ভিষেক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়: ঋণের বিপুল অঙ্কের তুলনায় ফেরত পাওয়ার পরিমাণ প্রায় নগণ্য। জি-র প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত দেউলিয়া প্রক্রিয়ায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা পরিশোধের পরিকল্পনায় অনুমোদন ভারতের দেউলিয়া ব্যবস্থাকে এক কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন শুধু এই নয় যে, ঋণদাতারা পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছেন কি না। বৃহত্তর প্রশ্ন হল, পাওনার অঙ্ক নিয়ে যখন হাজার হাজার কোটি টাকার আলোচনা চলছে, তখন এত সামান্য টাকা আদায়ের বন্দোবস্ত কতটা যুক্তিসংগত?

যদিও সুভাষ চন্দ্রের দফতরের বক্তব্য, ব্যক্তিগত জামিনদার হিসেবে এই দেউলিয়া প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে দাবির অঙ্ক ২২ হাজার কোটি টাকা নয়, ৩,৯৯২ কোটি টাকা।

সুভাষ চন্দ্রের বক্তব্য

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সুভাষ চন্দ্রের দফতর জানিয়েছে, তিনি নিজে কোনও ঋণদাতার কাছ থেকে টাকা ধার নেননি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “চন্দ্র কেবল ব্যক্তিগত জামিনদার। ব্যক্তিগত দেউলিয়া প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনার বিরোধিতাকারীরা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত জামিনদার হিসেবে মোট ৩,৯৯২ কোটি টাকা দাবি করেছেন, ২২ হাজার কোটি টাকা নয়।”

বিবৃতি অনুযায়ী, এর মধ্যে ৬২০ কোটি টাকার দাবি ইতিমধ্যেই মেটানো হয়েছে। আরও ১,০৬৩ কোটি টাকা পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছে ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলি। যে সব সংস্থার ঋণের জন্য চন্দ্র ব্যক্তিগত জামিন দিয়েছিলেন, তারা এখনও পর্যন্ত ৪৩ হাজার কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। অন্য কোনও বকেয়া থেকে থাকলে তা-ও মেটানোর আশ্বাস দিয়েছে ওই সংস্থাগুলি।

চন্দ্রের সম্পত্তির মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তাঁর দফতর। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “২০১৬ সালে ভারতের সংসদে তিনি নিজের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৩৯ কোটি ৮ লক্ষ টাকা বলে ঘোষণা করেছিলেন। সেই তথ্য প্রকাশ্য নথিতে রয়েছে। তা হলে ২০১৭ সালে কোনও ব্যাঙ্ক কীভাবে তাঁর নিট সম্পদের পরিমাণ ৪৫,৮৮৮ কোটি টাকা বলে ধরে নিতে বা মেনে নিতে পারে?”

দফতরের আরও বক্তব্য, ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলি কর্মীদের বেতন দিতে না পারায় কয়েক বার নিজের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে সেই বেতন মিটিয়েছেন চন্দ্র। ফলে তাঁর নিট ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ২০১৬ সালের ৩৯ কোটি ৮ লক্ষ টাকা থেকে কমে ২০২৪ সালে হয়েছে ৩১ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের একটি বসতবাড়িও রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “তাঁর কাছে যা আছে, তিনি তা থেকেই টাকা দিতে পারেন। সেই ভিত্তিতেই সাড়ে ছয় কোটি টাকা পরিশোধের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে।”

ব্যক্তিগত জামিনের অর্থ কী?

এই প্রক্রিয়ার বিষয় হল এসেল গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার ঋণের জন্য সুভাষ চন্দ্রের দেওয়া ব্যক্তিগত জামিন।

কোনও সংস্থার ঋণের জন্য তার উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত জামিন দিলে, মূল ঋণগ্রহীতা টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার পরে ঋণদাতা প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়া মেনে জামিনদারের কাছ থেকেও পাওনা আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন।

ইন্ডিয়াবুলস হাউজিং ফিন্যান্সের আবেদনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে চন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দেউলিয়া প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে এই মামলার পরিধি কেবল জি এন্টারটেনমেন্ট এন্টারপ্রাইজেসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সংস্থার ঋণের জন্য দেওয়া জামিন থেকে চন্দ্রের যে ব্যক্তিগত দায় তৈরি হয়েছে, সেটিই এই প্রক্রিয়ার বিষয়।

এসেল গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে পৃথক দেউলিয়া মামলা কিংবা জি এন্টারটেনমেন্ট ও তার কর্তাদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপের সঙ্গে এই মামলাকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

মতভেদ কাটিয়ে অনুমোদন

২৫ অগস্টের আদেশ কোনও সরল, সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ফল নয়। ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা নিয়ে জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইবুনালের দুই সদস্যের বেঞ্চ এর আগে বিভক্ত রায় দিয়েছিল।

সেই মতভেদ মেটাতে তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিষয়টি বিবেচনা করেন ট্রাইবুনালের বিচারবিভাগীয় সদস্য নীলেশ শর্মা। শেষ পর্যন্ত তিনি পরিশোধের পরিকল্পনা অনুমোদনের পক্ষে মত দেন।

ঋণদাতারা জোরালো আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে তাঁদের যে অস্বাভাবিক কম টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। কিন্তু ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্ত, ওই আপত্তিগুলি পরিকল্পনা খারিজ করার পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি তৈরি করেনি।

হাতে থাকা আর্থিক তথ্য পরীক্ষা করে ট্রাইবুনাল মনে করেছে, বিষয়টিকে সরাসরি দেউলিয়া ঘোষণা ও সম্পত্তি বিক্রির পর্যায়ে ঠেলে দেওয়ার চেয়ে অনুমোদিত পরিকল্পনায় ভাল ফল মিলতে পারে। অর্থাৎ যুক্তিটি বাস্তব পরিস্থিতিনির্ভর: সম্পত্তি বিক্রি করে যদি আরও কম টাকা আদায় হয়, তা হলে সাড়ে ছয় কোটি টাকা পাওয়াই তুলনায় ভাল।

ঋণদাতাদের আপত্তি কোথায়?

ঋণদাতাদের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল অত্যন্ত কম টাকা আদায়ের সম্ভাবনা এবং চন্দ্রের প্রকৃত আর্থিক অবস্থান নিয়ে সংশয়। তাঁর সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেন যথেষ্ট গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। বিশেষজ্ঞদের দিয়ে আর্থিক নথি ও লেনদেনের বিশদ অনুসন্ধান করানো উচিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও ওঠে।

তবে এমন অনুসন্ধানকে পরিশোধের পরিকল্পনা অনুমোদনের অপরিহার্য পূর্বশর্ত বলে মানেনি ট্রাইবুনাল।

পাশাপাশি ঋণদাতাদের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছে ট্রাইবুনাল। দেউলিয়া ও ঋণশোধে অক্ষমতা সংক্রান্ত বিধি মেনে ঋণদাতারা কোনও পরিকল্পনার উপর ভোট দিলে, সাধারণভাবে তাঁদের বাণিজ্যিক মূল্যায়নের জায়গায় ট্রাইবুনাল নিজের মূল্যায়ন বসায় না।

জানা গিয়েছে, পরিকল্পনাটি ঋণদাতাদের মোট ভোটাধিকারের প্রায় ৮০.৮১ শতাংশের সমর্থন পেয়েছিল। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তার পক্ষে ছিল। প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ঋণদাতা কোনও পরিশোধের পরিকল্পনা অনুমোদন করলে এবং ট্রাইবুনাল তাতে সিলমোহর দিলে, ভিন্নমত পোষণকারী কোনও ঋণদাতা কেবল আপত্তির কারণে প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদা নিষ্পত্তি দাবি করতে পারেন না।

ঋণদাতাদের জন্য শিক্ষা

উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত জামিনের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার একটি কঠিন বাস্তব সামনে এনেছে এই মামলা। কোনও ব্যাঙ্কের দাবি হাজার হাজার কোটি টাকা হলেও, সেই দাবির বিপরীতে পর্যাপ্ত সম্পত্তি বা কার্যকরভাবে আদায়যোগ্য জামিন না থাকলে শেষ পর্যন্ত প্রায় কিছুই ফেরত না-ও পাওয়া যেতে পারে।

ব্যক্তিগত জামিন ঋণদাতার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু তা ব্যাঙ্কের হিসাবে জমা থাকা নগদ টাকার সমতুল্য নয়। জামিনের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে জামিনদারের কতটা সম্পত্তি আইন মেনে পাওনা আদায়ে ব্যবহার করা সম্ভব এবং দেউলিয়া প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, তার উপর।

ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে তাই এই মামলা একটি সতর্কবার্তা। উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত জামিন আছে কি না, শুধু সেটুকু দেখলেই চলবে না। সেই জামিনের পিছনে বাস্তবে কতটা আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, সেটিও বিচার করতে হবে।

এই আদেশের অর্থ অবশ্য এমন নয় যে, সুভাষ চন্দ্রকে সমস্ত আইনি বা নিয়ন্ত্রক নজরদারি থেকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। জি এন্টারটেনমেন্ট কিংবা এসেল গোষ্ঠীর অন্য সংস্থাগুলিকে ঘিরে সম্পর্কহীন মামলাগুলির নিষ্পত্তিও এই আদেশে হয়নি। জি এন্টারটেনমেন্ট এবং পুনীত গোয়েঙ্কাকে নিয়ে শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সেবির পদক্ষেপও এর থেকে পৃথক।

ঋণদাতাদের কাছে এই ধরনের নিষ্পত্তি পাওনার প্রায় সম্পূর্ণ মূল্য হারানোর শামিল। আর ভারতের দেউলিয়া ব্যবস্থার জন্য এটি একটি কঠোর বাস্তবের প্রকাশ—খাতায়কলমে কত টাকা পাওনা রয়েছে এবং বাস্তবে কত টাকা আদায় করা সম্ভব, তার মধ্যে বিপুল ব্যবধান থাকতে পারে।