ডালিম-লোহায় রাঙা কঙ্গনার এরি শাড়ি

যা জানা জরুরি
- নিজের প্রথম মেঘালয়ি শাড়ি পরে উচ্ছ্বসিত কঙ্গনা রানাউত।
- তবে এই শাড়ির বিশেষত্ব শুধু তার মেঘালয়ি পরিচয়ে নয়।
- সম্পূর্ণ খাঁটি এরি রেশমে তৈরি পোশাকটি বুনতে সময় লেগেছে প্রায় আড়াই মাস।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিজের প্রথম মেঘালয়ি শাড়ি পরে উচ্ছ্বসিত কঙ্গনা রানাউত। তবে এই শাড়ির বিশেষত্ব শুধু তার মেঘালয়ি পরিচয়ে নয়। সম্পূর্ণ খাঁটি এরি রেশমে তৈরি পোশাকটি বুনতে সময় লেগেছে প্রায় আড়াই মাস। আর রং? কোনও কৃত্রিম রং নয়—ডালিম ও লোহার গুঁড়ো থেকে তৈরি প্রাকৃতিক রং।
শাড়িটির প্রস্তুতকারী সংস্থা সমাজমাধ্যমে জানিয়েছে, এরি রেশম ‘অহিংসা’ বা ‘শান্তির রেশম’ নামেও পরিচিত। উত্তর-পূর্ব ভারতে মূলত উৎপাদিত এই রেশম পাওয়া যায় Philosamia ricini নামের রেশমমথ থেকে। উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বিশেষত্বের কারণেই পরিবেশবান্ধব ও তুলনামূলক ভাবে টেকসই বস্ত্র হিসেবে এরি রেশমের আলাদা পরিচিতি রয়েছে।
প্রস্তুতকারী সংস্থার ব্যাখ্যা, অন্যান্য রেশমের তুলনায় এরি অনেকটাই আলাদা। রেশমের গুটি থেকে মথ বেরিয়ে যাওয়ার পর সেই গুটি সংগ্রহ করা হয়। ফলে গুটি সংগ্রহের জন্য মথকে মেরে ফেলতে হয় না। এর উজ্জ্বলতা খুব তীব্র নয়, বরং মৃদু। স্পর্শেও রয়েছে সুতির মতো কোমলতা। শীতে শরীর গরম রাখে, আবার গরমের সময়েও আরাম দেয়। কাপড়ের মধ্য দিয়ে সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারে।
কী ভাবে তৈরি হয় এরি রেশম?
২০২৩ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লেখিকা স্বস্তি পাচৌরি এরি বা অহিংসা রেশমকে পরিবেশবান্ধব ও সুস্থায়ী তাঁতবস্ত্রের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
‘এরি’ নামটির উৎসও বেশ আকর্ষণীয়। পাচৌরির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নামটি এসেছে ‘এরান্ডি’ বা ‘এরা’ থেকে—স্থানীয় ভাষায় রেড়িগাছকে বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ। এরি রেশমকীটের প্রধান খাদ্য রেড়িগাছের পাতা। এই কীটের বৈজ্ঞানিক নাম Samia ricini। কাসাভা বা ট্যাপিওকা গাছের পাতাও তারা খায়।
প্রচলিত রেশম উৎপাদনের সঙ্গে এরির সবচেয়ে বড় পার্থক্য এখানেই। মথকে হত্যা না করেই গুটি থেকে রেশম সংগ্রহ করা যায়। মথ বেরিয়ে যাওয়ার পরে গুটিগুলিকে কাঁচা হলুদপাতার সঙ্গে প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট সেদ্ধ করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। পরে গুটির গুচ্ছে রান্না করা ভাতের মাড় মেশানো হয়। শেষ ধাপে ‘তাখুরি’ নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী সুতো কাটার যন্ত্র ব্যবহার করে দক্ষ হাতে তৈরি হয় এরি রেশমের সুতো।
অর্থাৎ, কঙ্গনার শাড়ির পিছনে শুধু আড়াই মাসের তাঁতশ্রম নয়—রয়েছে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি কারুশিল্পের ঐতিহ্যও।
কেন আলাদা এই রেশম?
এরি রেশমকীট পালনের ঐতিহ্য উত্তর-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশ-সহ উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জনজাতি সম্প্রদায় এই রেশম থেকে উৎকৃষ্ট তাঁতবস্ত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অসমে এরি স্নেহের সঙ্গে ‘গরিবের রেশম’ নামেও পরিচিত। ডখনা, গামোসা এবং মেখেলা-চাদরের মতো ঐতিহ্যবাহী পোশাকেও এরি তাঁতবস্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়।
এই রেশমের নিজস্ব সৌন্দর্যও আলাদা। প্রাকৃতিক অবস্থায় এতে সাদাটে, মাটিরঙা এবং সোনালি আভাযুক্ত হালকা বাদামি রং দেখা যায়। আবার কিছু বিশেষ জাতের রেশমকীট থেকে পাওয়া যায় আকর্ষণীয় মরচে-রঙা রেশম।
আর এর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য—রেশম তৈরির জন্য মথকে হত্যা করতে হয় না। সেই কারণেই প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কমানোর দিক থেকে এরি রেশমকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। পরিবেশবান্ধব ও নৈতিক ফ্যাশনের আলোচনাতেও এই বস্ত্রের গুরুত্ব রয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এরি রেশমকে ‘অহিংসা রেশম’ বলা হলেও এটি প্রাণিজ উৎসের বস্ত্র। তাই মথকে হত্যা না করে তৈরি হলেও সাধারণ অর্থে একে ভেগান ফ্যাশন বলা ঠিক নয়। বরং এটি প্রাণী-নির্যাতন কমানোর লক্ষ্যযুক্ত বা cruelty-free রেশমের একটি উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করাই বেশি নির্ভুল।
কঙ্গনার শাড়ি তাই নিছক তারকার পোশাক নয়। ডালিম ও লোহার গুঁড়োয় তৈরি রং, আড়াই মাসের তাঁতশ্রম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের দীর্ঘ কারুশিল্পের ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে এই শাড়ির গল্পটিও তার নকশার মতোই স্বতন্ত্র।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



