নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানে শতাধিক ভারতীয় নিখোঁজ, উত্তরপ্রদেশ–বিহারে বন্যার সতর্কতা

যা জানা জরুরি
- পাহাড় থেকে নেমে আসা জল, কাদা, বরফ ও পাথরের প্রবল স্রোতে বিপর্যস্ত নেপাল।
- বুধবার নেপাল–তিব্বত সীমান্তে শুরু হওয়া ভয়াবহ হড়পা বানে ভেসে গিয়েছে জনপদ, সেতু, রাস্তা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকাঠামো।
- বৃহস্পতিবার সকালের সংবাদ অনুযায়ী, নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬২ হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পাহাড় থেকে নেমে আসা জল, কাদা, বরফ ও পাথরের প্রবল স্রোতে বিপর্যস্ত নেপাল। বুধবার নেপাল–তিব্বত সীমান্তে শুরু হওয়া ভয়াবহ হড়পা বানে ভেসে গিয়েছে জনপদ, সেতু, রাস্তা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকাঠামো। বৃহস্পতিবার সকালের সংবাদ অনুযায়ী, নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬২ হয়েছে। শতাধিক ভারতীয়-সহ বহু মানুষের সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজদের অনেকেই কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রায় বেরিয়েছিলেন। দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজ চললেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিপর্যয়ের সম্পূর্ণ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।
এই বিপর্যয়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক হয়েছে ভারতও। নেপালের নদীপথ ধরে বিপুল জলরাশি গণ্ডক অববাহিকায় পৌঁছতে পারে, এই আশঙ্কায় বিহার ও উত্তরপ্রদেশের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলিকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী বাহিনীর পাশাপাশি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত দল মোতায়েনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে সংবাদে প্রকাশ।
বুধবার সকালে সীমান্তবর্তী নদী উপত্যকায় আচমকা বিপর্যয় নেমে আসে। পাহাড়ের ঢাল থেকে নেমে আসা বিপুল ধ্বংসাবশেষ নদীতে মিশে ভয়ঙ্কর স্রোতের সৃষ্টি করে। নেপালের রাসুয়া-সহ একাধিক এলাকায় ঘরবাড়ি ও রাস্তা তার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়। কোথাও কাদায় ঢেকে যায় বসতি, কোথাও নদীর প্রবাহে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় যাতায়াতের পথ। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বহু এলাকায় উদ্ধারকারীদের পৌঁছনো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রবল স্রোত এবং উপযুক্ত জায়গার অভাবে কিছু এলাকায় হেলিকপ্টার নামানোও সম্ভব হয়নি।
নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। নেপালের পর্যটন বোর্ডের প্রাথমিক বিবৃতিতে ৩৮৪ জন যাত্রীর সন্ধান না-পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি। ওই হিসাবে ১০৫ জন ভারতীয় পর্যটক ও ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়কে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সংবাদে ভারতীয়দের সংখ্যা ১৩৩ বলা হয়েছে। তালিকা সংশোধন এবং যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সঙ্গে এই হিসাব বদলাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন সময়ের সংখ্যা যোগ করে মোট নিখোঁজের হিসাব করা ঠিক হবে না।
পশ্চিমবঙ্গেও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। কলকাতা থেকে কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া ৩২ জনের একটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। ওই দলে ৩০ জন পর্যটক এবং দু’জন ভ্রমণ পরিচালনাকারী ছিলেন। তাঁরা ২১ আগস্ট কলকাতা থেকে রওনা হয়ে পরদিন নেপালে পৌঁছন। সংবাদসংস্থার কাছে এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বুধবার সকালে তিব্বতে প্রবেশের জন্য দলটি রাসুয়াগড়ির অভিবাসন দপ্তরে ছিল। বিপর্যয়ের পরে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং মৃত্যুর নিশ্চিত খবর এক বিষয় নয়।
বিপর্যয়ের কারণ নিয়েও প্রাথমিক ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। প্রথমে ভূমিকম্পের জেরে ধস এবং তার পর বন্যার সম্ভাবনা সামনে এসেছিল। পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থার মূল্যায়নে হিমবাহের বরফধসের বিষয়টি উঠে আসে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, প্রথমে ভূমিকম্প বলে মনে হওয়া ঘটনাটিকে পরে হিমবাহের ধস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে একে নিশ্চিতভাবে ‘ভূমিকম্পজনিত বন্যা’ বলা সমীচীন নয়। কীভাবে ধস, নদীর বাধা এবং আকস্মিক জলস্ফীতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, তা আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
নেপালের পাশাপাশি তিব্বতের গিরং এলাকাও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। বৃহস্পতিবারের সংবাদে চিনের দিকে অন্তত তিন জনের মৃত্যু এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বিদেশিরাও রয়েছেন। এই সংখ্যা নেপালের নিখোঁজের হিসাব থেকে পৃথক। সীমান্তের দুই দিকেই পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের খোঁজ চলছে। যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপর্যয়ের সময় কে সীমান্তের কোন দিকে ছিলেন, তা নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উদ্ধারকাজে নেপালের সেনা, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী নামানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে রয়েছে অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা। বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীদেরও অনেকে নিখোঁজ। সীমান্তবর্তী বাণিজ্য ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ধ্বংস হওয়ায় শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার নয়, পরবর্তী ত্রাণ পৌঁছনোর ব্যবস্থাও কঠিন হয়ে উঠেছে। নদীর ধারে অবস্থিত বাজার, প্রশাসনিক ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনার ক্ষতি এই সংকট আরও বাড়িয়েছে।
নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত প্রথম দফায় ১০ টন ত্রাণসামগ্রী ও জরুরি ওষুধ পাঠিয়েছে। ভারতীয় বায়ুসেনার পরিবহণ বিমানে অস্থায়ী আশ্রয়ের সরঞ্জাম, কম্বল, পরিচ্ছন্নতা রক্ষার সামগ্রী, সৌরবাতি এবং ওষুধ পাঠানো হয়। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এই সহায়তার কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে কথা বলে প্রাণহানিতে সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার আশ্বাস দেন। উদ্ধার ও ত্রাণে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট দলগুলির মধ্যে সমন্বয় চলছে।
ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে গণ্ডক নদীর অববাহিকা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে নেপালের ফুরকে খোলায় ত্রিশূলী নদীর জলস্তর হঠাৎ বেড়ে যায়। সেই জল ভাটির দিকে গণ্ডকে পৌঁছতে পারে। তবে বুধবার রাতের সরকারি মূল্যায়নে নেপালের দিকের জলাধারগুলিতে জলস্তর কমার কথা জানানো হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলেও স্পষ্ট করে কেন্দ্র। সতর্কতা জারি থাকা মানেই ভারতে ব্যাপক বন্যা অবশ্যম্ভাবী—এমন নয়।
বিহারের পশ্চিম ও পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, সারণ, মুজফ্ফরপুর এবং বৈশালীতে বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে। বাল্মীকিনগরে গণ্ডক ব্যারাজের ৩৬টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। নদীতীরবর্তী এলাকার জন্য নৌকা, নিরাপদ আশ্রয় এবং রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগরেও নদীর জলস্তরের উপর নিরবচ্ছিন্ন নজর রাখা হচ্ছে। কুশীনগরের কয়েকটি নিচু গ্রাম থেকে বাসিন্দাদের সরানোর নির্দেশ এসেছে। সীমান্তরক্ষী সশস্ত্র সীমা বলও উদ্ধার ও ত্রাণের জন্য দল মোতায়েন করেছে।
এই মুহূর্তে প্রধান কাজ নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণ, জীবিতদের উদ্ধার এবং নদীর ভাটির জনপদগুলিকে নিরাপদ রাখা। সরকারি তালিকা, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ভ্রমণ সংস্থার তথ্য মিলিয়েই প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব স্পষ্ট হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাথমিক সংখ্যা চূড়ান্ত ধরে নেওয়া কিংবা নিখোঁজ প্রত্যেককে মৃত বলে গণ্য করা—দুটিই বিভ্রান্তিকর। বিপর্যয়ের ব্যাপকতার পাশাপাশি তথ্যের এই অনিশ্চয়তাও মনে রাখা জরুরি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



