প্রেম ভাঙতেই ফাঁস ‘ফাঁস’!

যা জানা জরুরি
- মুম্বই, ২৭ অগস্ট: প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যেতেই সামনে এল মহারাষ্ট্র পাবলিক সার্ভিস কমিশন (এমপিএসসি)-র ড্রাগ ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কাণ্ড।
- যে যুবক প্রথম কমিশনকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর দিয়েছিলেন, তদন্তে তাঁকেই এই চক্রের অন্যতম অংশ বলে দাবি করেছে মুম্বই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা।
- ঘটনার জেরে ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত ড্রাগ ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করেছে এমপিএসসি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মুম্বই, ২৭ অগস্ট: প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যেতেই সামনে এল মহারাষ্ট্র পাবলিক সার্ভিস কমিশন (এমপিএসসি)-র ড্রাগ ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কাণ্ড। যে যুবক প্রথম কমিশনকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর দিয়েছিলেন, তদন্তে তাঁকেই এই চক্রের অন্যতম অংশ বলে দাবি করেছে মুম্বই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা। তাঁর সঙ্গে আরও পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন এমপিএসসি-র তিন কর্মীও।
ঘটনার জেরে ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত ড্রাগ ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করেছে এমপিএসসি। নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে যাঁরা বাতিল হওয়া পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না।
অভিযোগকারীই অভিযুক্ত?
অপরাধ দমন শাখার দাবি, ২৪ বছরের লোকেশ ওরফে গৌরব পাটিল নিজেও ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র পেয়েছিলেন। পরীক্ষার দু’দিন আগে, ২০ মার্চ, তাঁর তৎকালীন প্রেমিকা রুতুজা হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্নপত্রটি তাঁকে পাঠান বলে অভিযোগ।
এর পর তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। পুলিশের দাবি, সরকারি চাকরি পেয়ে গেলে রুতুজা তাঁকে ভুলে যাবেন—এই আশঙ্কা থেকেই গৌরব এমপিএসসির কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ জানান।
রুতুজাকেও নোটিস পাঠিয়েছে অপরাধ দমন শাখা। পুলিশের দাবি, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর পরীক্ষায় বসে তিনি মেধাতালিকায় সপ্তম স্থান অর্জন করেন।
অপরাধ দমন শাখার উপপুলিশ কমিশনার রাজ তিলক রোশন জানিয়েছেন, তদন্তের শুরুতে গৌরবই কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের তথ্য থাকার দাবি করেছিলেন। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই তাঁর নিজের ভূমিকা সামনে এসেছে।
পাঁচ লক্ষে প্রশ্নপত্র!
তদন্তকারীদের দাবি, পরীক্ষার আগে রুতুজার বাবা ৫৫ বছরের অমৃত পাটিল নন্দুরবারের বাসিন্দা মধ্যস্থতাকারী প্রবীণ পাটিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চল্লিশ বছরের প্রবীণের সঙ্গে এমপিএসসির তিন কর্মীর পরিচয় ছিল বলে পুলিশের দাবি।
তাঁরা হলেন সহকারী বিভাগীয় আধিকারিক বিশ্বেশ্বর নাকাতে ও গোপাল মারাঠে এবং আন্ডারসেক্রেটারি অভিজিৎ লেন্ডাভে।
পুলিশের অভিযোগ, এই তিন কর্মীর সাহায্যেই প্রবীণ প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন। এর বিনিময়ে তাঁদের পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল। পরে আরও টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের।
পরীক্ষার কয়েক দিন আগে অমৃত সেই প্রশ্নপত্র মেয়ে রুতুজার হাতে তুলে দেন বলে অভিযোগ। সেখান থেকেই সেটি পৌঁছে যায় গৌরবের কাছে।
প্রেম গেল, অভিযোগ এল
পরীক্ষার দু’দিন আগে রুতুজা প্রশ্নপত্রটি গৌরবকে পাঠিয়েছিলেন বলে পুলিশের দাবি। গৌরবের ভাইয়েরও ওই পরীক্ষায় বসার কথা ছিল।
কিন্তু ফল প্রকাশের আগেই প্রেমের সম্পর্কে ছেদ পড়ে। এর পরেই গৌরব এমপিএসসিকে ই-মেল করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ জানান। সেখানে নিজেকে এক পরীক্ষার্থীর বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, ২২ মার্চের পরীক্ষার প্রশ্ন আগেই ফাঁস হয়েছিল। পরে অভিযোগ নিয়ে কমিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখেন তিনি।
তদন্ত এগোতে থাকায় নিজের ভূমিকা প্রকাশ্যে আসতে পারে বুঝে গৌরব ফের কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে পুলিশের দাবি। এবার তিনি আগের অভিযোগ থেকে সরে গিয়ে পরীক্ষা পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তির কারণেই অভিযোগ করেছিলেন বলে জানান।
কিন্তু তদন্ত থামেনি।
এক পুলিশ আধিকারিকের বক্তব্য, সত্যিই যদি গৌরব তথ্যদাতা হতেন, তা হলে পরীক্ষার আগেই তিনি কমিশনকে সতর্ক করতেন। তদন্তকারীদের দাবি, শেষ পর্যন্ত তাঁরা নিশ্চিত হন যে প্রশ্নপত্রটি পরীক্ষার আগেই ফাঁস হয়েছিল এবং সেটি গৌরবের কাছেও পৌঁছেছিল।
বিধায়কের অভিযোগেও নড়েচড়ে বসে কমিশন
এর মধ্যেই জুলাইয়ের শেষ দিকে এনসিপি (শরদ পওয়ার)-এর বিধায়ক রোহিত পওয়ার পৃথক ভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি ছিল, নন্দুরবারের একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কয়েক জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষার দু’দিন আগেই অধিকাংশ প্রশ্ন পেয়ে গিয়েছিলেন।
এর পর এমপিএসসি মুম্বই পুলিশের দ্বারস্থ হয়। তদন্তের দায়িত্ব নেয় অপরাধ দমন শাখার সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তকারী বিভাগ।
তদন্তে গৌরবের বয়ান নেওয়া হয়। পরে তাঁর ভূমিকা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়। মঙ্গলবার তদন্তে পাওয়া তথ্য কমিশনকে জানিয়ে এফআইআর দায়ের করা হয়। বুধবার ছ’জনকে গ্রেফতার করে আদালতে পেশ করা হলে তাঁদের পুলিশি হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
৪৪ হাজার পরীক্ষার্থী, প্রশ্নফাঁসে বাতিল পরীক্ষা
খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের ১৫৪টি গ্রুপ-বি গেজেটেড ড্রাগ ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগের জন্য ২২ মার্চ পরীক্ষা হয়েছিল। রাজ্যের ছ’টি রাজস্ব বিভাগের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রায় ৪৪,৫০০ পরীক্ষার্থী অংশ নেন।
১২ জুন ফল প্রকাশের পর ৫০৬ জনকে সাক্ষাৎকারের জন্য উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। পরে ২২ জুলাই ৪৮৮ জনের অস্থায়ী মেধাতালিকা প্রকাশ করে কমিশন।
এখন সেই পুরো প্রক্রিয়াই বাতিল।
অপরাধ দমন শাখার তদন্ত-রিপোর্ট পাওয়ার পর ড্রাগ ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমপিএসসি। নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে আগের পরীক্ষায় যাঁরা আবেদন করেছিলেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না।
প্রেমের টানাপড়েন থেকে শুরু হয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, তদন্তে অভিযোগকারীর নামই অভিযুক্তদের তালিকায় উঠে আসা এবং শেষে প্রায় সাড়ে ৪৪ হাজার পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল—এই কাণ্ডে ব্যক্তিগত সম্পর্কের তিক্ততা যে কী ভাবে সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার বড়সড় সংকটে গড়াতে পারে, তারই নজির মিলল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



