প্রমাণ মিললেই বন্ধ হতে পারে অন্তর্বর্তী খোরপোশ: সুপ্রিম কোর্ট

যা জানা জরুরি
- নয়াদিল্লি: কোনও স্ত্রী বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে ‘বসবাস’ করছেন—স্বামী যদি তার পক্ষে স্পষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রাথমিক ভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আদালতে পেশ করতে পারেন, তা হলে মামলার…
- গত মাসে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এমনটাই জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
- একই সঙ্গে বৈবাহিক মামলায় বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ছবি, ভিডিয়ো ও বৈদ্যুতিন তথ্য সংগ্রহের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নয়াদিল্লি: কোনও স্ত্রী বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে ‘বসবাস’ করছেন—স্বামী যদি তার পক্ষে স্পষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রাথমিক ভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আদালতে পেশ করতে পারেন, তা হলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই স্ত্রীর অন্তর্বর্তী খোরপোশের আবেদন খারিজ হতে পারে। গত মাসে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এমনটাই জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে বৈবাহিক মামলায় বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ছবি, ভিডিয়ো ও বৈদ্যুতিন তথ্য সংগ্রহের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত। এই ধরনের নজরদারি নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত আইন তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে বেঞ্চ।
বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চ জানিয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫(৪) ধারায় থাকা অযোগ্যতার বিধান শুধু চূড়ান্ত খোরপোশের ক্ষেত্রেই নয়, অন্তর্বর্তী খোরপোশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নতুন ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৪৪ ধারাতেও একই বিধান রয়েছে।
তবে শুধু অভিযোগ করলেই খোরপোশ বন্ধ হবে না। স্বামীকে এমন উপাদান পেশ করতে হবে, যা প্রথম দর্শনেই অভিযোগটির পক্ষে স্পষ্ট ও জোরালো ভিত্তি তৈরি করে। প্রমাণের সত্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যদি গুরুতর প্রশ্ন থাকে এবং তা নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা কিংবা প্রযুক্তিগত পরীক্ষা প্রয়োজন হয়, তা হলে সেই বিচার চলাকালীন অন্তর্বর্তী খোরপোশ চালু থাকতে পারে।
মামলাটি হিমাংশু চোরদিয়া ও আরুশি জৈনের বৈবাহিক বিরোধ থেকে তৈরি। ২০১৪ সালের ৭ জুলাই তাঁদের বিয়ে হয়। দাম্পত্যে টানাপড়েনের পর ২০২০ সালের মে মাসে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান। ওই বছরই রাজস্থানের উদয়পুরের আদালতে নিজের এবং সন্তানের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় খোরপোশের আবেদন করেন তিনি।
এর বিরোধিতা করে স্বামী ১২৫(৪) ধারার উল্লেখ করে দাবি করেন, তাঁর স্ত্রী অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে বসবাস করছেন। অভিযোগের সমর্থনে তিনি আদালতে জমা দেন ৯২টি ভিডিয়ো, ২৩৭টি ছবি এবং কয়েকটি কমপ্যাক্ট ডিস্ক। মামলার নথি অনুযায়ী, একটি বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ওই উপাদানগুলি সংগ্রহ করা হয়েছিল।
বিচারিক আদালত অবশ্য প্রাথমিক পর্যায়ে স্বামীর আপত্তি খারিজ করে দেয়। স্ত্রী ও সন্তান—দু’জনের জন্যই মাসে ২৫ হাজার টাকা করে অন্তর্বর্তী খোরপোশ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের যুক্তি ছিল, ছবি ও বৈদ্যুতিন নথির মৌলিকতা এবং সত্যতা পূর্ণাঙ্গ শুনানির সময় যাচাই করা যেতে পারে। রাজস্থান হাই কোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য এই অবস্থান মানেনি। বেঞ্চ জানিয়েছে, ১২৫(৪) ধারায় তোলা আপত্তি শুধু মামলার চূড়ান্ত পর্যায়ে বিবেচনা করা হবে—এমন ধারণা আইনসঙ্গত নয়। কারণ, ধারাটিতে স্পষ্ট ভাবেই বলা হয়েছে, স্ত্রী যদি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে বসবাস করেন, তা হলে তিনি খোরপোশ পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হতে পারেন। আপত্তির বিচার বছরের পর বছর পিছিয়ে রেখে স্বামীকে অন্তর্বর্তী খোরপোশ দিতে বাধ্য করা হলে আইনে দেওয়া সেই প্রতিরক্ষার সুযোগই কার্যত অর্থহীন হয়ে যাবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে খোরপোশ বন্ধ হয়ে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতির কথা বলেছে। অন্তর্বর্তী খোরপোশের আবেদন দ্রুত বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে স্বামী ১২৫(৪) ধারায় আপত্তি তুললে সেটিও চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা যাবে না।
অভিযোগের সমর্থনে যদি প্রথম দর্শনে অত্যন্ত শক্তিশালী বা অপর পক্ষের স্বীকৃত প্রমাণ থাকে, তা হলে অন্তর্বর্তী খোরপোশ শুরুতেই নাকচ করা বা পরে বন্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু প্রমাণ যদি বিতর্কিত হয় এবং তার সত্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রয়োজন হয়, তা হলে শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে স্ত্রীকে আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
বেঞ্চ আরও স্পষ্ট করেছে, ‘বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে বসবাস’ বলতে কোনও এককালীন বা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বোঝায় না। এর জন্য একটি চলমান সম্পর্কের প্রমাণ প্রয়োজন। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নিজে সংশ্লিষ্ট স্ত্রীকে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে থাকার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেনি। বরং নিম্ন আদালতকে স্বামীর পেশ করা উপাদানের সত্যতা, সেগুলি আইনসঙ্গত ভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না, বৈদ্যুতিন প্রমাণ হিসেবে সেগুলির গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রমাণমূল্য—সব দিক খতিয়ে দেখে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে।
এ ক্ষেত্রে সন্তানের খোরপোশের বিষয়টিও আলাদা করে দেখা হয়েছে। স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ থাকলেও তার প্রভাব সন্তানের খোরপোশের অধিকারকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে খর্ব করে না।
রায়ের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা। আদালত প্রশ্ন তুলেছে—ছবি ও ভিডিয়োগুলি কে তুলেছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনুসরণ বা নজরদারি করার অনুমোদন ছিল কি না, উপাদানগুলি বিকৃত বা প্রযুক্তির সাহায্যে পরিবর্তন করা হয়েছে কি না এবং এই ধরনের নজরদারি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষার অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে কি না।
বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার লাইসেন্স, কাজের সীমা ও দায়বদ্ধতা কিংবা বৈদ্যুতিন নজরদারি নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারতে এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ নির্দিষ্ট আইন নেই। এই প্রেক্ষিতে রায়ের প্রতিলিপি কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার মন্ত্রকের সচিব এবং আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে বেঞ্চ। সংসদ উপযুক্ত নিয়ামক কাঠামো তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলেই এই পদক্ষেপ।
অর্থাৎ, এই রায় শুধু অন্তর্বর্তী খোরপোশ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। একই সঙ্গে বৈবাহিক বিরোধে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত নজরদারি, বৈদ্যুতিন প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকারের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন সংঘাতও সামনে এনেছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



