পঁচিশেও অমলিন ‘দিল চাহতা হ্যায়’

যা জানা জরুরি
- ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিল চাহতা হ্যায়’ কেবল তিন বন্ধুর বড় হয়ে ওঠার গল্প ছিল না।
- ছবিটি বদলে দিয়েছিল হিন্দি সিনেমার দৃশ্যভাষা, পোশাক, চুলের ছাঁট, বাড়ির অন্দরসজ্জা, এমনকি শহুরে যুবকদের নিজেদের প্রকাশ করার ধরনও।
- পঁচিশ বছর পরেও আকাশ, সমীর ও সিদ্ধার্থকে দেখলে তাই পুরনো বলে মনে হয় না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিল চাহতা হ্যায়’ কেবল তিন বন্ধুর বড় হয়ে ওঠার গল্প ছিল না। ছবিটি বদলে দিয়েছিল হিন্দি সিনেমার দৃশ্যভাষা, পোশাক, চুলের ছাঁট, বাড়ির অন্দরসজ্জা, এমনকি শহুরে যুবকদের নিজেদের প্রকাশ করার ধরনও। পঁচিশ বছর পরেও আকাশ, সমীর ও সিদ্ধার্থকে দেখলে তাই পুরনো বলে মনে হয় না। বরং ফিরে আসে একটি পরিচিত উষ্ণতা—গোয়া ভ্রমণ, বন্ধুদের খুনসুটি এবং জীবনের মোড়ে দাঁড়িয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার স্মৃতি।
পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবিতেই ফারহান আখতার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর চরিত্রেরা প্রচলিত বলিউডি নায়কের মতো নয়। তারা বিত্তবান শহুরে পরিবারের সন্তান, বিদেশে যায়, আধুনিক বাড়িতে থাকে; কিন্তু তাদের জীবন নিখুঁত নয়। বন্ধুত্ব ভাঙে, প্রেম ব্যর্থ হয়, সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। এই স্বাভাবিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই গড়ে উঠেছিল ছবির বাহ্যিক রূপ।
আকাশের চরিত্রে আমির খানের ছোট, খাড়া চুল এবং সরু দাড়ি ছবিটির সবচেয়ে আলোচিত সাজগুলির একটি। তাঁর চুলসজ্জার দায়িত্বে থাকা আভান কনট্র্যাক্টরের কাজ সেই সময় প্রায় সাংস্কৃতিক আলোড়ন তুলেছিল। শহরের অসংখ্য তরুণ নাপিতের দোকানে গিয়ে ‘আকাশের মতো’ চুল কাটাতে চাইতেন। আমিরের চেহারায় দুষ্টুমি, আত্মবিশ্বাস এবং কিছুটা ঔদ্ধত্য ফুটিয়ে তোলার জন্যই ওই ছাঁট বেছে নেওয়া হয়েছিল। সেটি কোনও বিচ্ছিন্ন কেতা নয়; চরিত্রের মানসিকতার দৃশ্যমান সম্প্রসারণ।
সমীরের সাজ আবার আলাদা। সইফ আলি খানের চরিত্রটি আবেগপ্রবণ, কিছুটা অগোছালো এবং বারবার প্রেমে পড়তে প্রস্তুত। ঢিলেঢালা, ফুলছাপ জামা ও স্বচ্ছন্দ চুলে তার সরলতা এবং হাস্যরস প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ বা সিড সংবেদনশীল চিত্রশিল্পী। অক্ষয় খান্নার পোশাকে তাই মাটির রং, ঢোলা জামা ও লিনেনের ব্যবহার বেশি। তিন বন্ধুকে একসঙ্গে দেখলেও কেবল কথোপকথন নয়, তাদের পোশাক এবং অবয়ব দেখেই স্বভাবের তফাত বোঝা যায়।
প্রীতি জিন্টার শালিনীও তখনকার হিন্দি ছবির নায়িকাদের চেনা সাজ থেকে পৃথক। কোঁকড়ানো চুল, সাধারণ অথচ রুচিশীল পোশাক এবং প্রায় অলংকারহীন উপস্থিতি তাঁকে সমকালীন শহুরে তরুণী করে তুলেছিল। চরিত্রগুলিকে ঝলমলে তারকা হিসেবে সাজানোর পরিবর্তে বিশ্বাসযোগ্য মানুষ হিসেবে দেখানোই ছিল নির্মাতাদের লক্ষ্য।
প্রযোজনা-নকশাকার সুজান ক্যাপলান মেরওয়ানজির কাছে এটি ছিল প্রথম হিন্দি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি। বিজ্ঞাপন এবং বিদেশি ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এমন এক জগৎ নির্মাণ করেন, যা পরিশীলিত হলেও কৃত্রিম নয়। ফারহান চেয়েছিলেন ছবিটি ঝকঝকে দেখাক, কারণ তিন নায়কই স্বচ্ছল পরিবারের। কিন্তু সেই বিত্ত যেন প্রাসাদোপম সিঁড়ি বা অবাস্তব আড়ম্বরে প্রকাশ না পায়। বাড়িগুলিকে তাই বসবাসযোগ্য, চরিত্রনির্ভর এবং বাস্তব মনে হয়। এক সাক্ষাৎকারে সুজান জানিয়েছিলেন, বিজ্ঞাপনে কাজ করার অভিজ্ঞতাই তাঁকে এই সূক্ষ্ম অথচ পরিশীলিত দৃশ্যজগৎ গড়তে সাহায্য করেছিল।
আকাশের বাড়িতে আধুনিক আসবাব, শিল্পবস্তু ও খোলা পরিসর তার পরিবারের বিত্ত এবং বিশ্বনাগরিক মনোভাবের পরিচয় দেয়। সমীরের বাড়ির অলংকৃত বৈঠকখানার সঙ্গে তার অপেক্ষাকৃত আধুনিক শোওয়ার ঘরের বৈপরীত্যে ধরা পড়ে পারিবারিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার টানাপড়েন। সিডের পুরনো ঢঙের বাংলো, রঙে ভরা কর্মশালা, অসমাপ্ত ক্যানভাস ও ইজেল তার অন্তর্মুখী শিল্পীসত্তারই প্রতিচ্ছবি। তারা শুধু ঘরে বাস করে না—ঘরগুলিও তাদের চরিত্রের কথা বলে।
রবি কে চন্দ্রনের চিত্রগ্রহণ এই নকশাকে প্রাণ দেয়। মুম্বই, গোয়া ও সিডনিকে তিনটি পৃথক মানসিক পরিসর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গোয়ার চাপোরা দুর্গে তিন বন্ধুর বসে সমুদ্র দেখার দৃশ্যটি এতটাই স্মরণীয় হয় যে জায়গাটি পরবর্তী সময়ে ছবির নামের সঙ্গেই জড়িয়ে যায়। সিডনি আকাশের বিচ্ছিন্নতা ও পরিণত হওয়ার ক্ষেত্র; মুম্বই আবার বন্ধুত্ব, পরিবার এবং অসমাপ্ত সম্পর্কের কেন্দ্র।
শংকর–এহসান–লয়ের সঙ্গীত, জাভেদ আখতারের কথা, এ শ্রীকর প্রসাদের সম্পাদনা এবং ফারাহ খানের নৃত্যপরিকল্পনাও একই আধুনিকতার অংশ। গান গল্পকে থামিয়ে দেওয়া প্রদর্শনী নয়; চরিত্রের মেজাজ ও সম্পর্কের গতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। দ্রুত দৃশ্যান্তর, সংযত অভিনয় এবং কথ্যভাষার সংলাপ মিলিয়ে তৈরি হয় সহজ, হালকা অথচ সুপরিকল্পিত ছন্দ।
‘দিল চাহতা হ্যায়’-এর সাফল্যের পরে বলিউডে শহুরে বন্ধুত্ব, গোয়া সফর এবং স্বচ্ছন্দ পুরুষ-পোশাকের যেন নতুন অভিধান তৈরি হয়। ছবিটির প্রভাব কেবল আমিরের দাড়ি কিংবা তিন বন্ধুর সড়কভ্রমণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার বড় কৃতিত্ব ছিল ‘আধুনিক’ শব্দটিকে আড়ম্বর থেকে মুক্ত করা। সে কারণেই পঁচিশ বছর পরে ছবিটির সাজসজ্জা একটি যুগকে মনে করিয়ে দিলেও তাকে পুরনো মনে হয় না—আজও তার মধ্যে রয়েছে যৌবনের মতোই অনায়াস এক শীতলতা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



