ঘরে ফেরাতে কাজের আশ্বাস, ২২ লক্ষের বেশি পরিযায়ী শ্রমিককে নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ রাজ্যের

যা জানা জরুরি
- কলকাতা: ভিন্রাজ্যে কর্মরত বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরাতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পকে সামনে আনল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।
- রাজ্যের চিহ্নিত ২২ লক্ষের বেশি পরিযায়ী শ্রমিকের যোগ্য পরিবারগুলিকে কেন্দ্রীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য বিশেষ অভিযান শুরু হচ্ছে।
- উদ্দেশ্য, নিজের এলাকায় মজুরিভিত্তিক কাজের সুযোগ তৈরি করে জীবিকার তাগিদে রাজ্য ছাড়ার প্রবণতা কমানো।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতা: ভিন্রাজ্যে কর্মরত বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরাতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পকে সামনে আনল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। রাজ্যের চিহ্নিত ২২ লক্ষের বেশি পরিযায়ী শ্রমিকের যোগ্য পরিবারগুলিকে কেন্দ্রীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য বিশেষ অভিযান শুরু হচ্ছে। উদ্দেশ্য, নিজের এলাকায় মজুরিভিত্তিক কাজের সুযোগ তৈরি করে জীবিকার তাগিদে রাজ্য ছাড়ার প্রবণতা কমানো। তবে এই উদ্যোগে নাম নথিভুক্ত হওয়া এবং বাস্তবে কাজ পাওয়া পৃথক বিষয়। তালিকাভুক্ত সবাই ইতিমধ্যেই কর্মসংস্থান পেয়েছেন, এমন দাবি করা হয়নি।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতর জেলাশাসকদের চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে। মুখ্যমন্ত্রী এর আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। রাজ্যে উন্নয়নের নতুন পর্ব শুরু হচ্ছে এবং কাজের সুযোগ তৈরি হবে—এই আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। সেই ঘোষণার পর এবার পরিবার চিহ্নিতকরণ ও নথিভুক্তির মাধ্যমে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই কর্মসূচির ভিত্তি ‘বিকশিত ভারত—গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’। দফতরের নির্দেশের বিবরণ অনুযায়ী, গ্রামীণ পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যেরা অদক্ষ কায়িক শ্রমে আগ্রহী হলে সংশ্লিষ্ট পরিবার বছরে ১২৫ দিনের মজুরিভিত্তিক কাজের নিশ্চয়তার আওতায় আসবে। এখানে বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন, নিশ্চয়তাটি পরিবারপিছু; পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য আলাদা করে ১২৫ দিনের কাজের প্রতিশ্রুতি নয়। ফলে কোনও পরিবারের একাধিক সদস্য কাজ চাইলে তাঁদের মোট কর্মদিবসের হিসাবও সেই কাঠামোর মধ্যেই বিবেচিত হবে।
পিটিআইয়ের খবর অনুযায়ী, প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু কর্মসংস্থান পরিচয়পত্র বিলি করা নয়। যোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যেরা যাতে কাজ চাইতে পারেন এবং মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে কাদের পরিচয়পত্র রয়েছে, তা যাচাই করে চিহ্নিত যোগ্য পরিবারগুলিকে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই যাচাই জরুরি, কারণ পুরনো নথিভুক্তি থাকলে নতুন করে একই পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে তাদের কাজের চাহিদা ও বর্তমান অবস্থার সঙ্গে নথি মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
শ্রম দফতরের তথ্য উদ্ধৃত করে এক্সপ্রেস জানিয়েছে, রাজ্যের ২২টি জেলায় এখনও পর্যন্ত ২২ লক্ষ ২৪ হাজার ৬০ জন পরিযায়ী শ্রমিক চিহ্নিত হয়েছেন। এটি প্রশাসনের চিহ্নিত শ্রমিকের সংখ্যা; রাজ্যের সমস্ত পরিযায়ী শ্রমিকের চূড়ান্ত গণনা হিসেবে এই সংখ্যাকে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। একইভাবে শ্রমিকের সংখ্যা এবং তাঁদের পরিবারের সংখ্যাও এক নয়। প্রকল্পে পরিবারভিত্তিক অন্তর্ভুক্তির সময় এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জেলাভিত্তিক ছবিতে সবচেয়ে সামনে মুর্শিদাবাদ। ‘মিলেনিয়াম পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে চিহ্নিত পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৩ লক্ষ ৮৬ হাজারের বেশি। মালদহে সংখ্যাটি ২ লক্ষ ৮৬ হাজারের বেশি এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ১ লক্ষ ৬৮ হাজারের বেশি। এই তিন জেলার হিসাবই দেখাচ্ছে, বিশেষ অভিযানের প্রশাসনিক চাপ সর্বত্র সমান হবে না। যেখানে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি, সেখানে পরিবার যাচাই, নথিভুক্তি এবং কাজের চাহিদার সঙ্গে স্থানীয় কর্মপরিকল্পনার সংযোগ ঘটানোর প্রয়োজনও বেশি। দফতরের লক্ষ্য, যোগ্য পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের নিশ্চয়তাভিত্তিক কর্মসংস্থানে যুক্ত করা।
নতুন উদ্যোগের পিছনে রয়েছে গ্রামীণ কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবনের বৃহত্তর প্রশাসনিক ঘোষণা। জুনে পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ জানিয়েছিলেন, অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন আটকে থাকা কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পগুলি ফের চালু হচ্ছে। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জুলাই থেকে নতুন কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে পরিবারপিছু বছরে ১২৫ দিনের কাজের ব্যবস্থা থাকবে। কেন্দ্র ও রাজ্য ব্যয় বহন করবে যথাক্রমে ৬০ এবং ৪০ শতাংশ। ফলে শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি রাজ্যের আর্থিক প্রস্তুতির প্রশ্নও এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত।
পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অবশ্য বাংলায় নতুন নয়। ২০২৫ সালের অগস্টে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন। অন্য রাজ্যে হয়রানির অভিযোগের মধ্যে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসনের জন্য সেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যাতায়াতের জন্য এককালীন পাঁচ হাজার টাকা এবং কাজ পাওয়া পর্যন্ত সর্বাধিক এক বছর মাসে পাঁচ হাজার টাকা সহায়তার কথা ছিল। বর্তমান উদ্যোগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে গ্রামীণ মজুরিভিত্তিক কাজে পরিবারগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার উপর।
তবে এই পরিকল্পনার বাস্তব পরীক্ষা হবে কাজের ধারাবাহিকতা, মজুরি এবং সময়মতো অর্থপ্রাপ্তিতে। পরিবারপিছু ১২৫ দিনের কর্মসংস্থান কিছুটা আর্থিক সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু তাকে সারা বছরের স্থায়ী জীবিকার সমার্থক ভাবা যাবে না। বাইরের কাজ ছেড়ে ফেরার সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের কাছে স্থানীয় আয়, পরিবারের ব্যয় এবং বাকি সময়ের কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হয়ে থাকবে।
প্রশাসনিক সাফল্য মাপতেও তাই শুধু কত পরিচয়পত্র দেওয়া হল, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়। কত পরিবার কাজ চাইল, কত পরিবার কাজ পেল, কত দিন কাজ হল এবং মজুরি পেতে কত সময় লাগল—এই তথ্য প্রকাশ প্রয়োজন। পাশাপাশি বাইরে থাকা শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাঁদের পরিবারের কাছে প্রকল্পের শর্ত স্পষ্ট করে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।
সব মিলিয়ে, রাজ্যের ঘোষিত লক্ষ্য পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজের এলাকায় কাজের সুযোগ দেওয়া। সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হল, তা বোঝা যাবে শ্রমিকের হাতে বাস্তবে কাজ ও মজুরি পৌঁছনোর পরেই। ঘরে ফেরার আহ্বানকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে সেই অভিজ্ঞতা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



