গুরুদ্বার ভেঙে মল?

যা জানা জরুরি
- কোয়েটা: প্রায় এক শতাব্দী পুরনো একটি গুরুদ্বার।
- একসময় যেখানে প্রার্থনার ধ্বনি শোনা যেত, দেশভাগের পর সেখানে চলত স্কুল।
- পাকিস্তানের বালুচিস্তানের কোয়েটায় শপিং মল তৈরির জন্য গুরুদ্বারটি ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কোয়েটা: প্রায় এক শতাব্দী পুরনো একটি গুরুদ্বার। একসময় যেখানে প্রার্থনার ধ্বনি শোনা যেত, দেশভাগের পর সেখানে চলত স্কুল। আর এখন সেই ঐতিহাসিক ভবনই নেই। পাকিস্তানের বালুচিস্তানের কোয়েটায় শপিং মল তৈরির জন্য গুরুদ্বারটি ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় শিখ সম্প্রদায়। প্রতিবাদের আঁচ পৌঁছেছে ভারতেও।
বালুচিস্তান শিখ কাউন্সিলের জাঠেদার জসবীর সিংহের দাবি, গুরুদ্বারটি ১৯৩০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশভাগের সময় শিখ ও হিন্দুদের একটি বড় অংশ ভারতে চলে আসার পর ভবনটি একটি ক্যাথলিক পরিচালন পর্ষদের হাতে দেওয়া হয়। পরে সেখানে চালু হয় সেন্ট গ্যাব্রিয়েল স্কুল।
কিন্তু চলতি বছরের জুন থেকে বদলে যায় ছবিটা। জসবীরের অভিযোগ, ভবন ভাঙার কাজ শুরু হয় এবং স্কুলটিকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ স্থানীয় শিখ সম্প্রদায়কে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি, এমনকি তাঁদের সঙ্গে আলোচনাও করা হয়নি।
ঘটনাটি সামনে আসে কোয়েটার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্থানীয় বাসিন্দারা সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি তোলার পর। ক্ষোভ প্রকাশ করে জসবীর বলেন, “আমরা গোটা বিশ্বকে বলি, কোয়েটা ঐতিহ্যসমৃদ্ধ শহর। কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই ঐতিহ্য রক্ষা করছি? শিখরা কি এই দেশের অংশ নয়? এই দেশের জন্য আমরাও বহু ত্যাগ স্বীকার করেছি।”
পঞ্জাবিতে তাঁর আরও তীব্র মন্তব্য, “সাড্ডা গুরু ঘর তোড় কে গিরা দিত্তা”—অর্থাৎ, “ওরা আমাদের গুরুর ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।”
কার সম্পত্তি, কার অধিকার?
জসবীর জানিয়েছেন, বিষয়টি পাকিস্তান সরকারের কাছে তোলা হয়েছে। তাঁর দাবি, ইভ্যাকুই ট্রাস্ট প্রপার্টি বোর্ড বা ইটিপিবি শিখ ও হিন্দুদের ধর্মীয় সম্পত্তি বিক্রি করতে পারে না কিংবা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য অন্য কারও হাতে তুলে দিতে পারে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের সম্পত্তি সর্বোচ্চ শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
জসবীর আরও দাবি করেছেন, দেশভাগের আগে শুধু কোয়েটাতেই ১২টি বড় গুরুদ্বার ছিল। পরবর্তী সময়ে সেগুলির অনেকগুলিই বেআইনি ভাবে দখল হয়ে যায়।
তাঁর অভিযোগ, বর্তমান ঘটনাও সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই আর একটি অধ্যায়।
ভারতেও উঠল প্রতিবাদের ঝড়
কোয়েটার ঘটনার প্রতিবাদে ভারত থেকেও সরব হয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন।
‘আফগান শিখস অ্যান্ড হিন্দুস’ বইয়ের লেখক ইন্দরজিৎ সিংহের কথায়, “ওরা শুধু একটি ভবন ভাঙেনি। আমাদের ইতিহাস, বিশ্বাস এবং পরিচয়ের একটি অংশ ধ্বংস করেছে।” তিনি নির্মাণকাজ অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য পাকিস্তান সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
প্রাক্তন সাংসদ এবং জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান তরলোচন সিংহ দিল্লিতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে চিঠি লিখেছেন। তাঁর বক্তব্য, যে গুরুদ্বার ভবনে সম্প্রতি পর্যন্ত সেন্ট গ্যাব্রিয়েল প্রাথমিক বিদ্যালয় চলত, সেটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। বালুচিস্তান সরকারের সঙ্গে কথা বলে স্থানীয় শিখ সম্প্রদায়কে সাহায্য করার জন্য পাকিস্তানি হাইকমিশনারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।
বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আর পি সিংহও সমাজমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। বালুচিস্তান শিখ কাউন্সিলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তাঁর দাবি, পাকিস্তানে শিখ সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও পরিচয় মুছে দেওয়ার প্রবণতার এটি আরও একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ। ঘটনাটি অবিলম্বে পাকিস্তান সরকারের কাছে তোলার জন্য ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের কাছেও আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
পাকিস্তানের মন্ত্রীর দাবি, ‘ওটা গুরুদ্বার ছিল না’
তবে ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে পাকিস্তানের তরফে ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে।
পশ্চিম পঞ্জাবের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী এবং পাকিস্তান শিখ গুরুদ্বার প্রবন্ধক কমিটির সভাপতি সর্দার রমেশ সিংহ অরোরা জানিয়েছেন, দেশভাগের সময় দেশত্যাগীদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তির তত্ত্বাবধান করে ইটিপিবি। কিন্তু তাঁর কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, কোয়েটার ওই সম্পত্তি কোনও গুরুদ্বারের নয়; বরং সেটি এক শিখ ব্যক্তির মালিকানাধীন ছিল।
অরোরার এই দাবি অবশ্য সরাসরি খারিজ করেছেন জসবীর সিংহ। তাঁর বক্তব্য, সম্পত্তিটি যে গুরুদ্বারের ছিল, তার পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তাঁদের কাছে রয়েছে।
উত্তর মেলেনি ইটিপিবির
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা ইটিপিবির চেয়ারম্যান কামার উজ জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বারবার ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ঐতিহাসিক ওই ভবনটি আসলে কার সম্পত্তি ছিল? সেটি কি সত্যিই একটি গুরুদ্বার, নাকি শিখ মালিকানাধীন অন্য কোনও সম্পত্তি? আর যদি সেখানে বাণিজ্যিক নির্মাণ হয়ে থাকে, তা হলে সেই সিদ্ধান্তের পিছনে কী ছিল আইনি ভিত্তি?
এক শতাব্দী পুরনো একটি ধর্মীয় স্থাপত্য ভেঙে ফেলার অভিযোগ তাই এখন শুধু একটি ভবন হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোয়েটার শিখ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, দেশভাগের স্মৃতি, ধর্মীয় সম্পত্তির অধিকার এবং সংখ্যালঘু ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্নও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



