প্রতিবাদের নতুন রাজনৈতিক ভাষা হয়ে ফিরল গালাগালি

যা জানা জরুরি
- ভারতের রাজনৈতিক প্রতিবাদে অশালীন শব্দের ব্যবহার নতুন নয়।
- কিন্তু সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলনে গালাগালি যে ভাবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠেছে, তা নিছক শিষ্টাচারের অবক্ষয় বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
- বিশেষ করে যন্তর মন্তরের আন্দোলনে তরুণ-তরুণীদের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে লক্ষ্য করে কটু, কখনও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ স্লোগান শোনা যাওয়ার পরে প্রশ্ন উঠেছে—এ কি কেবল…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতের রাজনৈতিক প্রতিবাদে অশালীন শব্দের ব্যবহার নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলনে গালাগালি যে ভাবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠেছে, তা নিছক শিষ্টাচারের অবক্ষয় বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। বিশেষ করে যন্তর মন্তরের আন্দোলনে তরুণ-তরুণীদের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে লক্ষ্য করে কটু, কখনও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ স্লোগান শোনা যাওয়ার পরে প্রশ্ন উঠেছে—এ কি কেবল অসংযত ক্ষোভ, না কি ক্ষমতার সঙ্গে কথা বলার এক নতুন ভাষা?
দ্য হিন্দু-র আলোচনার মূল সূত্রও এই বদল। এত দিন ভারতীয় প্রতিবাদের ভাষা প্রধানত গড়ে উঠেছে স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকার থেকে—‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘তানাশাহি নেহি চলেগি’ কিংবা দাবি আদায়ের ছন্দবদ্ধ স্লোগানে। সেখানে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা হলেও ভাষায় একটি ঘোষিত রাজনৈতিক গাম্ভীর্য বজায় থাকত। নতুন প্রজন্ম সেই অলিখিত বিধি মানছে না। তাদের ভাষা তৈরি হচ্ছে সমাজমাধ্যমের হাস্যরস, বিদ্রূপচিত্র, চলচ্চিত্র, মঞ্চ-কৌতুক এবং দৈনন্দিন কথোপকথনের মিশ্রণে।
যন্তর মন্তরের আন্দোলনে বহু পুরনো ছড়া বদলে মোদীকে আক্রমণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ‘ছাপ্পান্ন ইঞ্চি’ ভাবমূর্তি নিয়েও তৈরি হয়েছে বিদ্রূপাত্মক স্লোগান। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে এমন শব্দ, যা সংবাদপত্রে হুবহু লেখা সম্ভব নয়। ২০ জুলাই পুলিশের বলপ্রয়োগের পরে দেওয়াল ও ব্যারিকেডেও ওই ধরনের শব্দ দেখা যায়। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, বহু দিন ধরে ভদ্র ভাষায় আবেদন জানিয়ে রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়নি; তাই এমন ভাষা দরকার হয়েছিল, যা কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করতে পারবে না।
এই প্রবণতার নেপথ্যে অন্তত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, নতুন প্রজন্মের ভাষায় সমাজমাধ্যমের গভীর প্রভাব। সেখানে একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বিদ্রূপচিত্র, ছোট বাক্য বা তীক্ষ্ণ রসিকতা অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, গত দেড় দশকে চলচ্চিত্র ও অন্তর্জাল-ধারাবাহিক কথ্য ভাষার বহু নিষিদ্ধ শব্দকে ঘরের পর্দায় নিয়ে এসেছে। ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’, ‘সেক্রেড গেমস’, ‘মির্জাপুর’ বা ‘পাতাল লোক’-এর সংলাপ যে প্রজন্ম শুনে বড় হয়েছে, তাদের কাছে গালাগালি সব সময় ভয়াবহ সামাজিক সীমালঙ্ঘন নয়; অনেক সময় সেটিই ‘খাঁটি’ কথার লক্ষণ।
তৃতীয় কারণটি সরাসরি রাজনৈতিক। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সমাজমাধ্যমে সাংবাদিক, বিরোধী নেতা, সংখ্যালঘু এবং বিশেষত মহিলাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত কুৎসা, যৌন গালিগালাজ ও হুমকির অভিযোগ উঠেছে শাসকপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। ফলে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ মহল যখন ছাত্রদের ভাষার নিন্দা করে, আন্দোলনকারীরা পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন—রাজনৈতিক কথোপকথনকে অমার্জিত করার দায় কি শুধু তাঁদের?
যুব আন্দোলনের পরে অভিনেত্রী তথা বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রানাউত প্রতিবাদী তরুণীদের ‘জেনারেশন গাটার’ বলে কটাক্ষ করেন। অভিনেতা অনুপম খেরও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ‘অসম্মান’-এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চলচ্চিত্র শংসাপত্র পর্ষদের চেয়ারম্যান শশীশেখর ভেম্পতি লিঙ্গবিদ্বেষী গালির সমালোচনা করেন। নয়ডায় এক তরুণীর বিরুদ্ধে মামলা এবং সমাজমাধ্যমে কয়েকজন আন্দোলনকারীর পরিচয় প্রকাশের চেষ্টাও বিতর্ক বাড়িয়েছে। এখানে প্রতিবাদের ভাষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও তাই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। , অশালীনতা নিয়ে আপত্তির মধ্যে প্রজন্মগত ব্যবধানের সঙ্গে লিঙ্গবৈষম্যও রয়েছে—পুরুষের মুখে যে শব্দ সমাজ প্রায় স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তরুণীর মুখে সেটিই প্রবল নৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
গালাগালি আন্দোলনে তিনটি কাজ করতে পারে। তা শারীরিক হিংসায় না গিয়ে ক্রোধের তীব্রতা প্রকাশ করে; অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আলাদা সমষ্টিগত পরিচয় তৈরি করে; এবং এমন মনোযোগ আদায় করে, যা গতানুগতিক স্লোগান পারে না। হংকংয়ের প্রতিবাদ নিয়ে গবেষণাতেও এই ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলনে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতাবানের ভীতিপ্রদ ভাবমূর্তি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা। এই অশালীনতা দুর্বলের বিরুদ্ধে নয়, মূলত দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ব্যবহৃত হওয়ায় তার রাজনৈতিক অর্থ আলাদা।
তবু সব গালিগালাজকে প্রতিবাদের নামে বৈধতা দেওয়া বিপজ্জনক। অধিকাংশ ভারতীয় গালির ভিতেই রয়েছে নারীকে যৌনবস্তু ভাবা, জাতপাতের অবমাননা কিংবা পরিবারের মহিলাদের আক্রমণ করার পুরুষতান্ত্রিক অভ্যাস। ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হলেও সেই শব্দ সমাজের পুরনো বৈষম্যকেই পুনরুৎপাদন করতে পারে। প্রতিবাদের লক্ষ্য যদি মর্যাদা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়, তবে তার ভাষা অন্য কারও মর্যাদা হরণ করছে কি না, সেই আত্মসমালোচনাও প্রয়োজন।
অতএব গালাগালির এই প্রত্যাবর্তন একই সঙ্গে বিদ্রোহ ও সতর্কসংকেত। নতুন প্রজন্ম জানিয়ে দিচ্ছে, ক্ষমতার নির্ধারিত ভদ্রতার সীমার মধ্যে থেকে তারা আর প্রতিবাদ করবে না। কিন্তু রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার সাহস এবং বিদ্বেষপূর্ণ ভাষাকে স্বাভাবিক করে তোলা এক বিষয় নয়। ভারতের রাজনীতির সামনে এখন আসল প্রশ্ন—ক্ষোভকে শোনা হবে, না কি শব্দের অশালীনতা দেখিয়ে ক্ষোভের কারণটিকেই আবার আড়াল করা হবে?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



