গালি ছেলেদের, ধাক্কা মেয়েদের!

যা জানা জরুরি
- পুণে: ছেলেরা গালিগালাজ করলে সমস্যা নেই, কিন্তু মেয়েরা একই ভাষা ব্যবহার করলেই ‘সংস্কৃতির ধাক্কা’—ভারতীয় সমাজে এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধেই সরব হলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল…
- শনিবার পুণেতে ছাত্রীদের নিয়ে আয়োজিত ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি পুরনো মন্তব্যকে সামনে রেখে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা সামাজিক মাপকাঠির তীব্র সমালোচনা…
- কর্মসূচিতে যন্তর মন্তরের ছাত্র আন্দোলনের একটি ভিডিয়ো দেখান রাহুল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পুণে: ছেলেরা গালিগালাজ করলে সমস্যা নেই, কিন্তু মেয়েরা একই ভাষা ব্যবহার করলেই ‘সংস্কৃতির ধাক্কা’—ভারতীয় সমাজে এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধেই সরব হলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। শনিবার পুণেতে ছাত্রীদের নিয়ে আয়োজিত ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি পুরনো মন্তব্যকে সামনে রেখে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা সামাজিক মাপকাঠির তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
কর্মসূচিতে যন্তর মন্তরের ছাত্র আন্দোলনের একটি ভিডিয়ো দেখান রাহুল। সেখানে আন্দোলনকারী ‘কন্যাদের’ মুখে আপত্তিকর শব্দ শুনে ‘সাংস্কৃতিক ধাক্কা’ লাগার কথা বলতে শোনা যায় প্রধানমন্ত্রীকে। সেই মন্তব্যের সূত্র ধরেই রাহুলের কটাক্ষ, আন্দোলনে ছেলেরাও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছিল। অথচ প্রধানমন্ত্রীর আপত্তি গিয়ে ঠেকেছিল শুধু মেয়েদের কথাতেই।
রাহুল বলেন, ছেলেরা গালি দিলে তা যেন স্বাভাবিক, কিন্তু মেয়েরা একই কাজ করলেই সংস্কৃতির প্রশ্ন উঠে যায়—এই মানসিকতার বিরুদ্ধেই লড়াই দরকার। তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য গালিগালাজকে সমর্থন করা নয়; বরং একই আচরণের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য সমাজের পৃথক মাপকাঠিকে প্রশ্ন করা।
তাঁর কথায়, মেয়েদের কোথায় যেতে হবে, কী পরতে হবে, কী বলতে হবে কিংবা কীভাবে চলতে হবে—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা পিতৃতন্ত্রেরই অংশ। অন্যদিকে ছেলেদের দেওয়া হয় অনেক বেশি স্বাধীনতা। ‘‘পুরুষেরা যা খুশি করবে, আর মেয়েরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকবে—এমন ভারত আমরা চাই না। ছেলে ও মেয়ে, উভয়কেই সমান সম্মান দিতে হবে,’’ বলেন রাহুল।
নারীর স্বাধীনতা নিয়ে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মানসিকতাকেও নিশানা করেন কংগ্রেস নেতা। এ প্রসঙ্গে তিনি সঙ্ঘপ্রধান মোহন ভাগবতের একটি পুরনো মন্তব্য এবং হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনোহর লালের নামে প্রচারিত একটি মন্তব্যের উল্লেখ করেন। রাহুলের দাবি, মহিলাদের আচরণ ও স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার যে প্রবণতা রয়েছে, এই ধরনের মন্তব্য তারই বহিঃপ্রকাশ।
মনুস্মৃতির বহুল আলোচিত একটি শ্লোকের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। সেখানে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীকে বাবা, স্বামী ও পুত্রের অধীনে থাকার কথা বলা হয়েছে। এই ধারণাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে আক্রমণ করে রাহুল ছাত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘আপনি কারও সম্পত্তি নন। বাবা, ভাই, স্বামী কিংবা ছেলের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু আপনি তাঁদের অধীন নন। আপনি শুধুই আপনার নিজের।’’
ভারতের প্রায় ৭০ কোটি মহিলাকে দেশের অন্যতম বৃহত্তম শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন রাহুল। তাঁর বক্তব্য, একজন মহিলার পরিচয় কেবল কারও মেয়ে, স্ত্রী বা মা হিসেবে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। প্রত্যেকের নিজস্ব স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, পরিচয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে মেয়েদের আরও সরব হওয়ার বার্তাও দেন তিনি। তাঁর আহ্বান, ভয়, হুমকি কিংবা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাছে মাথা না নত করে নিজেদের জায়গা নিজেদেরই দাবি করতে হবে। ‘‘নিজের কথা জোরে বলুন, নিজের পরিচয় নিয়ে গর্বিত হোন এবং সমাজে নিজের জায়গার জন্য লড়ুন,’’ বলেন কংগ্রেস নেতা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভোজপুরি লোকশিল্পী নেহা সিংহ রাঠৌরও। সরকারের অস্বস্তির কারণ হতে পারে—এমন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার জেরে তাঁকে নিয়মিত অনলাইন আক্রমণের মুখে পড়তে হয় বলে জানান তিনি। তাঁর প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের কাছে জবাব চাইলেই যদি নাগরিককে গালিগালাজ ও হুমকি সহ্য করতে হয়, তবে সেই পরিবেশকে কতটা গণতান্ত্রিক বলা যায়?
পুণের এই অনুষ্ঠানটি মূলত ছাত্রীদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, কর্মসংস্থান, নারী-নিরাপত্তা, পরিবারের চাপ এবং আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে হেনস্থার অভিজ্ঞতাও সেখানে উঠে আসে। আর সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করেন রাহুল—মেয়েদের কি স্বাধীন নাগরিক হিসেবে দেখা হবে, নাকি ‘সংস্কৃতি’র দোহাই দিয়ে তাঁদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাই চলবে?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



