৃত্বে এমন এক শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল, যার প্রভাব বহু বছর অনুভূত হয়েছে।
হামলার দু’দিনের মধ্যেই তদন্তভার জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে নয়জন গ্রেফতার ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগপত্র পেশ করে এনআইএ। পরের বছর আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অন্তত ২৯৪টি শুনানির পরে মামলার রায় এল। এখনও ২৮ জন অভিযোগপত্রভুক্ত ব্যক্তি পলাতক হিসাবে নথিভুক্ত রয়েছেন।
তবে তাঁদের কয়েকজনের বর্তমান অবস্থান সেই পরিচিতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অভিযোগপত্রে পলাতক বলে চিহ্নিত সিপিআই (মাওবাদী) পলিটব্যুরো সদস্য থিপ্পিরি তিরুপতি ওরফে দেবুজি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তেলঙ্গানায় আত্মসমর্পণ করেছেন। মাদভি হিদমার উত্তরসূরি এবং পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মির প্রথম ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক বারসে দেবাও জানুয়ারিতে আত্মসমর্পণ করেন। আর এক অভিযুক্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গণেশ উইকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওড়িশায় সংঘর্ষে নিহত হন।
রায়কে স্বাগত জানালেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল একে ‘অসম্পূর্ণ বিচার’ বলেছেন। তাঁর অভিযোগ, হামলার নেপথ্যে কোনও বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল কি না, এনআইএ তা যথাযথভাবে তদন্ত করেনি। অন্যদিকে উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় শর্মার বক্তব্য, আদালতের সিদ্ধান্ত এনআইএ তদন্তের যথার্থতাকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে দশজনের দোষী সাব্যস্ত হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও, ঝিরামঘাটির রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রসংক্রান্ত বিতর্ক এখনও শেষ হচ্ছে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



