হাবল দেখেছে, ওয়েব দেখেছে গভীরে—এ বার আকাশ চষবে রোমান

যা জানা জরুরি
- মহাকাশ দেখার পদ্ধতিতেই এ বার বদল আনতে চলেছে নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ।
- রবিবার, ৩০ আগস্ট ফ্লরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটে সফল উৎক্ষেপণ হয়েছে প্রায় ৪৩০ কোটি ডলারের এই মহাকাশ মানমন্দিরের।
- হাবল বা জেমস ওয়েবের জায়গা নিতে নয়, বরং তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েই মহাবিশ্বকে আরও বড় পরিসরে দেখতে তৈরি হয়েছে রোমান।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মহাকাশ দেখার পদ্ধতিতেই এ বার বদল আনতে চলেছে নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। রবিবার, ৩০ আগস্ট ফ্লরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটে সফল উৎক্ষেপণ হয়েছে প্রায় ৪৩০ কোটি ডলারের এই মহাকাশ মানমন্দিরের। হাবল বা জেমস ওয়েবের জায়গা নিতে নয়, বরং তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েই মহাবিশ্বকে আরও বড় পরিসরে দেখতে তৈরি হয়েছে রোমান।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সহজ করে তিন দূরবীক্ষণের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে বলেন—হাবল মহাবিশ্বকে দেখেছে, জেমস ওয়েব তার আরও গভীরে উঁকি দিয়েছে, আর রোমানের কাজ হবে একসঙ্গে আকাশের বিশাল এলাকা স্ক্যান করা।
হাবলের মতোই রোমানের প্রধান দর্পণের ব্যাস ২.৪ মিটার। ফলে ছবির সূক্ষ্মতার দিক থেকেও সেটি হাবলের কাছাকাছি। কিন্তু আসল চমক তার ‘দৃষ্টির পরিসর’-এ। রোমানের প্রতিটি ছবির দৃশ্যক্ষেত্র হাবলের তুলনায় অন্তত ১০০ গুণ বড়। হাবলের অবলোহিত ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান প্রায় ২০০ গুণ। অর্থাৎ হাবলকে যে বিশাল অঞ্চল কয়েকশো ছবিতে ধরে রাখতে হবে, রোমান অনেক ক্ষেত্রেই সেটি একটি ছবিতেই তুলে ফেলতে পারবে।
এই কাজের নেপথ্যে রয়েছে রোমানের প্রধান যন্ত্র—৩০ কোটি পিক্সেলের ‘ওয়াইড ফিল্ড ইনস্ট্রুমেন্ট’। তার তোলা একটি ছবি পূর্ণ আকারে দেখতে হলে পাশাপাশি প্রায় ৩৭টি ‘ফোর-কে’ স্ক্রিন লাগবে। ভাবলেই বোঝা যায়, এই টেলিস্কোপের ‘ওয়াইড’ শব্দটি নিছক নাম নয়।
রোমানের দ্বিতীয় যন্ত্রটি আরও পরীক্ষামূলক। ‘করোনাগ্রাফ’ নক্ষত্রের প্রবল আলো আড়াল করে তার আশপাশে থাকা অপেক্ষাকৃত ম্লান গ্রহকে সরাসরি দেখার প্রযুক্তি পরীক্ষা করবে। ভবিষ্যতে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরতে থাকা গ্রহের ছবি তোলার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হতে পারে, তার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে এটি।
উৎক্ষেপণের পর রোমানের গন্তব্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬ লক্ষ কিলোমিটার দূরের সূর্য–পৃথিবী ‘এল-টু’ অঞ্চল। একই এলাকায় রয়েছে জেমস ওয়েবও। সেখানে পৌঁছে মূল পাঁচ বছরের অভিযানে রোমান দুই শত কোটিরও বেশি ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করে মহাবিশ্বের একটি বিশাল ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করবে।
দূরবর্তী অতিনবতারা, দুর্বল মহাকর্ষীয় লেন্স এবং ছায়াপথগুলির বিন্যাস বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে চান, মহাবিশ্বের প্রসারণ ক্রমশ দ্রুত হচ্ছে কেন। সেই অনুসন্ধানের কেন্দ্রে থাকবে মহাবিশ্বের দুই বড় রহস্য—অদৃশ্য পদার্থ বা ‘ডার্ক ম্যাটার’ এবং অদৃশ্য শক্তি বা ‘ডার্ক এনার্জি’।
তবে শুধু মহাবিশ্বের বড় প্রশ্ন নয়, ছোট ছোট গ্রহও রোমানের নজর এড়াবে না। মহাকর্ষীয় অণুলেন্স বা ‘মাইক্রোলেন্সিং’ পদ্ধতিতে হাজার হাজার বহির্গ্রহ আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। তালিকায় থাকতে পারে পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহ, আবার নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে ঘুরতে থাকা বরফশীতল গ্রহও।
রোমান নিজে অবশ্য কোনও গ্রহে প্রাণ আছে কি না, তা খুঁজবে না। বরং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে কোন কোন গ্রহকে বাসযোগ্যতার সম্ভাবনার দিক থেকে খুঁটিয়ে দেখা উচিত, সেই তালিকা তৈরি করে দিতে পারে।
এই মহাকাশযানের দর্পণের গল্পটিও কম চমকপ্রদ নয়। ২০১২ সালে মার্কিন জাতীয় গুপ্তচর উপগ্রহ সংস্থা অব্যবহৃত দুটি দূরবীক্ষণ-ব্যবস্থা নাসাকে উপহার দিয়েছিল। তার মধ্যে একটির দর্পণই পরে রোমানের জন্য ব্যবহার করা হয়।
আর নামটি এসেছে নাসার প্রথম মুখ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমানের কাছ থেকে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপ প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তাঁকে বলা হয় ‘হাবলের জননী’।
এ বার সেই রোমানের নামেই মহাবিশ্ব দেখবে নতুন চোখ। কয়েক মাসের যাত্রা, যন্ত্র ঠান্ডা করা এবং একের পর এক পরীক্ষা শেষ করার পর ২০২৭ সালের গোড়ার দিকে রোমানের কাছ থেকে প্রথম ছবি পাওয়ার আশা করছে নাসা। হাবল যদি মহাকাশের ইতিহাস লিখে থাকে, ওয়েব যদি তার গভীরে আলো ফেলেছে—তবে রোমানের পালা গোটা আকাশটাকেই এক ফ্রেমে ধরার।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



