গান্ধারী: নিষ্প্রাণ রোমাঞ্চকাহিনিতে দাগ কাটে তাপসীর লড়াই

যা জানা জরুরি
- মহাভারতের গান্ধারী স্বেচ্ছায় চোখ বেঁধেছিলেন স্বামীর অন্ধত্বের অংশীদার হতে।
- দেবাশিস মাখিজার নতুন ছবি ‘গান্ধারী’তে অন্ধত্ব এসেছে অন্যভাবে—শারীরিক আঘাত, অসহায়তা, অপরাধচক্রের অন্ধকার এবং সমাজের সব দেখেও না-দেখার অভ্যাসের প্রতীক হিসেবে।
- কিন্তু সেই ভাবনাকে বিশ্বাসযোগ্য ও আবেগঘন ছবিতে রূপ দেওয়ার পথেই যেন দৃষ্টি হারিয়েছেন নির্মাতারা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মহাভারতের গান্ধারী স্বেচ্ছায় চোখ বেঁধেছিলেন স্বামীর অন্ধত্বের অংশীদার হতে। দেবাশিস মাখিজার নতুন ছবি ‘গান্ধারী’তে অন্ধত্ব এসেছে অন্যভাবে—শারীরিক আঘাত, অসহায়তা, অপরাধচক্রের অন্ধকার এবং সমাজের সব দেখেও না-দেখার অভ্যাসের প্রতীক হিসেবে। ভাবনাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু সেই ভাবনাকে বিশ্বাসযোগ্য ও আবেগঘন ছবিতে রূপ দেওয়ার পথেই যেন দৃষ্টি হারিয়েছেন নির্মাতারা।
বাণী ও তার স্বামী গোকুল পাঁচ বছরের মেয়ে মিষ্টিকে নিয়ে ট্রেনে চেপে বেড়াতে যাচ্ছিল। একটি স্টেশনে আচমকা উধাও হয়ে যায় শিশুটি। তাকে ধরতে ছুটে গিয়ে গুরুতর আহত হয় বাণী। আঘাতের ফলে সাময়িকভাবে তার দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে আসে। কাল্পনিক শহর জয়পুরায় মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে অসহযোগী পুলিশ, রহস্যময় বাসিন্দা এবং শিশু পাচারকারী এক ভয়ঙ্কর চক্রের মুখোমুখি হয় সে।
প্রথম কয়েক মিনিটেই ছবিটি একটি টানটান রহস্যকাহিনির প্রতিশ্রুতি দেয়। একটি শিশুর অন্তর্ধান, সন্তানের খোঁজে দিশাহারা মা, অপরাধ আড়াল করে রাখা অচেনা জনপদ—উত্তেজনা তৈরির সব উপকরণই রয়েছে। কিন্তু চিত্রনাট্যকার কনিকা ঢিলোঁ একটির পর একটি ধারণা যোগ করতে গিয়ে মূল কাহিনিটিকেই ক্রমশ আড়াল করে ফেলেছেন। মাতৃত্বের যন্ত্রণা, শিশু পাচার, লোকপুরাণ, নারীশক্তি, প্রতিশোধ এবং সামাজিক উদাসীনতা—সবই রয়েছে, অথচ কোনও বিষয়ই প্রয়োজনীয় গভীরতা পায়নি।
জয়পুরার নিজস্ব উপকথায় রয়েছে শিশু অপহরণকারী মাগরাসুর এবং তাকে পরাস্ত করা দেবী চৌমুখীর কাহিনি। বর্তমানের বাণী এবং অপরাধচক্রের মাথাকে সেই পৌরাণিক চরিত্রগুলির প্রতিরূপ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে ছবি। রূপকের সম্ভাবনা ছিল প্রবল। কিন্তু গল্পের ভিত মজবুত হওয়ার আগেই তার উপর পুরাণের ভার চাপানোয় বিষয়টি স্বাভাবিক না লেগে কৃত্রিম হয়ে ওঠে। বহুরূপীদের মুখোশ, অন্ধকার অলিগলি, অদ্ভুত শোভাযাত্রা এবং রহস্যময় চরিত্রের ভিড় দৃশ্যগত চমক তৈরি করলেও কাহিনির উত্তেজনা বাড়াতে পারে না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা, লেখক কনিকা ঢিলোঁ এবং পরিচালক দেবাশিস মাখিজা যেন একই ছবি নির্মাণ করতে চাননি। কনিকার লেখায় রয়েছে আবেগময় প্রতিশোধকাহিনি ও নাটকীয় মোচড়ের প্রতি ঝোঁক। ‘আজজি’ ও ‘ভোঁসলে’-র নির্মাতা মাখিজা আবার অন্ধকার সামাজিক বাস্তবতা এবং দমবন্ধ করা পরিবেশ সৃষ্টিতে আগ্রহী। দুই প্রবণতার মধ্যে কোনও সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটেনি। ফলে কখনও ছবিটি সামাজিক অপরাধের নির্মম দলিল হওয়ার চেষ্টা করে, কখনও লোককথানির্ভর রহস্য, আবার কখনও নব্বইয়ের দশকের অতিনাটকীয় প্রতিশোধের ছবিতে পরিণত হয়।
ক্যামেরার ক্লোজ শট, আবছা আলো এবং উচ্চকিত আবহসংগীত দিয়ে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা অত্যন্ত প্রকট। কিন্তু পর্দা অন্ধকার করলেই দর্শকের মনে ভয় জন্মায় না। তার জন্য প্রয়োজন জীবন্ত চরিত্র, বিশ্বাসযোগ্য পরিস্থিতি এবং ক্রমশ ঘনীভূত বিপদের অনুভূতি। ‘গান্ধারী’তে পরিবেশ আছে, সেই পরিবেশের ভিতরে প্রাণ নেই। পশ্চিমবঙ্গের কোনও শহরকে পটভূমি বলা হলেও তার ভাষা, সংস্কৃতি বা সামাজিক প্রকৃতিও পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটে ওঠেনি।
তাপসী পান্নু অবশ্য সর্বশক্তি দিয়ে বাণীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর শরীরী ভাষায় ক্লান্তি, মুখে আতঙ্ক এবং চলাফেরায় সন্তানের কাছে পৌঁছনোর মরিয়া তাগিদ স্পষ্ট। শারীরিকভাবে কঠিন মারপিটের দৃশ্যগুলিও তিনি দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। কিন্তু চিত্রনাট্য বাণীর মনের ভিতরে প্রবেশের সুযোগ দেয় না। ফলে মাতৃত্বের যন্ত্রণা অনেক সময় অনুভূতির বদলে ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে। “মায়ের চেয়ে বড় যোদ্ধা কেউ নেই”—জাতীয় সংলাপ ছবির বক্তব্য বুঝিয়ে দেয় বটে, কিন্তু আবেগ সৃষ্টি করতে পারে না।
ইশওয়াক সিংয়ের গোকুল প্রায় প্রান্তিক চরিত্র। মিতা বশিষ্ঠ উপস্থিতি দিয়েই কিছু দৃশ্যে ওজন এনেছেন। ছায়া কদম, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, যতীন সারনা, চন্দন রায় ও প্রশান্ত নারায়ণের মতো শক্তিশালী অভিনেতাদের নিয়েও বিশেষ কিছু করতে পারেনি ছবি। প্রত্যেককে ঘিরেই কোনও না কোনও রহস্য তৈরি হয়, অথচ অধিকাংশ চরিত্রের পরিণতি অসম্পূর্ণ অথবা প্রত্যাশিত।
‘গান্ধারী’র ব্যর্থতা তাই ধারণার অভাবে নয়, বরং অতিরিক্ত ধারণার ভিড়ে। ছবিটি বারবার নতুন মোচড় ও প্রতীক যোগ করেছে, কিন্তু এক জন মায়ের সহজ, প্রবল ও আদিম যন্ত্রণাটিকে বিশ্বাস করেনি। তাপসী এমন এক যোদ্ধা-মাকে গড়ে তুলেছেন, যিনি মেয়ের জন্য নরকেও যেতে প্রস্তুত। দুর্ভাগ্য, ছবিটি দর্শককে তাঁর সঙ্গে সেই নরকযাত্রায় শামিল হওয়ার মতো কারণ দিতে পারেনি। জরুরি বিষয়, যোগ্য অভিনেত্রী এবং সম্ভাবনাময় নির্মাতা—সব থাকা সত্ত্বেও ‘গান্ধারী’ শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যহীন, উচ্চকিত এবং বিস্মরণযোগ্য এক রোমাঞ্চকাহিনি হয়েই থেকে যায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



