ইরানে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’

যা জানা জরুরি
- ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি এ বার নজিরবিহীন আর্থিক চাপ তৈরির পথে আমেরিকা।
- মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্টের ঘোষণা, তেহরানের সঙ্গে সংঘাত এ বার ‘শেষ পর্বে’ ঢুকছে।
- সোমবার ভোর থেকেই শুরু হতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি এ বার নজিরবিহীন আর্থিক চাপ তৈরির পথে আমেরিকা। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্টের ঘোষণা, তেহরানের সঙ্গে সংঘাত এ বার ‘শেষ পর্বে’ ঢুকছে। সোমবার ভোর থেকেই শুরু হতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’। তাঁর দাবি, কোনও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এর আগে এত বড় আর্থিক অভিযান চালায়নি ওয়াশিংটন।
রবিবার সমাজমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় বেসেন্ট বলেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ কেটে দেওয়াই আমেরিকার লক্ষ্য। তেহরানকে সম্পূর্ণ একঘরে না করা পর্যন্ত চাপ অব্যাহত থাকবে। শুধু ইরানের সংস্থা বা আধিকারিক নয়, তেহরানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আর্থিক সম্পর্ক রাখা তৃতীয় দেশ, ব্যাংক, বন্দর, বিমানবন্দর এবং বাণিজ্যিক সংস্থাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, যে দেশ ইরানকে কোনও ধরনের ‘অর্থনৈতিক লাইফলাইন’ দেবে, তাকে গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হবে। তাঁর ভাষায়, এটি হবে নজিরবিহীন মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা। বেসেন্টের সাম্প্রতিক ঘোষণায় সেই হুঁশিয়ারিই আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে প্রথম দফায় কোন কোন দেশ বা সংস্থাকে নিশানা করা হবে, তার পূর্ণ তালিকা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
হোয়াইট হাউসের মূল লক্ষ্য ইরানের তেল বিক্রির আয়, গোপন ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকল্প পথগুলি বন্ধ করা। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে এবার আঘাত হানার প্রস্তুতি ইরানের অর্থনীতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শিরায়।
তেল থেকে ডিজিটাল মুদ্রা—সবই নিশানায়
বেসেন্টের দাবি, ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা ইতিমধ্যেই ইরানের সামরিক পরিকাঠামোকে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং দেশটির পরমাণু কর্মসূচির উপরও বড় আঘাত হেনেছে। এবার লক্ষ্য অর্থনৈতিক কাঠামোর অবশিষ্ট অংশ।
গত কয়েক মাস ধরেই মার্কিন অর্থমন্ত্রকের ‘ইকনমিক ফিউরি’ অভিযানে ইরানের তেল পরিবহণকারী ছায়া-নৌবহর, মধ্যস্থতাকারী সংস্থা, অস্ত্র ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী এবং গোপন আর্থিক নেটওয়ার্ককে নিশানা করা হয়েছে। ইরানের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ নোবিটেক্স-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রকের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে ইরান সরকারের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—তেলের টাকা দেশে ফেরার পথ বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় তেহরানের প্রবেশ যতটা সম্ভব কঠিন করে দেওয়া।
তেহরানের পাল্টা হুমকি
ওয়াশিংটনের ঘোষণার পর পাল্টা কড়া বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রধান মহসেন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কোনও প্রতিবেশী দেশ আমেরিকার অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
প্রয়োজনে পারস্য উপসাগর থেকে তেল রফতানি বন্ধ করার ব্যবস্থাও ইরান নিতে পারে বলে হুমকি দিয়েছেন তিনি। নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করাকেও ‘যুদ্ধের কাজ’ হিসেবে দেখা হবে বলে তাঁর বার্তা।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—হরমুজ প্রণালী।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই সরু জলপথ দিয়ে যায়। তেহরান সত্যিই হরমুজে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করলে তার অভিঘাত সরাসরি পৌঁছবে বিশ্ববাজারে। বাড়তে পারে তেলের দাম, পরিবহণ ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি। ভারত-সহ এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলিও তখন বড় ধাক্কা খেতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলির জন্যও তৈরি হচ্ছে কঠিন সমীকরণ। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালু রাখলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়, আর সম্পর্ক ছিন্ন করলে জ্বালানি ও আঞ্চলিক ব্যবসায় ক্ষতি—দুই দিকেই ঝুঁকি।
চিনের উপর নজর ওয়াশিংটনের
এই অর্থনৈতিক চাপ কার্যকর করতে চিনকে পাশে পাওয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আমেরিকা। কারণ ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা চিন। তবে বেজিং এখনও নিষেধাজ্ঞার বদলে আলোচনার পথেই জোর দিচ্ছে। পাকিস্তান ও তুরস্কও মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি, পণ্যের ঘাটতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-সহ বেসামরিক নেতৃত্বের একাংশ সম্মানজনক সমঝোতার পক্ষে সওয়াল করছেন। কঠোরপন্থীরা অবশ্য এখনও প্রতিরোধের পথেই অনড়।
ফলে বেসেন্টের ‘শেষ পর্ব’ ঘোষণা শুনে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশা করার কারণ নেই। বরং সামরিক সংঘাতকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নিয়ে গিয়ে ইরানকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া—যেখান থেকে আত্মসমর্পণ, সমঝোতা কিংবা শাসনব্যবস্থার বড় পরিবর্তন ছাড়া বেরোনো কঠিন—সেটিই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—অর্থনৈতিক অবরোধ কি তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাবে, নাকি হরমুজে আরও ভয়ঙ্কর সংঘাতের দরজা খুলে দেবে?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



