International

ব্রাজিলের ভোটে ফের মার্কিন ছায়া?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্তকে কোণঠাসা করতে তখন মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির প্রশাসন।
  • লাতিন আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কমিউনিজমের প্রভাব ঠেকানোর নামে ওয়াশিংটন চেয়েছিল, ব্রাজিলের কংগ্রেস নির্বাচনে গুলার্ত-বিরোধীরা শক্তিশালী হয়ে উঠুক।
  • গোটা লাতিন আমেরিকাকেই তখন কার্যত নিজেদের ‘পিছনের উঠোন’ বলে মনে করত আমেরিকা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

সময়টা ১৯৬২। ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্তকে কোণঠাসা করতে তখন মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির প্রশাসন। লাতিন আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কমিউনিজমের প্রভাব ঠেকানোর নামে ওয়াশিংটন চেয়েছিল, ব্রাজিলের কংগ্রেস নির্বাচনে গুলার্ত-বিরোধীরা শক্তিশালী হয়ে উঠুক। গোটা লাতিন আমেরিকাকেই তখন কার্যত নিজেদের ‘পিছনের উঠোন’ বলে মনে করত আমেরিকা।

ইতিহাসবিদদের দাবি, নির্বাচনের আগে সিআইএ এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গোপনে বিরোধী প্রার্থীদের কাছে বিপুল অর্থ পৌঁছে দিয়েছিল। দক্ষিণপন্থী প্রচার এবং সরকার-বিরোধী অস্থিরতা তৈরিতে সক্রিয় একটি সংগঠনকেও দেওয়া হয়েছিল কয়েক কোটি ডলার।

রাজনৈতিক কর্মী চিকো রুবেন্স পাইভার অভিযোগ, ‘‘মার্কিন সরকার এখানে অত্যন্ত নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল।’’ তাঁর দাদু, ব্রাজিলের কংগ্রেস সদস্য রুবেন্স পাইভা, ওয়াশিংটনের এই হস্তক্ষেপ নিয়ে ১৯৬৩ সালের সংসদীয় তদন্তে অংশ নিয়েছিলেন।

ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে সেই ইতিহাসই ফের মনে পড়ছে চিকোর। তাঁর আশঙ্কা, ২০২৬ সালের ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আবারও ওয়াশিংটন একই পথে হাঁটছে। তাঁর দাদুকে ১৯৬৪ সালে ক্ষমতা দখলকারী মার্কিন-সমর্থিত সামরিক শাসকরা হত্যা করেছিল।

এ বার নির্বাচনের লড়াই বামপন্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বনাম অতি-দক্ষিণপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর। ফ্লাভিও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ জাইর বর্তমানে সামরিক অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

জনমত সমীক্ষায় লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলছে। এই পরিস্থিতিতেই ট্রাম্প প্রশাসন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ—অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে তাঁরা নাকি লুলাকে দুর্বল এবং বলসোনারোকে শক্তিশালী করতে চাইছেন।

তার অন্যতম বড় হাতিয়ার শুল্ক। ব্রাজিল থেকে আমদানি করা অধিকাংশ পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে ব্রাজিলের দুই বড় অপরাধী সংগঠন—রিয়ো দে জেনেইরোর রেড কমান্ড এবং সাও পাওলোর ফার্স্ট কমান্ড অব দ্য ক্যাপিটালকে—বিদেশি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে আমেরিকা।

ব্রাজিল সরকারের একাংশের সন্দেহ, এই পদক্ষেপগুলির রাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। অপরাধ দমনে লুলা ব্যর্থ—ভোটারদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করে তাঁকে দুর্বল করাই নাকি উদ্দেশ্য।

জুলাইয়ে লুলা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের দুই কর্মকর্তাকে ব্রাজিলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, ওই কর্মকর্তারা ‘‘ব্রাজিলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ’’ করতে চেয়েছিলেন। ব্রাজিলীয় কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, তাঁরা ফ্লাভিও বলসোনারোর সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবে প্রশংসিত ভোটব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ তৈরির চেষ্টা করতে পারেন।

এর কিছুদিনের মধ্যেই ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করে আমেরিকা।

রাজনীতিবিদ এবং জনপ্রিয় পডকাস্ট ভাষ্যকার সেলসো রোচা দে বারোসের প্রশ্ন, ব্রাজিলের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এই মার্কিন হস্তক্ষেপের অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন? তাঁর মতে, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই এটাই।

বারোসের কথায়, ‘‘মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি আমাদের নির্বাচনে প্রকাশ্যে একটি প্রার্থীকে সমর্থন করছে। সেই প্রার্থীকে জেতাতে তারা ব্রাজিলের অর্থনীতির শ্বাসরোধ করছে। অথচ আমরা এমন ভান করতে পারি না যে কিছুই ঘটছে না।’’

এই অভিযোগের শিকড় অবশ্য অনেক গভীরে।

ষাটের দশকের গোড়ায় গুলার্ত সরকারকে দুর্বল করতে সিআইএ ব্রাজিলিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেটিক অ্যাকশনকে অর্থ জোগাতে সাহায্য করেছিল বলে ইতিহাসবিদদের দাবি। ইতিহাসবিদ লিলিয়া শোয়ার্জ ও হেলোইসা স্টারলিংয়ের মতে, ওই প্রতিষ্ঠান বেআইনি ভাবে কয়েকশো আইনপ্রণেতা এবং আট জন প্রাদেশিক গভর্নর প্রার্থীর প্রচারে অর্থ ঢেলেছিল।

তাঁদের লেখা ‘ব্রাজিল: আ বায়োগ্রাফি’ বইয়ে বলা হয়েছে, লক্ষ্য ছিল কংগ্রেসে একটি শক্তিশালী বিরোধী শিবির তৈরি করা, গুলার্ত সরকারের নীতিগুলিকে আটকে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক অভ্যুত্থানের পথ তৈরি করা।

আরও একটি মার্কিন অর্থপুষ্ট প্রতিষ্ঠান, রিসার্চ অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজ ইনস্টিটিউট, সরকার-বিরোধী প্রচার এবং বিক্ষোভে অর্থ জোগানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে গবেষকদের দাবি। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জেমস এন গ্রিনের ভাষায়, ‘‘উদ্দেশ্য ছিল গুলার্তকে ক্ষমতা থেকে সরানো এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের দরজা খুলে দেওয়া।’’

গ্রিন বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গেও সেই সময়ের মিল দেখছেন। তাঁর মতে, যেমন গুলার্তকে দুর্বল করতে ওয়াশিংটন বিরোধীদের অর্থ দিয়েছিল এবং ব্রাজিলকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করেছিল, তেমনই এখন শুল্ক ও অন্যান্য চাপের মাধ্যমে লুলা সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।

তবে দু’টি সময়ের মধ্যে একটি বড় পার্থক্যও রয়েছে। বারোসের মতে, ষাটের দশকের মার্কিন অভিযান ছিল গোপন। কারণ, প্রার্থীদের অর্থ দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে এলে ব্রাজিলে তীব্র জনরোষ তৈরি হতে পারত। আজকের পরিস্থিতিতে সেই রাখঢাক প্রায় নেই।

‘‘এখন যা ঘটছে, তা প্রকাশ্য এবং অতীতের তুলনায় অকল্পনীয় ভাবে বৃহত্তর পরিসরে,’’ দাবি বারোসের।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, ব্রাজিলের নির্বাচন দুর্বল করার কোনও ‘চক্রান্ত’ চলছে—এমন দাবি ভিত্তিহীন। ব্রাজিলের মানুষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার বেছে নেবেন, আমেরিকা তাকে সম্মান করবে বলেও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

কিন্তু সন্দেহ থামছে না।

গত বছর প্রতিবেশী আর্জেন্টিনার রাজনীতিতেও হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি প্রকাশ্যে দক্ষিণপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সম্প্রতি ব্রাজিলে ফ্লাভিও বলসোনারোর নির্বাচনী প্রচার শুরুর অনুষ্ঠানেও হাজির ছিলেন মিলেই। সেখানে লুলাকে ‘চোর’ বলে আক্রমণ করেন তিনি।

গ্রিনের মতে, ব্রাজিল নিয়ে ট্রাম্প ও রুবিওর কৌশলের পিছনে রয়েছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য। তাঁর দাবি, লুলা সরকারকে দুর্বল করে দিলে কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকার কঠোর নীতি নিয়ে ব্রাজিলের আপত্তি তোলা কঠিন হবে। একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী শক্তিকে কোণঠাসা করে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান ঘটানোও ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হতে পারে।

২০২৩ সালের পর থেকে আর্জেন্টিনা, চিলি, কোস্টারিকা এবং কলম্বিয়ায় দক্ষিণপন্থী জনবাদী রাজনীতির উত্থান এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। ট্রাম্পের কমলা-রঙের রাজনৈতিক প্রতীকের সূত্র ধরে কেউ কেউ একে লাতিন আমেরিকার ‘কমলা ঢেউ’ও বলছেন।

পাইভার আশঙ্কা, ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে সরানোর পর ওয়াশিংটন যে ধরনের প্রভাব তৈরি করেছে, ব্রাজিলেও তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তাঁর মতে, লক্ষ্য একটাই—আমেরিকার স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতায় আনা।

নির্বাচনের দিন যত এগোবে, সমাজমাধ্যমও এই লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ময়দান হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর। অ্যালগরিদমে সামান্য পরিবর্তনও কোন খবর কত মানুষের কাছে পৌঁছবে, তার উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি-কর্তাদের তাঁর রাজনৈতিক শিবিরের দিকে ঝুঁকে পড়াও তাঁকে উদ্বিগ্ন করছে।

বারোসের অবশ্য এ বিষয়ে কোনও সংশয় নেই। তাঁর দাবি, আমেরিকা ফ্লাভিও বলসোনারোকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়। কারণ, তাঁর মতে, ফ্লাভিও ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নীতিগুলি বাস্তবায়নে আগ্রহী হতে পারেন—খনিজ সম্পদে মার্কিন সংস্থার প্রবেশাধিকার বাড়ানো থেকে চিনের সঙ্গে ব্রাজিলের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কমানো পর্যন্ত।

শেষ পর্যন্ত তাঁর মন্তব্যই গোটা বিতর্কের সারকথা টেনে আনে—

‘‘আসল সত্য হল, এবারের নির্বাচন লুলা ও ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে নয়। এই নির্বাচন লুলা এবং মার্কো রুবিওর মধ্যে।’’

ব্রাজিলের ভোটে সত্যিই কি ষাটের দশকের ছায়া ফিরছে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তৈরি করা আর একটি ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ আখ্যান? নির্বাচনের ফলই শেষ পর্যন্ত তার উত্তর দেবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles