সোনিয়া গান্ধীর ‘বিলংগিং’: ভারতে প্রকাশ ঘিরে বিতর্ক কেন

যা জানা জরুরি
- কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বহু প্রতীক্ষিত আত্মকথা Belonging: A Journey of Love প্রকাশের আগেই ভারতে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
- বিতর্কটি বইয়ের কোনও প্রকাশিত বক্তব্যকে ঘিরে নয়; বরং পাণ্ডুলিপির কয়েকটি অংশের আইনি যাচাই, প্রকাশকের প্রস্তাবিত সংশোধন এবং লেখিকার তা মানতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগকে কেন্দ্র…
- পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া শেষ পর্যন্ত বইটির ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ না করায় প্রশ্ন ওঠে—এটি কি স্বাভাবিক সম্পাদকীয় মতভেদ, না কি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি বইয়ের…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বহু প্রতীক্ষিত আত্মকথা Belonging: A Journey of Love প্রকাশের আগেই ভারতে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। বিতর্কটি বইয়ের কোনও প্রকাশিত বক্তব্যকে ঘিরে নয়; বরং পাণ্ডুলিপির কয়েকটি অংশের আইনি যাচাই, প্রকাশকের প্রস্তাবিত সংশোধন এবং লেখিকার তা মানতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া শেষ পর্যন্ত বইটির ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ না করায় প্রশ্ন ওঠে—এটি কি স্বাভাবিক সম্পাদকীয় মতভেদ, না কি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি বইয়ের ক্ষেত্রে প্রকাশকের অতিরিক্ত সতর্কতা?
তবে বইটির ভারতে প্রকাশ আপাতত অনিশ্চিত নয়। পেঙ্গুইনের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরে হার্পারকলিন্স ইন্ডিয়া প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্করণের সঙ্গেই ২০২৬ সালের ১০ নভেম্বর ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার কথা। হার্পার কলিন্সের নতুন চুক্তির তথ্য বিতর্কের তাৎক্ষণিক সমাধান করলেও প্রকাশনা সংস্থাগুলির স্বাধীনতা ও ভারতে রাজনৈতিক বই প্রকাশের পরিবেশ নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলি থেকে যাচ্ছে।
বইটিতে কী থাকছে
৫৪৪ পৃষ্ঠার আত্মকথাটিতে সোনিয়া গান্ধী তাঁর যুদ্ধোত্তর ইতালির শৈশব, কেমব্রিজে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে পরিচয় ও প্রেম, ভারতে আগমন এবং নেহরু–গান্ধী পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। থাকছে ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের ব্যক্তিগত অভিঘাত, অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজনীতিতে প্রবেশ, দীর্ঘকাল কংগ্রেসের নেতৃত্ব দেওয়া এবং ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সিদ্ধান্তের বিবরণ।
বইটির উপশিরোনাম “A Journey of Love” ইঙ্গিত করে যে এটি নিছক রাজনৈতিক স্মৃতিকথা নয়; পরিবার, পরিচয়, দেশান্তর এবং নতুন একটি দেশের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক তৈরির কাহিনিও। কিন্তু সোনিয়া গান্ধী যেহেতু ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র, তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে ইউপিএ সরকার, নরেন্দ্র মোদীর উত্থান, কংগ্রেসের পতন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোচনা জড়িয়ে থাকাই স্বাভাবিক।
পেঙ্গুইনের সঙ্গে বিরোধ কোথায়
প্রথমে ঠিক হয়েছিল, পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া বইটির ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ করবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বইটির প্রকাশক আলফ্রেড এ নফ—যা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস গোষ্ঠীরই মার্কিন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ২৮ আগস্ট পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া জানায়, তারা ভারতে বিলংগিং-এর প্রকাশক নয়।
তার আগে সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, পাণ্ডুলিপির আইনি যাচাইয়ের সময়ে প্রকাশকের আইনজীবীরা কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সোনিয়া গান্ধীর প্রতিনিধিরা সেই প্রস্তাব মেনে নেননি। বিতর্কিত অংশগুলিতে নরেন্দ্র মোদীর শাসনকাল, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ভূমিকা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং ভারত–চীন সীমান্তে অনুপ্রবেশ বা সংঘর্ষের উল্লেখ ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে পাণ্ডুলিপি এখনও গোপন থাকায় ঠিক কোন বাক্য বা দাবি নিয়ে আপত্তি উঠেছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পেঙ্গুইন এই ঘটনাকে রাজনৈতিক চাপের ফল বলে মানতে অস্বীকার করেছে। সংস্থার বক্তব্য, তথ্য যাচাই এবং লেখককে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া প্রকাশকের অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বিভিন্ন বিষয়ে দুই পক্ষ পরস্পরের অবস্থান মেনে নিলেও একটি বিশেষ প্রশ্নে সমঝোতা হয়নি। তখন লেখিকার প্রতিনিধিরাই আর এগোতে চাননি। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলেছে, তাদের উপরে কোনও বাইরের চাপ ছিল না; গোপনীয়তার শর্তের কারণে মতবিরোধের বিষয়টিও তারা প্রকাশ করবে না। পেঙ্গুইনের ব্যাখ্যা
আইনি যাচাই কেন প্রয়োজন
গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্মৃতিকথা প্রকাশের আগে আলাদা করে আইনি যাচাই করানো বিশ্বজুড়েই স্বীকৃত রীতি। কোনও জীবিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, অসততা অথবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে প্রকাশককে দেখতে হয় তার সমর্থনে নথি বা নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য রয়েছে কি না। নইলে লেখক ও প্রকাশক—উভয়ের বিরুদ্ধেই মানহানির মামলা হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা, বিচারাধীন বিষয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, কপিরাইট এবং আদালত অবমাননার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হয়। প্রকাশকের আইনজীবীরা তাই কোনও বক্তব্যের সূত্র জানতে চাইতে পারেন, ভাষা নরম করার পরামর্শ দিতে পারেন অথবা অভিযোগের বদলে সেটিকে লেখকের ব্যক্তিগত উপলব্ধি হিসেবে চিহ্নিত করতে বলতে পারেন।
কিন্তু আইনি পরামর্শ এবং সম্পাদকীয় আত্মসমর্পণের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। ঝুঁকি এড়ানোর নামে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য নির্বিচারে বাদ দেওয়া হলে বইটির ঐতিহাসিক মূল্য ক্ষুণ্ণ হতে পারে। আবার লেখকের মর্যাদা যত বড়ই হোক, যাচাইযোগ্য তথ্যের ক্ষেত্রে তাঁকে অবাধ ছাড় দেওয়াও প্রকাশকের পক্ষে দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
শেষ কথা কার
সাধারণভাবে পাণ্ডুলিপির বক্তব্যের উপরে লেখকের নৈতিক অধিকার থাকে। প্রকাশক সংশোধনের পরামর্শ দিতে পারেন, কিন্তু লেখকের সম্মতি ছাড়া মূল বক্তব্য বদলে দেওয়া উচিত নয়। অন্য দিকে কোনও লেখা প্রকাশ করলে তার আইনি ও আর্থিক দায় প্রকাশকের উপরেও পড়ে। ফলে প্রকাশক ঝুঁকি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে বইটি না ছাপার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। লেখকও সেই শর্ত না মেনে অন্য প্রকাশক বেছে নিতে পারেন। বিলংগিং-এর ক্ষেত্রে কার্যত সেটিই ঘটেছে।
তবে বিতর্কটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়। কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, মোদী সরকার, আরএসএস এবং চীন-সংক্রান্ত বক্তব্য বাদ দেওয়ার চাপই পেঙ্গুইনের পিছিয়ে যাওয়ার কারণ। কেউ কেউ একে পরোক্ষ সেন্সরশিপ বলেও অভিহিত করেন। বিজেপির বক্তব্য, একটি প্রকাশক ও লেখকের বাণিজ্যিক-সম্পাদকীয় বিরোধে সরকারকে টেনে আনা অর্থহীন। বিজেপি নেতা রাম মাধব প্রশ্ন তুলেছেন, বইটির তথ্য যাচাই নিয়ে বিরোধ হলে তার মধ্যে সরকারকে জড়ানো হচ্ছে কেন।
বৃহত্তর উদ্বেগ
এই উদ্বেগের পটভূমিতে রয়েছে ভারতে রাজনৈতিক বই প্রকাশের কিছু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। প্রাক্তন সেনাপ্রধান এম এম নারাভানের স্মৃতিকথা এবং জো স্যাকোর মুজফ্ফরনগর দাঙ্গাবিষয়ক বই প্রকাশে বাধা বা বিলম্ব নিয়ে আগেও পেঙ্গুইন সমালোচিত হয়েছে। ফলে সোনিয়ার বইয়ের ক্ষেত্রেও ‘আইনি সতর্কতা’ আসলে রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল কি না, সেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
অবশ্য এখন পর্যন্ত সরকারি হস্তক্ষেপের কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। অতএব সেন্সরশিপের অভিযোগ যেমন প্রমাণিত সত্য নয়, তেমনই পেঙ্গুইনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সমস্ত সংশয়ও দূর করে না। মতবিরোধের প্রকৃত কারণ জানা যাবে সম্ভবত বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরে—বিশেষত আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় সংস্করণের পাঠে কোনও তফাত আছে কি না, তা তুলনা করলে।
হার্পারকলিন্স বইটি অপরিবর্তিত অবস্থায় প্রকাশ করলে পেঙ্গুইন-পর্বটি একটি ব্যর্থ সম্পাদকীয় সমঝোতা হিসেবেই থেকে যেতে পারে। কিন্তু ভারতীয় সংস্করণে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশ বাদ পড়লে বিতর্ক আবার জোরালো হবে। শেষ পর্যন্ত বিলংগিং নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই সোনিয়া গান্ধী কী লিখেছেন শুধু তা নয়; আজকের ভারতে একজন প্রভাবশালী বিরোধী নেত্রী তাঁর রাজনৈতিক স্মৃতি কতটা স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন, সেটিও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



