গলে যাওয়া নেগেটিভ, স্মৃতিতে বেঁচে থাকা রং: নতুন জীবন পেল ‘পাকিজ়া’

যা জানা জরুরি
- ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘পাকিজ়া’ শুধু একটি ছবি নয়, কামাল আমরোহির স্বপ্ন, মীনা কুমারীর বিষাদময় জীবন এবং হারিয়ে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক জগতের সম্মিলিত স্মারক।
- ১৯৭২ সালে মুক্তির ৫৪ বছর পরে ছবিটি পূর্ণাঙ্গভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
- ফোর-কে মানে পুনর্নির্মিত সংস্করণটির বিশ্ব-অভিষেক হবে ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরের মর্যাদাপূর্ণ ফেস্টিভ্যাল লুমিয়েরে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘পাকিজ়া’ শুধু একটি ছবি নয়, কামাল আমরোহির স্বপ্ন, মীনা কুমারীর বিষাদময় জীবন এবং হারিয়ে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক জগতের সম্মিলিত স্মারক। ১৯৭২ সালে মুক্তির ৫৪ বছর পরে ছবিটি পূর্ণাঙ্গভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। ফোর-কে মানে পুনর্নির্মিত সংস্করণটির বিশ্ব-অভিষেক হবে ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরের মর্যাদাপূর্ণ ফেস্টিভ্যাল লুমিয়েরে। পরে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি প্রদর্শিত হবে।
অলাভজনক সংস্থা ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন আমরোহি পরিবারের সহযোগিতায় দু’বছর ধরে পুনরুদ্ধারের কাজটি করেছে। কিন্তু এই যাত্রার শুরুতেই ধাক্কা অপেক্ষা করছিল। ২০২৪ সালে রামনর্ড পরীক্ষাগারে সংরক্ষিত ‘পাকিজ়া’-র মূল ক্যামেরা নেগেটিভ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও রাসায়নিক ক্ষয়ের কারণে সেটি প্রায় গলে গিয়েছে। পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহারের উপযোগী আর ছিল না।
মূল নেগেটিভ না থাকলে ছবির প্রকৃত রং, আলো এবং দৃশ্যের সূক্ষ্মতা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও হাল ছাড়েননি ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক শিবেন্দ্র সিংহ দুঙ্গারপুর ও তাঁর সহকর্মীরা। তাঁরা রামনর্ডে একটি ‘ইন্টারপজ়িটিভ’ এবং সিনেমাস্কোপ প্রদর্শন-ছাপ খুঁজে পান। অন্য দিকে, জাতীয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন নিগমের অধীন ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়ার সংগ্রহে পাওয়া যায় একটি কালার রিভার্সাল ইন্টারনেগেটিভ। এই বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলি থেকেই শুরু হয় ‘পাকিজ়া’-কে পুনর্গঠনের কাজ।
উদ্ধার করা উপাদানগুলির অবস্থাও ভাল ছিল না। ইন্টারপজিটিভে ছিল অসংখ্য আঁচড়, ছত্রাক, আলোর বলয় এবং ইমালশনের ক্ষয়। ‘ভিনিগার সিনড্রোম’-এর কারণে চলচ্চিত্রের রাসায়নিক স্তর নষ্ট হতে শুরু করেছিল। কালার রিভার্সাল ইন্টারনেগেটিভটির রং অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল। দুই উৎসের ছবির মান ও সংরক্ষণের অবস্থাও ছিল আলাদা। ফলে প্রতিটি দৃশ্য থেকে ময়লা, দাগ, ছত্রাক ও আঁচড় সরিয়ে একই রকম দৃশ্যমান গুণমান বজায় রাখা ছিল বিরাট পরীক্ষা।
সবচেয়ে কঠিন ছিল কামাল আমরোহির কল্পিত রং ফিরিয়ে আনা। ছবিটির অভিনেতা ও প্রধান কলাকুশলীদের কেউ আর জীবিত নেই। সাহায্য নেওয়া হয় শুটিংয়ের সময়কার স্থিরচিত্র এবং আমরোহির ছেলে তাজদার ও মেয়ে রুখসারের স্মৃতির। দু’জনেই ছোটবেলায় নিয়মিত ছবির সেটে যেতেন। ‘ইনহি লোগোঁ নে’ গানে মীনা কুমারীর পোশাকের রং ঠিক করতে রুখসারকে বারবার পুনরুদ্ধার করা দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। তাঁর স্মৃতিতে থাকা রঙের সঙ্গে পর্দার রং মিলে যাওয়ার পরেই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
ছবিটি দীর্ঘ সময় ধরে নির্মিত হওয়ায় আর একটি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে তোলা দৃশ্যের আলো, দানাদার ভাব এবং ‘দিনকে রাত’ হিসেবে দেখানোর কারিগরিতে অসামঞ্জস্য ছিল। কোথাও দৃশ্যান্তর ঝাপসা, কোথাও রঙের মাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুনরুদ্ধারকারীরা সেই তফাত মুছে ছবিটিকে কৃত্রিমভাবে আধুনিক করে তোলেননি; বরং মূল শিল্পরীতি অক্ষুণ্ণ রেখে দৃশ্যগত সামঞ্জস্য ফিরিয়েছেন। মূল শব্দ-নেগেটিভ ও একটি প্রদর্শন-ছাপ ব্যবহার করে শব্দও ৫.১ ব্যবস্থায় পুনর্গঠিত হয়েছে। ইতালির ল’ইমাজিনে রিত্রোভাতা পরীক্ষাগারে সম্পন্ন হয়েছে প্রযুক্তিগত কাজ।
‘পাকিজ়া’-র নির্মাণকাহিনিও তার চিত্রনাট্যের মতোই নাটকীয়। স্ত্রী ও সৃজনসঙ্গী মীনা কুমারীর সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ছবিটির পরিকল্পনা করেছিলেন আমরোহি। ১৯৫৬ সালে সাদা-কালোয় কাজ শুরু হলেও পরে ইস্টম্যানকালারে নতুন করে শুটিং হয়। জার্মান চিত্রগ্রাহক জোসেফ ভিরশিং প্রাথমিক পর্যায়ের দৃশ্যগুলি ধারণ করেন। অভিনেতা বদল, চিত্রনাট্যের সংশোধন, বিপুল ব্যয় এবং আমরোহির নিখুঁততার আকাঙ্ক্ষায় নির্মাণ প্রায় ১৫ বছর ধরে চলেছিল। ১৯৬৪ সালে আমরোহি ও মীনা কুমারীর বিচ্ছেদের পরে কাজ কার্যত থেমে যায়। পরে সম্পর্কের ব্যক্তিগত ক্ষত অতিক্রম করে মীনা ছবিটি শেষ করতে ফিরে আসেন।
১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মুম্বইয়ের মারাঠা মন্দিরে ‘পাকিজ়া’-র প্রিমিয়ারে চলচ্চিত্রের কৌটোগুলি পালকিতে করে আনা হয়েছিল। মুক্তির মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে, ৩১ মার্চ মৃত্যু হয় মীনা কুমারীর। প্রথম দিকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেলেও তাঁর মৃত্যুর পর দর্শক ছবিটির দিকে নতুন করে ফিরে আসে। সাহিবজানের চরিত্রে মীনার অভিনয়, গুলাম মহম্মদের সুর, বিলাসবহুল সেট, কাব্যিক সংলাপ এবং অস্তগামী নবাবি সংস্কৃতির বিষণ্ণ সৌন্দর্য ছবিটিকে কালজয়ী করে তোলে।
শিবেন্দ্র সিংহ দুঙ্গারপুরের কাছে পুনরুদ্ধার তাই নিছক প্রযুক্তিগত সংস্কার নয়; বিস্মৃতির হাত থেকে একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি উদ্ধার। সিনেমার জন্মভূমি লিয়ঁ-তে ‘পাকিজ়া’-র পুনরাগমন যেন সেই দীর্ঘ যাত্রারই উপযুক্ত পরিণতি—গলে যাওয়া নেগেটিভের ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার আলোয় ফিরছেন মীনা কুমারী, পায়ে ঘুঙুর আর চোখে সাহিবজানের অনন্ত বিষাদ নিয়ে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



