ছয় মাসের যুদ্ধ, জয় কোথায়?

যা জানা জরুরি
- ছয় মাসের যুদ্ধে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি।
- আবার আমেরিকাও এমন কোনও ফল দেখাতে পারেনি, যাকে নিরঙ্কুশ বিজয় বলা যায়।
- ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইজরায়েলি অভিযানের পর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ এখন এমন এক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে দু’পক্ষই চাপ বাড়াচ্ছে, কিন্তু গ্রহণযোগ্য সমাপ্তির পথ এখনও…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ছয় মাসের যুদ্ধে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি। আবার আমেরিকাও এমন কোনও ফল দেখাতে পারেনি, যাকে নিরঙ্কুশ বিজয় বলা যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইজরায়েলি অভিযানের পর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ এখন এমন এক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে দু’পক্ষই চাপ বাড়াচ্ছে, কিন্তু গ্রহণযোগ্য সমাপ্তির পথ এখনও অধরা।
ইরানের শাসনব্যবস্থা ভয়াবহ সামরিক আঘাতের পরও টিকে রয়েছে। আমেরিকাও সরাসরি বিমানহানার বদলে ক্রমশ অর্থনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ-অবরোধের দিকে বেশি জোর দিচ্ছে। অন্য দিকে তেহরানের হিসাব, সময় যত গড়াবে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খরচ তত বাড়বে। কিন্তু সেই অপেক্ষার মূল্য ইরানকেও দিতে হচ্ছে—তেল বিক্রি কমছে, বৈদেশিক বাণিজ্যে ধাক্কা লাগছে, অর্থনীতির উপর চাপ বাড়ছে। রাশ টানার লড়াই তাই এখন যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও।
সমঝোতা এল, টিকল না
জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্থায়ী নিষ্পত্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। ১৭ জুনের বোঝাপড়ায় বৃহত্তর চুক্তির জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা রাখা হয়েছিল। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা।
কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়। ১৭ আগস্ট সময়সীমা শেষ হওয়ার মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্প তা বাড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করেন। ইরানও জানায়, কূটনীতি ব্যর্থ হলে অবরোধ মোকাবিলায় সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি রয়েছে।
ফলে আলোচনার ব্যর্থতা শুধু একটি চুক্তির দরজা বন্ধ করেনি; নতুন সংঘর্ষের আশঙ্কাও বাড়িয়েছে। ছয় মাসের যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঘাটতি সম্ভবত এখানেই—দু’পক্ষের কেউই এখনও অন্য পক্ষের দেওয়া আশ্বাসকে যথেষ্ট বিশ্বাস করছে না।
শাসন টিকে, অনিশ্চয়তাও
ইরানের রাজনৈতিক ছবিও জটিল। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই ফেব্রুয়ারির হামলায় আহত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে দেখা না দেওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। সরকারি সূত্র অবশ্য দাবি করছে, তিনি জীবিত এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাঁর দফতর থেকেও কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
নেতৃত্বকে ঘিরে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো সক্রিয় রয়েছে। অর্থাৎ, শীর্ষ নেতৃত্বে ধাক্কা লাগলেও রাষ্ট্রের নির্দেশদানের ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। এখানেই সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক সাফল্যের পার্থক্য স্পষ্ট: কোনও নেতাকে আঘাত করা এক বিষয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়।
হরমুজেই আটকে সমাধান
যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। আমেরিকার দাবি, আন্তর্জাতিক নৌপথ থেকে মাইন সরানোর অভিযান হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনও যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিকতায় ফেরেনি। রয়টার্সের হিসাবে, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে রয়েছে।
ইরান বলছে, সামরিক হুমকি ও নিষেধাজ্ঞা না সরলে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরবে না। কাতার-সহ আঞ্চলিক দেশগুলি কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। কিন্তু এখানেই সমস্যার মূল: কোনও জলপথকে সামরিক ভাবে ‘উন্মুক্ত’ ঘোষণা করলেই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসে না।
জাহাজমালিকেরা যদি হামলার আশঙ্কা করেন, তাঁরা ঝুঁকি নেবেন না। ফলে হরমুজে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তাই হয়ে উঠেছে শান্তির আসল চাবিকাঠি।
যুদ্ধ এবার ব্যাংকেও
সামরিক চাপের পাশাপাশি আমেরিকা ইরানের অর্থপ্রবাহ আটকে দিতে নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করছে। ২৮ আগস্ট মার্কিন অর্থ দফতর মিশরের Banque Misr-এর সংযুক্ত আরব আমিরশাহির শাখাগুলিকে ঘিরে ব্যবস্থা নেয়। অভিযোগ, সম্ভাব্য ইরান-সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল লেনদেন হয়েছে।
লক্ষ্য স্পষ্ট—ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেনের পথ সংকুচিত করে তেহরানের অর্থনৈতিক শ্বাসনালী চেপে ধরা। তবে ব্যবস্থা নির্দিষ্ট শাখা ও সংশ্লিষ্ট লেনদেনকে কেন্দ্র করে; গোটা ব্যাংকের সমস্ত আন্তর্জাতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়নি।
অর্থাৎ যুদ্ধ এখন শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান বা জাহাজের নয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থাও হয়ে উঠেছে যুদ্ধক্ষেত্র।
অবরোধে সামরিক হিসাব
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসাবে, মাইন অপসারণ অভিযানের পর প্রায় দেড় হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে। একই সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য সীমিত করতে নৌ-অবরোধও বজায় রাখা হয়েছে বলে মার্কিন বাহিনীর দাবি।
এই দুই পদক্ষেপের মধ্যে আপাত বিরোধই যুদ্ধের জটিলতা বোঝায়। এক দিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ সচল রাখার চেষ্টা, অন্য দিকে ইরানের বাণিজ্যিক সক্ষমতা কমানোর অভিযান। ফলে একটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি অন্য ক্ষেত্রের বিরোধ মিটিয়ে দিতে পারছে না।
ট্রাম্পের ঘরেও চাপ
যুদ্ধের রাজনৈতিক খরচ এখন আমেরিকার ভিতরেও স্পষ্ট। সাম্প্রতিক Reuters/Ipsos সমীক্ষায় ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ৩৩ শতাংশে নেমে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩১ শতাংশ আমেরিকান; ৮৩ শতাংশ মনে করছেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে।
জ্বালানির দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপও প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দীর্ঘ যুদ্ধ তাই শুধু বিদেশনীতি নয়, ঘরোয়া রাজনীতিরও বোঝা।
বিশ্ব অর্থনীতিও ধাক্কা খেয়েছে, যদিও আশঙ্কার তুলনায় তার সহনশীলতা বেশি। হরমুজের অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহের চাপ এবং বাণিজ্যপথে বিঘ্ন বিশ্ববাজারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে।
ছয় মাস শেষে ছবিটা তাই বেশ পরিষ্কার। ইরান টিকে আছে—কিন্তু দুর্বল হয়েছে। আমেরিকা ও ইজরায়েল আঘাত করেছে—কিন্তু নিজেদের সব লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।
এই যুদ্ধের আসল হিসাব শেষ পর্যন্ত শুধু কতগুলি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বা কতগুলি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, তা দিয়ে হবে না। বিচার হবে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ কতটা নিরাপদে ফিরছে, কূটনৈতিক সমঝোতা কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং নতুন হামলার আশঙ্কা কতটা কমছে—এসব দিয়ে।
ছয় মাসে সেই পরীক্ষার কোনওটিরই চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি। আপাতত সবচেয়ে নিশ্চিত ফল একটাই—ক্ষয় বাড়ছে, কিন্তু বিজয় এখনও অধরা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



