খবর

উপসাগরীয় যুদ্ধের ধাক্কায় রাশিয়ার তেলে ভারতের নির্ভরতা সর্বকালীন সর্বোচ্চ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • উপসাগরীয় অঞ্চলে ছ’মাস ধরে চলা সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পুরনো সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে।
  • ইরান থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর ভারত আবার বিপুল পরিমাণে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল…
  • জুন ও জুলাইয়ে রাশিয়া থেকে ভারতের দৈনিক তেল আমদানি ২৬ লক্ষ ব্যারেল ছাড়িয়ে গিয়েছে—যা এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

উপসাগরীয় অঞ্চলে ছ’মাস ধরে চলা সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পুরনো সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে। ইরান থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর ভারত আবার বিপুল পরিমাণে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কিনতে শুরু করেছে। জুন ও জুলাইয়ে রাশিয়া থেকে ভারতের দৈনিক তেল আমদানি ২৬ লক্ষ ব্যারেল ছাড়িয়ে গিয়েছে—যা এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ। দেশের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকেরও বেশি এখন আসছে রাশিয়া থেকে।

বাণিজ্য-তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের প্রধান বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়ার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া থেকে ভারতের দৈনিক আমদানি প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেলে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু উপসাগরীয় সংকট তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তা আড়াই গুণেরও বেশি বেড়েছে। সব দেশ মিলিয়ে ভারতের দৈনিক অপরিশোধিত তেল আমদানিও এখন প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যারেল—ফেব্রুয়ারির শেষে আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করার পর সর্বোচ্চ।

গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনে ভারত কার্যত ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর অর্থভান্ডার পূর্ণ করছে। ওয়াশিংটনের চাপের মুখে নয়াদিল্লি রাশিয়ার তেল কেনা কমিয়েছিল। কিন্তু ইরান ও আমেরিকার মধ্যে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা এখনও অধরা। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলও স্বাভাবিক হয়নি। ফলে ভারতকে আবার রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। উপসাগরীয় সংকটে তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় ট্রাম্প প্রশাসনও রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দিয়েছে।

ভারতের জ্বালানি-নিরাপত্তার দুর্বলতা এই যুদ্ধ আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। দেশের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। ফলে উৎপাদক দেশে যুদ্ধ, সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি—প্রতিটি ঘটনাই ভারতের পরিবহণ, শিল্পোৎপাদন, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ে একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি করে।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাই জ্বালানি-নিরাপত্তাকে ‘এই সময়ের প্রয়োজন’ বলে উল্লেখ করেছেন। বিকল্প জ্বালানির উৎস গড়ে তুলতে সমস্ত শক্তি নিয়োগের কথাও বলেছেন তিনি। কিন্তু সরকারি নীতি আয়োগের হিসাব দেখাচ্ছে, ভারতের বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানিই এখনও নির্ণায়ক। মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে কয়লা থেকে এবং ২৮ শতাংশ তেল থেকে। পরমাণু জ্বালানির অংশ মাত্র ১.৬ শতাংশ।

বিকল্প উৎস তৈরির লক্ষ্যে বেসরকারি সংস্থার জন্য পরমাণু ক্ষেত্র খুলে দেওয়া এবং দেশীয় শোধনাগারগুলিকে রান্নার গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বলার মতো একাধিক পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় জ্বালানি ব্যবস্থা রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়। দিল্লির গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটারের হেমন্ত মাল্য বলেছেন, কয়লা, তেল ও গ্যাস—তিন ক্ষেত্রেই আমদানি-নির্ভরতা, অল্প কয়েকটি সরবরাহকারী দেশের উপর অতিরিক্ত ভরসা, সীমিত মজুত, পরিকাঠামোগত বাধা এবং আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা ভারতকে বিপদের মুখে ফেলছে।

প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর ১২ বছরের শাসনকালে পাইপবাহিত প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া শহরের সংখ্যা ৭০ থেকে বেড়ে ৭০০ হয়েছে। প্রায় ১ কোটি ৭৫ লক্ষ পরিবার এই পরিষেবার আওতায় এসেছে। কিন্তু দেশের ৩৩ কোটির বেশি পরিবার এখনও রান্নার প্রধান জ্বালানি হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডারের উপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে ভারতীয় শোধনাগারগুলি দৈনিক এলপিজি উৎপাদন প্রায় ৩৬ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টনের বেশি করেছে। তা সত্ত্বেও দেশের মোট চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়। সেই উৎপাদনেরও অধিকাংশের কাঁচামাল আমদানি করা অপরিশোধিত তেল।

এই পরিস্থিতিতে কৌশলগত তেলভান্ডার বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছে ভারত। বর্তমানে সেখানে ৫৩ লক্ষ ৩০ হাজার টন পেট্রোলিয়াম রাখা সম্ভব। কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত মিলিয়ে প্রায় ৭৪ দিনের আমদানির সমপরিমাণ তেল ও পেট্রোপণ্য ধরে রাখা যায় বলে সংসদে জানিয়েছে সরকার। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতেও ভারতীয় তেলের একটি অংশ মজুত রাখার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তেলের মতো এলপিজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি মজুত নেই। ফলে উপসাগরীয় সরবরাহ বন্ধ হলে রান্নার গ্যাস নিয়েই আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি।

পশ্চিম এশিয়ার গ্যাস সরবরাহ কমায় ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আবার কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে এক দশকে দেশের বার্ষিক কয়লা উৎপাদন ৭০ শতাংশ বেড়ে ১০৪ কোটি টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিকল্প জ্বালানির কথা বলা হলেও তাৎক্ষণিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারতকে তেল ও কয়লার কাছেই ফিরতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধ বুঝিয়ে দিয়েছে—শুধু তেলের ব্যবহার কমানো নয়, সরবরাহকারী দেশ এবং পরিবহণের পথ বহুমুখী করাও ভারতের জরুরি কাজ। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রসার ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় তেলের গুরুত্ব বহু দিন থাকবে। আপাতত সেই প্রয়োজন মেটাতে সস্তা ও সহজলভ্য রুশ তেলই ভারতের প্রধান অবলম্বন।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles