প্রবল জলস্রোত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিকে পুরু কাদার নীচে চাপা দিয়ে কর্মীদের সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে ফেলেছিল।

নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির অন্যতম ত্রিশূলী অঞ্চলে চলতে থাকা উদ্ধার অভিযানের সময় দুই কর্মীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে ছিলেন।

প্রথমে উদ্ধার করা হয় সঞ্জয় শাহকে। সেখান থেকে তাঁকে ত্রিশূলীতে নেপাল সেনাবাহিনীর ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কবীর মহার্জন নামে আরও এক ব্যক্তিকে সুড়ঙ্গ থেকে বার করে আনা হয়। বাসনেত জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের মুখ থেকে প্রায় ১৭০ মিটার গভীরে আটকে ছিলেন তাঁরা।

সঞ্জয় শাহ আপার ত্রিশূলী ৩এ প্রকল্পে ফোরম্যান হিসেবে কাজ করতেন। কবীর মহার্জন ছিলেন ওই প্রকল্পের একজন তত্ত্বাবধায়ক।

নেপালের সেনাবাহিনীর প্রকাশ করা ছবিতে সুড়ঙ্গের ছোট ও অন্ধকার প্রবেশপথ থেকে সঞ্জয়কে টেনে বার করে আনতে দেখা গিয়েছে। তাঁর গোটা শরীর কাদায় ঢাকা থাকলেও তিনি সচেতন ছিলেন। উদ্ধারকারী দলের এক সদস্য তাঁকে কাঁধে তুলে ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে যান।

আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, উদ্ধার করা দু’জনেরই শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তাঁদের চিকিৎসার জন্য বিমানে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

উদ্ধারের পরে সেনা আধিকারিকদের কাছে সঞ্জয়ের প্রথম প্রশ্ন ছিল, “আজ কী বার?”

নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি উদ্ধারকারীদের জানান, বন্যার সময় তিনি সুড়ঙ্গের নিয়ন্ত্রণকক্ষে ছিলেন।

সঞ্জয় বলেন, “সাধারণত সেখানে মাত্র পাঁচ-ছ’জন মানুষ থাকেন। কিন্তু সেই সময় ভিতরে অন্তত ৪০ থেকে ৪৫ জন ছিলেন। আমি নিয়ন্ত্রণকক্ষে থাকায় প্রত্যেকের জীবন বাঁচানো আমার দায়িত্ব ছিল। এত বড় দুর্ঘটনার পরে আমি একা পালিয়ে যেতে পারতাম না। সবাইকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেই হত।”

তিনি আরও বলেন, “সবাইকে বার করে আনার চেষ্টা করার সময় আমি তাঁদের জানিয়েছিলাম যে বাঁধে বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। সকলকে দ্রুত পালিয়ে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু তা করতে গিয়ে আমার অনেকটা সময় চলে যায়। শেষ পর্যন্ত আমি নিজেই আর বাইরে বেরোতে পারিনি।”

সুড়ঙ্গের ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিজেকে শান্ত রাখতে সঞ্জয় অনবরত মন্ত্র জপ করেছিলেন। তাঁর কথায়, সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকার সময় মাত্র তিন-চারজন মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।

সঞ্জয় বলেন, “কাছাকাছি থাকা কয়েকজন চিৎকার করে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের ভিতরেও কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন। তাঁদের কেউ কেউ হয়তো বাইরে বেরোতে পারেননি।”

নেপালের যোগাযোগমন্ত্রী বিক্রম তিমিলসিনা জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গগুলি থেকে আরও কর্মীকে জীবিত উদ্ধারের ব্যাপারে সরকার আশাবাদী। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “আমরা অপেক্ষা করছি, যাতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে উদ্ধার করা যায়।”

গত সপ্তাহে নেপাল ও চিন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উষ্ণায়নের কারণে গলে যাওয়া একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়েছিল। তার জেরে বিপুল পরিমাণ জল, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ প্রবল গতিতে উপত্যকার দিকে নেমে আসে। সেই আকস্মিক স্রোতে ভোটে কোশী ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী অধিকাংশ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যায়।

নেপালের বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, এই বন্যায় অন্তত ১,২৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।

উদ্ধারকারী দলগুলি এখন মূলত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলির উপরেই নজর দিচ্ছে। আধিকারিকদের ধারণা, সুড়ঙ্গের ভিতরে তৈরি হওয়া বায়ুভাণ্ডারের কারণে কোনও কোনও কর্মীর পক্ষে এক সপ্তাহের বেশি সময় বেঁচে থাকা সম্ভব হতে পারে। বিভিন্ন প্রকল্প থেকে এখনও পর্যন্ত ২৭০ জনেরও বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রবল স্রোতের সঙ্গে আসা বিশাল পাথর এবং কাদা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলিতে ঢুকে পড়েছিল। সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলিও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কোনও কোনও সুড়ঙ্গের মুখ পুরু কাদার অনেক নীচে চাপা পড়ে ছিল। আপার ত্রিশূলী ৩এ প্রকল্পে সুড়ঙ্গগুলির অবস্থান খুঁজে পেতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছ’দিন সময় লেগেছে।

সেনাবাহিনী এবং বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলগুলি দিনরাত কাজ করে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ থেকে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছে। শুক্রবার ভোরে সুড়ঙ্গের মুখে একটি পথ তৈরি করার পরে ভিতর থেকে একাধিক মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যায় বলে নিশ্চিত করেছেন আধিকারিকেরা।

উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা সুড়ঙ্গের ভিতরে চিৎকার করে বলেন, “ভয় পাবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করছি।” ভিতর থেকে উত্তর আসে, “ঠিক আছে।”

নেপালের স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি থেকে অন্তত ৫৫৭ জন কর্মী নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১১৫ জন প্রধান সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

নিখোঁজ কর্মীদের পরিবারের সদস্যরা গত ন’দিন ধরে কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলি এবং নেপাল বিদ্যুৎ দপ্তরের সামনে জড়ো হচ্ছেন। প্রিয়জনের কোনও খবর পাওয়ার আশায় তাঁরা সেখানে অপেক্ষা করছেন। নেপালের রাজধানীতে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালের দেওয়ালজুড়ে ত্রিশূলী ৩এ এবং অন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিখোঁজ কর্মীদের ছবি-সহ পোস্টার লাগানো হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, হিমালয়ের উঁচু অঞ্চলে অবস্থিত মোট ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রায় ৯০০ জন কর্মী নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ৫০০ জন বিভিন্ন সুড়ঙ্গে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাসুয়াগঢ়ী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রেও উদ্ধার অভিযান চলছে। নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই কেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ একটি কক্ষে আটকে থাকা ৪৬ জন কর্মী এখনও জীবিত রয়েছেন বলে তারা যথেষ্ট আশাবাদী।