শ্রাবণে অযোধ্যায় ‘মাছ-ভোজ’: নিষাদ সমাজের খাদ্যসংস্কৃতি ঘিরে যোগী–কংগ্রেস তরজা

যা জানা জরুরি
- অযোধ্যায় নিষাদ সম্প্রদায়ের একটি ‘মাছ-ভোজ’ ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে উত্তরপ্রদেশে।
- মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ অভিযোগ করেছেন, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর মাছের ভোজে অংশ নিয়েছেন।
- অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে অজয় রাই পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন—মুখ্যমন্ত্রী ছবি বা অন্য কোনও প্রমাণ প্রকাশ করুন; তা না পারলে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অযোধ্যায় নিষাদ সম্প্রদায়ের একটি ‘মাছ-ভোজ’ ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে উত্তরপ্রদেশে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ অভিযোগ করেছেন, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর মাছের ভোজে অংশ নিয়েছেন। অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে অজয় রাই পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন—মুখ্যমন্ত্রী ছবি বা অন্য কোনও প্রমাণ প্রকাশ করুন; তা না পারলে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। প্রমাণ মিললে তিনি পদত্যাগ করতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত রবিবারের একটি অনুষ্ঠান থেকে। বিজেপি ছেড়ে গত মাসে কংগ্রেসে যোগ দেওয়া রাম নিষাদ সেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে অজয় রাই এবং উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বভারতীয় নেতা রাজেন্দ্র পাল গৌতম উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটির পরে মাছ রান্না ও খাওয়ার একটি কথিত দৃশ্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই দৃশ্যের ভিত্তিতেই কংগ্রেসকে আক্রমণ শুরু করে বিজেপি।
সোমবার রায়বরেলীর এক জনসভায় যোগী আদিত্যনাথ বলেন, “আমরা সকলেই বজরংবলীর ভক্ত। কিন্তু কাল বাবরির ভক্তদের আচরণ আপনারা দেখেছেন। তাঁরা হনুমানগড়ি মন্দিরে গেলেন, তারপর নিজেদের একটি কার্যালয়ে বসে মাছের ভোজ উপভোগ করলেন।” কংগ্রেস নেতৃত্বের আচরণ বোঝাতে তিনি ‘মুখে রাম, বগলে ছুরি’ প্রবাদটিও ব্যবহার করেন।
যোগীর কটাক্ষ, এমন আচরণ দেখলে গিরগিটিও লজ্জা পাবে। মন্দিরে গিয়ে ‘রাম-রাম’ বলার পরেই বাইরে বেরিয়ে মাছ খাওয়ার মধ্যে তিনি কংগ্রেসের কথিত দ্বিচারিতা দেখতে পেয়েছেন। শ্রাবণ মাসে বহু ধর্মপ্রাণ হিন্দু আমিষ পরিহার করেন—এই আবেগকেই রাজনৈতিক আক্রমণের প্রধান ভিত্তি করেছে বিজেপি।
উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠকও বলেন, অযোধ্যা ভগবান রামের পবিত্র ধাম। সেখানে, বিশেষত শ্রাবণ মাসে, এমন ভোজের আয়োজন কংগ্রেসের সংস্কৃতিকেই প্রকাশ করে। বিজেপির বক্তব্যে তাই মাছ খাওয়ার প্রশ্নটির সঙ্গে অযোধ্যার ধর্মীয় তাৎপর্য এবং শ্রাবণের সংযমকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেস অবশ্য বলেছে, রাজনৈতিক অনুষ্ঠানটি অযোধ্যা শহরে নয়, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের গোসাইগঞ্জে হয়েছিল। দলের নেতারা অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও পরবর্তী মাছ-ভোজে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে সমাজমাধ্যমে ছড়ানো দৃশ্যের সঙ্গে অজয় রাইকে যুক্ত করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার।
অজয় রাই বলেন, নিষাদ সমাজের আমন্ত্রণেই তিনি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখানে মাছ রান্না করা হয়ে থাকলে সেটি আয়োজকদের বিষয়। তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁর প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রীর হাতে যদি সত্যিই কোনও ছবি থাকে, তবে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? অজয় রাইয়ের অভিযোগ, অযোধ্যায় মন্দিরের দান চুরি ও অনিয়মের অভিযোগ থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতেই বিজেপি এই বিতর্ক তৈরি করছে।
আয়োজক রাম নিষাদও দাবি করেছেন, কংগ্রেস নেতাদের দুপুর এক থেকে দুটোর মধ্যে নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। তাঁরা বিকেল তিনটে নাগাদ চলে যান। পরে নিষাদ সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিজেদের জন্য আলাদা মাছ-ভোজের আয়োজন করেছিলেন। সমাজমাধ্যমে ছড়ানো দৃশ্যটি সেই পরবর্তী ভোজেরই।
বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নটি তুলেছেন রাম নিষাদ। তাঁর কথায়, “আমরা মৎস্যজীবী। মাছ রান্না করে খেয়ে আমরা কী অপরাধ করেছি?” তিনি জানান, নিষাদ সম্প্রদায়ের জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মাছের গভীর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। টানা এক মাস মাছ স্পর্শ না করার দাবি তাঁদের জীবিকা ও জীবনাচারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। খাদ্যাভ্যাস নিয়ে নিন্দা না করে নিষাদ সমাজের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
ফলে বিতর্কটি শুধু কে মাছ খেলেন বা শ্রাবণে আমিষ খাওয়া উচিত কি না—সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে প্রান্তিক মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের খাদ্যসংস্কৃতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় আচরণের মাপকাঠিতে বিচার করার অভিযোগও জুড়ে গিয়েছে। নিষাদদের সমর্থন উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্যও যথেষ্ট।
একই সভা থেকে যোগী আদিত্যনাথ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ‘মনুস্মৃতির মানসিকতা’ সংক্রান্ত মন্তব্যকেও আক্রমণ করেন। পুণের ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে রাহুল ছাত্রীদের পুরুষতান্ত্রিকতা ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। যোগীর অভিযোগ, কংগ্রেস কখনও রামের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে, আবার এখন ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
বিতর্কে এখনও পর্যন্ত অজয় রাইয়ের মাছ খাওয়ার কোনও প্রকাশ্য প্রমাণ সামনে আসেনি। তা সত্ত্বেও একটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভোজ দ্রুত ধর্ম, রামমন্দির, মনুস্মৃতি এবং কংগ্রেস-বিজেপির বৃহত্তর সংঘাতে পরিণত হয়েছে। নিষাদ সমাজের সরল প্রশ্নটিই তাই রাজনৈতিক কোলাহলের মধ্যে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ—মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষ মাছ খেলে অপরাধটা কোথায়?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



