ইরানকে চাপে ট্রাম্প

যা জানা জরুরি
- তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য করলেই শাস্তি, গৌণ নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি; নজরে ভারত-চিনও ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর পথে হাঁটছে আমেরিকা।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, তেহরান এখন ‘ভেঙে পড়ার’ মুখে।
- এই পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশ, সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য করলেই শাস্তি, গৌণ নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি; নজরে ভারত-চিনও
ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর পথে হাঁটছে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, তেহরান এখন ‘ভেঙে পড়ার’ মুখে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশ, সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্টের ভাষায়, এটি কোনও শত্রু দেশের বিরুদ্ধে আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক আক্রমণ।
ইরানের সঙ্গে আমেরিকার এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হয়নি। হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলাদা আলোচনা চললেও দুই দেশের সামগ্রিক বিরোধ মেটার কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে নতুন সামরিক অভিযান না চালিয়ে অর্থনৈতিক চাপকেই প্রধান অস্ত্র করতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিয়স এই কৌশলকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
গৌণ নিষেধাজ্ঞাই বড় অস্ত্র
নতুন কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে গৌণ নিষেধাজ্ঞা। অর্থাৎ, শুধু ইরানের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়, তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় কোনও দেশের সরকার, সংস্থা, ব্যাঙ্ক বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও মার্কিন শাস্তির মুখে পড়তে পারে।
সম্ভাব্য ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে মার্কিন বাজারে প্রবেশের অধিকার কেড়ে নেওয়া, ডলারে লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা এবং আমেরিকায় থাকা সম্পদ আটকে দেওয়া। বেসেন্টের বক্তব্য, ইরান সরকারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কে যুক্ত হলেই সংশ্লিষ্ট পক্ষকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ‘সম্পূর্ণ শক্তি’র মুখোমুখি হতে হবে।
তবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও ঘোষণা করেনি ওয়াশিংটন। বেসেন্ট জানিয়েছেন, আপাতত কোনও শেষ তারিখ নেই, কিন্তু আমেরিকার ধৈর্যেরও সীমা রয়েছে। চিনের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে কি না, প্রশ্নের জবাবে তাঁর সাফ বক্তব্য, “কেউই এর ঊর্ধ্বে নয়।” তাঁর দাবি, লক্ষ্য একটাই—ইরান সরকারকে অর্থনৈতিক ভাবে ‘শ্বাসরোধ’ করা।
নজরে ভারত, চিনও
এই হুঁশিয়ারির ফলে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা একাধিক দেশের উপর চাপ বাড়তে পারে। সেই তালিকায় চিন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, কাতার ও তুরস্কের মতো দেশ রয়েছে। তবে কোন দেশের বিরুদ্ধে কখন এবং কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সমস্যা হল, গৌণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গেলে আমেরিকাকে নিজের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গেও সংঘাতে যেতে হতে পারে। ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা চিন। ফলে বেজিংকে তেহরান থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সহজ হবে না।
রাশিয়াও ইরানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে। ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাফল্য শুধু ওয়াশিংটনের ঘোষণার কঠোরতার উপর নির্ভর করবে না। অন্য দেশগুলি সেই চাপ কতটা মেনে চলছে এবং বিকল্প পথে ইরানের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিই হয়ে উঠবে আসল পরীক্ষা।
রিয়ালের পতনে বাড়ছে চাপ
যুদ্ধ এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই গভীর সঙ্কটে। সোমবার দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দাম নতুন তলানিতে পৌঁছেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এক মার্কিন ডলারের দাম প্রায় ২০ লক্ষ রিয়ালে পৌঁছেছে। মুদ্রার এই পতনে আমদানি ব্যয়, খাদ্যপণ্যের দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে ইরানের অধিকাংশ তেল রফতানিও বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থই তেহরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। সেই আয় কমে গেলে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি থেকে শুরু করে সরকারি ব্যয় চালানো—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে।
ইরানের শীর্ষ আধিকারিকদের বক্তব্যেও অর্থনৈতিক উদ্বেগ স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশে প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষেও সওয়াল করেছেন। তাঁর যুক্তি, ইরানের হাতে দরকষাকষির শক্তি থাকতেই সংঘাতের অবসান ঘটানো উচিত।
যুদ্ধ নয়, আপাতত অর্থনীতিই অস্ত্র
মার্কিন প্রশাসনের একাংশের মতে, অন্তত আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাই প্রধান অস্ত্র হয়ে থাকতে পারে। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে পরে সামরিক অভিযান ফের বিবেচনায় আসতে পারে।
অর্থাৎ, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান কৌশল শুধু ইরানকে শাস্তি দেওয়া নয়, অর্থনীতির উপর চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে নীতি বদলাতে বাধ্য করাও। কিন্তু সেই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ভারত, চিন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলিকে নিয়ে।
তারা যদি মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে বিকল্প মুদ্রা, মধ্যস্থতাকারী সংস্থা কিংবা অন্য বাণিজ্যিক পথ ব্যবহার করে ইরানের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যায়, তা হলে ওয়াশিংটনের ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ কতটা কার্যকর হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



